জাপার মহাসচিব পদ হারাচ্ছেন রাঙ্গা!

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা
জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ১০:০২,  আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ১০:০৬

বিতর্কিত মন্তব্য করে দল ও দলের বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা। প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেও দল এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপিরা রাঙ্গাকে সংসদে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ক্ষমা চাইলেও রাঙ্গা কি শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যাবেন নাকি মহাসচিবের পদ হারাবেন তা নিয়ে খোদ দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যেই চলছে নানা প্রশ্ন।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রাঙ্গার অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে দলের এমপিরা প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। এমন কয়েকটি বিষয় নিয়ে রাঙ্গা মন্তব্য করেছেন যা ক্ষমার অযোগ্য বলে ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ ওবায়দুল কাদের।

একই সঙ্গে সংসদে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি বলেন, রাঙ্গা ছিলেন শ্রমিক, তার কোনো লেখা পড়া নেই। সে করত যুবদল। শ্রমিক নেতা থেকে তাকে আজ মন্ত্রী বানানো হয়েছে। সে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা তার নিজের বক্তব্য, এটি দলের বক্তব্য না। এজন্য আমরা লজ্জিত ও দুঃখ প্রকাশ করছি।

এদিকে মশিউর রহমান রাঙ্গাকে দলে মহাসচিব রাখা বা না রাখা নিয়ে আজ বা কালকের মধ্যে জরুরি বৈঠক ডাকতে পারেন দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের। এমনটি জানিয়েছে দলটির একজন শীর্ষ নেতা।

গত ১০ নভেম্বর ‘গণতন্ত্র’ দিবসে দলের একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ও শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে বক্তব্যের সময় রাঙ্গা বন্ধুবন্ধুকে নিয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রের জন্য অনেক কিছু করলেও তিনিই প্রথম গণতন্ত্রের বুকে শেষ পেরেকটি মেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু যেদিন বাকশাল গঠন করেন, সেদিন তিনি কয়েকটি পত্রিকা বাদে সব পত্রিকা বন্ধ করে দেন। সেদিনই আসলে গণতন্ত্রের বুকের শেষ পেরেক ঠুকে দেন বঙ্গবন্ধু’। তার এই বক্তব্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহল ভালোভাবে নেয়নি। এমনকি জাতীয় পার্টির নেতাদের মধ্যেও এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জাপার একাধিক নেতা জানান, জাপার মহাসচিব পদ থেকে রাঙ্গার বিদায় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমদ জাতীয় সংসদে মশিউর রহমান রাঙ্গাকে প্রকাশে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ১৪ দলীয় জোটের নেতারাও রাঙ্গার বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

এদিকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনকে ‘ইয়াবাখোর’ বলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা। তিনি বলেন, নূর হোসেনকে নিয়ে অসতর্কভাবে আমার দেয়া বক্তব্যে যে আঘাত পেয়েছেন, তার জন্য আমি তার মায়ের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। একইসঙ্গে যে বক্তব্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, সেসব বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর বনানীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, রোববার বনানীতে জাপার চেয়ারম্যান কার্যালয়ে ‘গণতন্ত্র দিবস’-এর এক আলোচনা সভায় রাঙ্গা বলেছেন ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কাকে হত্যা করলেন? নূর হোসেনকে? কে নূর হোসেন? একটা অ্যাডিকটেড ছেলে। একটা ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর। রাঙ্গা বলেন, আমি আশা করি, এই বিষয়ে আর কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকবে না।

তিনি বলেন, গত ১০ নভেম্বর গণতন্ত্র দিবসের আলোচনা সভায় আমার কিছু বক্তব্য নিয়ে কোনো কোনো মহল এবং বিশেষ করে নূর হোসেনের পরিবারের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবছর নূর হোসেনের মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে কয়েকটি সংগঠনের আলোচনা, বক্তব্য ও বিবৃতিতে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়। এমনকি তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালিও করা হয়। এর ফলে জাতীয় পার্টির কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এবারো তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

সেই পরিপ্রেক্ষিতে কর্মীদের উত্তেজনার মধ্যে বক্তব্য প্রদানকালে অনিচ্ছাকৃতভাবে আমার মুখ থেকে নূর হোসেন সম্পর্কে কিছু অযাচিত কথা বেরিয়ে গেছে, যা তার পরিবারের সদস্যদের মনে আঘাত করেছে। এর জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত ও অনুতপ্ত। নূর হোসেনের পরিবারের প্রতি এরশাদও সমব্যাথী ছিলেন বলে উল্লেখ করেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব রাঙ্গা।

এদিকে রাঙ্গার বক্তব্য নিয়ে দলের ভেতরেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল বনানীর দলীয় কার্যালয়ে এক সভায় জাতীয় পার্টির যুগ্ম-মহাসচিব হাসিবুল ইসলাম জয় বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মশিউর রহমান রাঙ্গার কুরুচিকর বক্তব্যে দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও বিস্ময় প্রকাশ করছি। যার কারণে বাঙালি জাতি একটি স্বাধীন পতাকা পেয়েছে সে ব্যক্তি নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য অমার্জনীয় অপরাধ।

জয় আরো বলেন, ভিন্ন দল থেকে আসা রাঙ্গা সাহেব কোনো অসৎ উদ্দেশ্যের এরশাদ প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টিকে জনসম্মুখে হেয়প্রতিপন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের যেখানে প্রতিবছর ১৫ আগস্ট পালনের ঘোষণা দিয়েছেন সেখানে রাঙ্গা সাহেবের এমন বক্তব্য জাতিকে হতবাক করেছে।

উল্লেখ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ইচ্ছায় রুহুল আমিন হাওলাদারকে বাদ দিয়ে মশিউর রহমান রাঙ্গাকে জাতীয় পার্টির মহাসচিব করেন এরশাদ। অতপর তিনি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যান।

জানা গেছে, এক সময়ের জাকের পার্টির রংপুরের স্থানীয় নেতা থেকে বিএনপিতে যোগদান করেন। অতঃপর ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন রাঙ্গা। তার পর থেকে জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলেও সব সময় সে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলছেন। এমন অভিযোগ করে আসছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

 




Loading...
ads





Loading...