আন্দোলনের বিকল্প ভাবতে পারছে না বিএনপি


poisha bazar

  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ১১ আগস্ট ২০১৯, ১০:০৪

পবিত্র ঈদুল আজহার পর দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে আন্দোলনের কথাই নতুন করে ভাবছে বিএনপি। দলটির নীতি-নির্ধারণী ফোরামের সদস্যরা এ বিষয়ে কয়েক দফা বৈঠক করছেন। তবে বৈঠকগুলো বেশিরভাগই হয়েছে ছোট ছোট গ্রুপে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদ, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা পৃথক পৃথক বৈঠক করছেন নেত্রীর মুক্তির বিষয়েও। ডেঙ্গু ও বন্যা পরিস্থিতি অনুক‚লে আসার পর জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি নিয়ে মাঠে অবস্থান নেবে দলটি। তারপর বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে দফায় দফায় কর্মসূচি দেবে বিএনপির হাইকমান্ড। এমনটি জানিয়েছে দলটির একাধিক সূত্র।

এদিকে ঈদে নেতাদের নিজ নিজ এলাকায় যেতে নির্দেশ দিয়েছেন পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পাশাপাশি ঈদ পরবর্তীতে দলীয় কর্মসূচিও সক্রিয় করতে নির্দেশ দেন লন্ডনে অবস্থানরত এ নেতা। আর সম্প্রতি একটি আলোচনা সভায় নেতাকর্মীদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা কিন্তু মানুষের শক্তি দিয়েই আবার ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠব।

সম্প্রতি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় জামিন আবেদন সরাসরি নাকচ হয়ে যাওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যুতে নতুন হিসাব-নিকাশ কষছে বিএনপি। গ্রেফতারের ১৭ মাস পেরিয়ে গেলেও আইনি প্রক্রিয়ায়ই নেত্রীর মুক্তি হতে পারে, এমন আশা এত দিন দলের অভ্যন্তরে কিছুটা হলেও ছিল। কিন্তু সর্বশেষ রায়ের পর এখন আর কোনো ভরসা করতে পারছে না তারা। কর্মীদের মধ্যে এখন আরো বেশি ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে থাকা সিনিয়র নেতারাও রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রে চাপে পড়ে গেছেন। তারাও বেগম জিয়ার মুক্তি ইস্যু নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। গত সপ্তাহে খালেদার মুক্তির করণীয় নির্ধারণে সিনিয়র আইনজীবীদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন নেতারা। সেখানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও স্কাইপিতে যুক্ত ছিলেন।

গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া গ্রেফতার হওয়ার পর বিএনপিতে তিন ধরনের মত ছিল। এক. কারাগারে পাঠানো হলে মাসখানেকের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আসবেন খালেদা জিয়া। দুই. বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে ছেড়ে দেয়ার জন্য নয়। তিন. আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি সম্ভব নয়, রাজপথেই এর ফয়সালা হতে হবে। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় জামিন আবেদন সরাসরি নাকচ হয়ে যাওয়ার পর এখন সবার মতের পরিবর্তন হয়ে একমত হয়েছে বলে জানিয়েছেন এক সিনিয়র নেতা। ওই নেতার মতে, ‘রাজপথ ছাড়া খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনার আর কোনো পথ খোলা নেই।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, আদালতের সর্বশেষ এই অবস্থানের পর রাজনৈতিক দূরত্ব আরো তীব্র হলো। বেগম জিয়ার মুক্তি নিয়ে সরকারের কট্টর অবস্থানের প্রকাশ ঘটল। সরকারের ইচ্ছা ছাড়া বেগম জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও শেষ হয়ে যাওয়ার পথ ধরেছে।

৭৫ বছর বয়স্ক সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এখন বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার স্বাস্থ্যের অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খালেদা জিয়ার জিবে আলসার হয়েছে। তার চার কেজি ওজন কমেছে। উনি শুকিয়ে গেছেন। কিছুই খেতে পারছেন না। হুইল চেয়ার ছাড়া মুভ করতে পারছেন না। বিছানা থেকে একা নিজে উঠতে পারেন না। হুইল চেয়ারে বসিয়ে তাকে টয়লেটে, ওয়াসরুমে বা খাবার টেবিলে নিতে হয়। এভাবে বেগম জিয়াকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি অসম্ভব মনে করে, অসুস্থতা বিবেচনায় এনে প্যারোলে খালেদা জিয়ার মুক্তি চাওয়া হবে কিনা তা নিয়ে নতুন করে আবারো বিএনপির ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। মাস চার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের সূত্র ধরে এই আলোচনা বেশ চাউর হয়েছিল। বিএনপির নেতারা তখন বলেছেন, বেগম জিয়া প্যারোলে মুক্তি পেতে চান না।

বিএনপির সিনিয়র একা নেতা বলেছেন, দল, পরিবার ও সর্বোপরি বেগম খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের বিষয়টি। বিএনপির মধ্য সারির নেতাদের একটি অংশ অবশ্য শুরু থেকেই যে কোনো প্রক্রিয়ায়ই হোক বেগম জিয়াকে কারামুক্ত দেখতে চান।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের আইনজীবীরা মনে করছেন, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন হাইকোর্টে সরাসরি খারিজ হয়ে যাওয়ায় তার মুক্তির বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মানবকণ্ঠের সাথে আলাপকালে তারা বলেছেন, এখন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালাস চেয়ে যে আপিল আবেদন শুনানির অপেক্ষায় আছে, সেই আবেদনটি হাইকোর্টের অন্য কোনো বেঞ্চে উপস্থাপন করে জামিন আবেদন করা যেতে পারে। আর দ্বিতীয় প্রক্রিয়া হলো হাইকোর্টের জামিন আবেদন খারিজের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়া। তারা বলেছেন, যেহেতু খালেদা জিয়ার কোনো আইনজীবীকে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হচ্ছে না, সেহেতু এ বিষয়ে সিনিয়র আইনজীবীরা সম্মিলিতভাবে আলোচনায় বসে সিদ্ধান্ত নেবেন।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ায় এখন আপিল বিভাগে যেতে হবে। তিনি বলেন, আমরা এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাব। তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারণে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়েছে। এ কারণে সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া বেগম খালেদা জিয়ার জামিন হবে না। সাত বছরের সাজায় তার জামিন নামঞ্জুর করা অত্যন্ত দুঃখজনক।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

 




Loading...
ads





Loading...