বৃষ্টিও বাঁচাতে পারেনি সাকিবদের


poisha bazar

  • মহিউদ্দিন পলাশ
  • ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০১:৩৭

বাংলাদেশের ক্রিকেটে বৃষ্টি প্রায় সব সময়ই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। গত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও অস্ট্রেলিয়ার কাছে নিশ্চিত হারা ম্যাচ বৃষ্টির কল্যাণে এক পয়েন্ট পেয়ে সেমিতে যাওয়ার লড়াইয়ে টিকে ছিল। এই ম্যাচ হেরে গেলে বাংলাদেশ আসর থেকে বিদায় নিত। সেমিতে যাওয়ার লড়াইয়ে টিকে থাকার পর নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সেমিতে উঠেছিল। যা ছিল আইসিসির কোনো আসরে বাংলাদেশের সেরা সাফল্য। এবার আফগানিস্তানের বিপক্ষেও বৃষ্টি যথেষ্ট পরিমাণে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। যেখানে চতুর্থ দিনই অলআউট হওয়ার শঙ্কা জেগেছিল, সেখানে বৃষ্টি এসে তা রুখে দেয়।

খেলা গড়ায় পঞ্চম দিনে। এখানেও বৃষ্টি ছিল বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। আগের দিন শেষ বিকেলে শুরু হওয়া বৃষ্টি থেমে থেমে রাতভর হয়েছে। তা অব্যাহত থাকে ভোরের আলো ফুটে ওঠার পরও। রোদ-বৃষ্টির খেলার পর সাড়ে চার ঘণ্টা সময় নিয়ে বেলা একটায় শুরু হয়েছিল খেলা। ওভার ছিল ৬৩টি। ৬ উইকেটে ১৩৭ রান নিয়ে খেলা শুরু করে। কিন্তু মাত্র ১৩ বলে ৭ রান যোগ করার পর আবার বৃষ্টি আসে। পুনরায় খেলা শুরু হওয়া নিয়েই জাগে শঙ্কা।

এদিকে আফগানিস্তানের প্রয়োজন ছিল ভালো ৪টি বল। কিন্তু তার আহেতো খেলা শুরু হতে হবে। এবারো রোদ-বৃষ্টির খেলা শেষে বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে মাঠে গড়ায় খেলা। মেয়াদ ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। হবে ১৮.৩ ওভার। এরপর বৃষ্টি আর কি করতে পারে বাংলাদেশের জন্য? তাই বাকিটা ছেড়ে দেয় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ওপর। যাও বাকিটা তোমরা খেলে অর্জন করে নাও। কিন্তু আফগান গোলা-বারুদে ভয়ে তটস্থ বাংলাদেশ এই সময়টাও টিকে থাকতে পারেনি। ৩.২ ওভার বাকি থাকতে অলআউট হয়ে যায়। হার মানে ২২৪ রানে। ৩০ রান যোগ করে বাংলাদেশ অলআউট হয় মাত্র ১৭৩ রানে।

এই হার সাদা পোশাকের ক্রিকেটে আফগানিস্তান বাংলাদেশের গায়ে কালিমা লাগিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ তাদের টেস্ট ক্রিকেটের যাত্রা লগনে এভাবে জয় তো দূরে থাক, কোনো দলকে সামান্যতম চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিতে পারেনি। হারই ছিল নিত্য সঙ্গী। সেই সব হার ছিল আবার মোটা দাগে। সেখানে আফগানিস্তান তাদের তৃতীয় টেস্টেই বাংলাদেশকে নিয়ে ছেলেখেলায় মেতেছে। শুরু থেকে সেই যে ম্যাচে প্রাধান্য বিস্তার করেছে, তা একটিবারের জন্যও আলগা হতে দেয়নি।

বাংলাদেশকে ম্যাচে ফিরতে দেয়নি। সর্বত্রই প্রাধান্য বিস্তার করে নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়ে তবেই নিজেদের করে নিয়েছে টেস্ট। এর মাধ্যমে তারা শামিল হয়েছে নতুন ইতিহাসে। তৃতীয় টেস্টে দ্বিতীয় জয়। এই ইতিহাস আছে শুধুই অস্ট্রেলিয়ার। তাদের পেছনে পড়ে গেল ইংল্যান্ড, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তানসহ টেস্ট খেলুড়ে বাকি দেশগুলোও। আর নেতা হিসেবে রশিদ খান গড়লেন এক টেস্ট একাধিক ইতিহাসও। প্রথমেই টেস্ট ক্রিকেটে সর্বকনিষ্ঠ অধিনায়ক হিসেবে টস করা, এরপর প্রথম ইনিংসে ৫১ রান করার পর ৫ উইকেট নিয়ে ইতিহাসের চতুর্থ অধিনায়ক হিসেবে নাম লেখানো, পরে দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং করে ৪৯ রানে ৬ উইকেট নিয়ে নিজে একা বনে যান এই তালিকার মালিক। ইনিংসে ৫ উইকেট নেয়া ছিল এটি টানা তৃতীয়। ম্যাচে ১১ উইকেট নেয়া ছিল প্রথম। ম্যাচ সেরাও হন তিনি।

