ভেঙ্গে যাচ্ছে ঐক্যফ্রন্ট


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ১১ জুলাই ২০১৯, ১০:০২,  আপডেট: ১১ জুলাই ২০১৯, ১০:১৩

ভাঙনের মুখে পড়েছে ঐক্যফ্রন্ট। জাতীয় ইস্যুতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ক্ষোভে-অভিমানে জোট ছাড়তে শুরু করেছেন শরিকরা। প্রশ্ন তুলছেন, জোটের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনসহ শীর্ষ নেতাদের ভূমিকা নিয়েও। জোটের শীর্ষনেতাদের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছেন না শরিকরা। এ বিশ্বাসহীনতা থেকেই জোট ছাড়ল অন্যতম শরিকদল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ।

বাকি শরিকরা তাকিয়ে আছে শীর্ষনেতাদের দিকে। শিগগির জোটটি সক্রিয় না হলে নাগরিক ঐক্যসহ অন্য শরিকরা যে কোনো সময় জোট ছাড়তে পারেন- এমনটি জানিয়েছে একটি বিশ্বস্ত সূত্র।

শরিকরা বলছেন, যে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়েছিল তার কোনোটিই সফল হয়নি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৭ দফা দাবি নিয়ে বৃহৎ ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যেই গঠন করা হয়েছিল জোটটি। কিন্তু নির্বাচনের আগে একটি দাবিও আদায় করতে পারেননি তারা। নানা নাটকীয়তা শেষে নির্বাচনে গিয়েও ভরাডুবির কবলে পড়ে। নির্বাচনে ভোট ডাকাতি আর বিপুল কারচুপির অভিযোগ এনে ফলাফল বয়কট করার পর কথা ছিল বিজয়ী ৭ জন সংসদে যাবেন না একই সঙ্গে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তুলবেন। এতেও ব্যর্থ হয়েছে জোটটি।

রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলার বিপরীতে গণফোরাম দুটি ও বিএনপির পাঁচটি আসনে সয়লাব করাকেই তাদের রাজনীতির সফলতা মনে করছেন শীর্ষ নেতারা। জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নিজ নিজ দলের সিদ্ধান্তে শপথ নিয়ে সংসদে যান বিজয়ীরা। কিন্তু কোন স্বার্থে সংসদে গেলেন তার ব্যাখ্যাও দেননি শরিকদের।

জামায়াত-শপথ ইস্যু নিয়ে নির্বাচনের পর থেকেই অস্থিরতা বিরাজ করছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গঠিত হওয়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। নির্বাচনের পর রাজপথের কঠোর আন্দোলন না দেয়ায় ক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতারাও। বার বার কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে তা পালন না করায় হতাশ সরকার বিরোধীরাও। এসব ইস্যু থেকেই বাড়তে শুরু করে মতবিরোধ।

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে গণফোরামের বিজয়ী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদের শপথ নেয়ার পর প্রকাশ্য চলে আসে মতবিরোধ। সুলতান মনসুর শপথ নেয়ার পর সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নেন গণফোরামের আরেক বিজয়ী মোকাব্বির আলী খাঁন। দলীয় সিদ্ধান্ত না মানার কারণে সুলতান মনসুরকে তাৎক্ষণিক দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও বহিষ্কার করা হয়নি মোকাব্বির খানকে। সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান দাবি করেন তারা জোটের প্রধান ও গণফোরাম সভাপতি মোকাব্বির খানের ঈঙ্গিতেই শপথ নিয়েছেন। সুলতান মনসুরের মতো মোকাব্বির খানকেও দল থেকে বহিষ্কারের করার দাবি জানাচ্ছিল জোট ও দলের বিরাট অংশ। কিন্তু কামাল হোসেন তা না করেই কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে প্রথম সারিতেই বসান মোকাব্বির খানকে। পরবর্তীতে কমিটি গঠন হলে তাকে প্রেসিডিয়াম সদস্যের পদও দেন। এ নিয়ে ক্ষোভে-অভিমানে দল ছাড়েন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টু।

বিজয়ীদের শপথ নেয়া থেকে বিরত রাখা, পুনর্নির্বাচনের দাবিতে রাজপথের কঠোর আন্দোলন না দেয়া, আন্তর্জাতিক মহল থেকে চাপ সৃষ্টি করাতে না পারা এবং নিজ দলের দুই প্রার্থীর শাস্তিতে দ্বৈতনীতি অবলম্বন করায় তার ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন শরিকরা। প্রশ্ন তোলেন তার ভ‚মিকার ওপর। এরপর থেকে বাড়তে শুরু করে অভ্যন্তরীণ মতানৈক্য। স্থবির হয়ে পড়ে জোটের কার্যক্রম। এ অবস্থায় শপথ নেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে বিএনপির বিজয়ী জাহিদুর রহমান। তার শপথের পর বিএনপি তাৎক্ষণিক তাকে বহিষ্কার করে। নানা নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে শপথ নেয়ার শেষ দিন বিএনপি থেকে বিজয়ী দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া বাকিরা শপথ নিয়ে সংসদে যান। বিএনপি থেকে দাবি করা হয় তারা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তে সংসদে গিয়েছেন।