আফগানরা যে এভাবে ইতিহাস গড়তে পারবে তা প্রভাতে সূর্যোদয়ের পর থেকে বোঝা যায়নি। চলছিল বৃষ্টির খেলা। এই বৃষ্টির কারণে বাংলাদেশ দল বেলা ১২টার পর মাঠে যায়। কিন্তু আফগানিস্তান সকাল সাড়ে আটটায়ই চলে আসে স্টেডিয়ামে। মাঠে আসার পর থেকেই চলে তাদের আকাশের পানে তাকানো। কিছুক্ষণ পর পরই রশিদ খানরা আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলেন, বৃষ্টির মতিগতি দেখছিলেন। আর খবর নিচ্ছিলেন আবহাওয়ার পূর্বাভাসের। একদিকে বৃষ্টি বন্ধ হচ্ছে না, বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। এদিকে আবার বাংলাদেশ দলও আসেনি। সাকিব আগের দিন বলেছিলেন ম্যাচ বাঁচানোর জন্য বৃষ্টিই শেষ ভরসা! তাদের না আসাতে রশিদ খানদের ভাবনার রাজ্যে হাজারো শঙ্কা। তাহলে কি খেলা হবে না? এভাবে জয় হাতছাড়া হয়ে যাবে? টেস্ট ক্রিকেটে জয় তো আর সহজ কথা নয়।

টেনশনে এক পর্যায়ে রশি খান নিজেই এক হাতে ছাতা আর আরেক হাতে চায়ের কাপ নিয়ে আাউটফিল্ড দেখতে বের হয়ে যান। কিন্তু অবচেতন মনে দৃষ্টি চলে যাচ্ছিল আকাশের দিকে। বৃষ্টির উৎপাত দেখে রশিদ খান তার দলের ম্যানেজার সৈয়দ হযরত সাদাতের সঙ্গে আলাপ করছিলেন ম্যাচ জেতার জন্য তিনি এক ঘণ্টা সময় চান। কতটা আত্মবিশ্বাসী হলে তিনি এমন কথা বলতে পেরেছিলেন। পরে রশিদ খান সময় পেয়ে যান ২০ মিনিট বেশিও। আর এতেই কাজ হাসিল করে নেন। নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় দিন লিখে বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা হয়ে যায় কালো দিন। মাত্র তিন টেস্টের আফগান শিশুর কাছে ১১৫ টেস্ট খেলা টগবগে যুবক বাংলাদেশের করুণ হার।

পঞ্চম দিনের শুরুতে কিন্তু কিছুটা হলেও বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা ছিল। যদি টিকে যেতে পারে, তা হলে ২৬২ রান করা সম্ভব। কিন্তু বৃষ্টির কারণে এক ঘণ্টা ২০ মিনিট পাওয়াতে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়ে যায়। বিলীন হয়ে যায় আফগানদের হারের সম্ভাবনাও। তখন সাকিবদের সামনে দরজা খোলা থাকে একটিই-টিকে থেকে সভ্রæম বাঁচানো। চাপ আরো বেড়ে যায়। কিন্তু শুরু থেকেই আফগানরা যে রকম উজ্জীবিত ছিল এক ঘণ্টা বিশ মিনিট খেলার সুযোগ পেয়ে তারা আরো বেশি করে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। এই সুযোগই কাজে লাগাতে হবে। কোনো ছাড় দেয়া যাবে না। তা বোঝা যায় ম্যাচ শুরু হওয়ার প্রথম বলেই সাকিব আউট হলে।

চায়নাম্যান জহির খানের অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বল সাকিব অহেতুক খেলতে গিয়ে উইকেটর পেছনে ক্যাচ দেন। প্রথম বলেই সাকিবের (৪৪) আউট বাংলাদেশের ম্যাচ বাঁচানোর যে ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিল তাও উধাও হয়ে যায়। দেখার বিষয় হয়ে ওঠে তারা কতক্ষণ টিকে থাকতে পারেন। সৌম্য-মিরাজ মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলে আফগানদের টেনশন বাড়িয়ে দিতে থাকেন। আবার বাংলাদেশের সম্ভাবনা জাগতে থাকে ম্যাচ বাঁচানোর। কিন্তু না। তারা টিকতে পেরেছিলেন ৮.৫ ওভার। এ সময় মিরাজ রশিদ খানের খানের গুগলিতে পরাস্ত হয়ে এলবিডবিউর ফাঁদে পড়েন মিরাজ (১২)। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি।

তখনো বাকি ৯ ওভার। সৌম্য ছাড়া নেই কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যান। কে পার করবে বাকি সময়। সৌম্য স্ট্রাইক ধরে এগুতে থাকনে। কিন্তু তাইজুল আম্পায়ার পাউল উইলসনের ভুল সিদ্ধান্তের বলী হন এলবিডবিøউ হয়ে। বল তার ব্যাটে লেগে প্যাডে লেগেছিল। কিন্তু রিভিউ না থাকাতে আর নিতে পারেননি। হাঁটা ধরেন ড্রেসিং রুমের দিকে। মাত্র ১২ বল মোকাবিলা করেন তারা। শেষ ব্যাটসম্যান নাঈম হাসান আসার পর সৌম্য নিজ কাঁধে তুলে নেন দায়িত্ব। যথাসম্ভব চেষ্টা করেন নিজে স্ট্রাইক ধরে রাখতে। কিন্তু রশিদ খানের বলে পরাস্ত হন। বল তার ব্যাট ছুঁয়ে শর্ট লেগে ইব্রাহীম জর্দানের হাতে ধরা পড়ার পর শুরু হয় আফগান উৎসব। ফ্লাড লাইটের আলোতে রশিদ-মোহাম্মদ নবীদের উৎসবের ঢেউয়ে নাঈম হাসান ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন উইকেটে। সৌম্য যেন ড্রেসিং রুমের দিকে যেতেই চাচ্ছিলেন না।

মানবকণ্ঠ/টিএইচ




Loading...
ads




Loading...