জোটের সিদ্ধান্ত ছিল বিজয়ী সংসদে যাবেন না। কিন্তু জোটকে না জানিয়ে কোন স্বার্থে বিএনপি সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল এবং বিজয়ী সবাই সংসদে গেলেও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল কেন গেলেন না এ প্রশ্ন এখনো অজানা শরিকদের মাঝে। জোটকে জানানো হয়নি এ প্রশ্নের উত্তর।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির শীর্ষনেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বয়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এ রকম তো হওয়ার কথা ছিল না। যারা গেলেন তারা নিজেরাও বলেছেন এই সংসদ মানি না। সংসদে যারা যাবেন তারা বেইমান, মীরজাফর। গণফোরামে যেটা হয়েছে তাদের দুজন সংসদে গেছেন এর মধ্যে একজনকে বের করে দেয়া হয়েছে আরেকজন রয়ে গেছেন। একবারে বিপরীতমুখী দুটি সিদ্ধান্ত। কিন্তু সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখা তো দেয়নি কেউ। বিএনপি পরে এটাতে সুবিধা পেয়েছে। ড. কামাল একজন বিজ্ঞ আইনজীবী, খ্যাতিমান মানুষ, তার দল যেহেতু এরকম করেছে তাহলে বিএনপি করতে পারবে না কেন। তারাও গেছে। সেখানেও একটি মজার বিষয় আছে। চারজন সংসদে গেছেন কিন্তু দলের মহাসচিব যাননি। এটার ব্যাখা কী তাও তারা বলেন নাই।

এদিকে ৯ মে জোটের মধ্যে থাকার অভ্যন্তরীণ ‘অসঙ্গতি’ দূর করে অধিকার আদায়ের জন্য ঘুরে দাঁড়াতে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের আহ্বান করেন শরিকদল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। এক মাসের মধ্যে এসব সুরাহা সমাধানের জন্যও আল্টিমেটাম দেন তিনি। এরপর দীর্ঘ প্রায় ২ মাস পর ১০ জুন ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক হলেও এতে উপস্থিত হন ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন ও শীর্ষনেতা মাহমুদুর রহমান মান্না। ওইদিন ড. কামাল হোসেন উপস্থিত না থাকায় কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই স্টিয়ারিং কমিটির সভা মুলতবি করা হয়। এরপর একমাস পেরিয়ে গেলেও মুলতবি সভা আর আয়োজন করা হয়নি। বৈঠকে নিজেদের ভেতরকার মান-অভিমান এবং দূরত্ব কমিয়ে আনার উদ্যোগ খুব একটা কাজে আসেনি। সরকারবিরোধী আন্দোলনসহ ভবিষ্যতে একসঙ্গে পথ চলার কর্মকৌশলও ঠিক করতে পারেনি তারা। সে বৈঠকে কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের দেয়া আলটিমেটাম ইস্যুতেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সে বৈঠকে সরকারবিরোধী দলগুলো নিয়ে জোটকে আরো শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেয়। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যোগ দেয়ার জন্য বাম গণতান্ত্রিক জোট, ইসলামী ঐক্যজোটসহ বিভিন্ন সরকারবিরোধী দলকে আহ্বান করা হয়। কিন্তু তাদের আহ্বানকে বিবেচনায় নেয়া তো দূরের কথা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও ইসলামী ঐক্যজোট।

জাতীয় ইস্যুতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন না করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং নিজেদের দেয়া আল্টিমেটামের জবাব না পাওয়ার ক্ষোভে-অভিমানে ঐক্যফ্রন্ট ছেড়েছে কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ। গত সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে জোট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়ার ঘোষণা দেন দলটির সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।

সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় ইস্যুতে ঐক্যফ্রন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের সব সমস্যা সমাধানে তাদের পাশে থেকে সম্পূর্ণ নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করব। একই সঙ্গে গণতন্ত্র রক্ষায় প্রয়োজনে সব দলের সঙ্গে কাজ করব।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে কাদের সিদ্দিকী বলেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন পৃথিবীকে অবাক করা এক প্রহসন! এর আগে বিশ্বের কেউ এমন প্রহসনের নির্বাচন দেখেনি। নির্বাচন-পরবর্তী ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান ছিল দেশবাসীর ইচ্ছার প্রতিফলন।

ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের সংসদের যোগ দেয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, গণফোরামের প্রার্থী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর জাতির পিঠে ছুরি মারেন। এরপর মোকাব্বির খানকে ড. কামালের রুম থেকে বের করে দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর আবার তাকে পদ দেয়া আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। এদিকে আবার বিএনপিতে একই অবস্থা। তাদের কেউ শপথ নিল, বহিষ্কার হলো, আবার সংসদে গেল। তিনি আরো বলেন, সংসদে যদি যেতেই হয় তবে কেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গেলেন না? আমার কাছে এসব স্পষ্ট না, আবার জাতির কাছেও এটা অস্পষ্ট। তাই অতীতে যেমন সব আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলাম, এবার সব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখব। কাদের সিদ্দিকীর ঐক্যফ্রন্ট ছেড়ে যাওয়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয়ক ও গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুব্রত চৌধুরী মানবকণ্ঠকে বলেন, তিনি কীভাবে জোটে আসছেন এবং কীভাবে চলে গেলেন তা আমি জানি না। তবে আমি যতটুকু জানি, তিনি জোট গঠনের প্রায় ১ মাস পরে স্বেচ্ছায় জোটে এসেছিলেন এবং স্বেচ্ছায় চলে গেছেন। তার চলে যাওয়ায় জোটের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।

কাদের সিদ্দিকীর আল্টিমেটাম জবাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কাদের সিদ্দিকী তো জোটের শীর্ষ নেতা। তার তোলা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করে সুরাহা করা তো তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু তিনি দায়িত্ব পালন করেননি। আর তিনি যে কারণে জোট ছেড়েছেন এ সমস্যা স্টিয়ারিং বৈঠকে সমাধান করা যেত।

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...