আফগানদের ব্যাটিং শৈলীতে বুমেরাং স্পিন আক্রমণ


poisha bazar

  • মহিউদ্দিন পলাশ
  • ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০১:৩৩

মঙ্গলবার সূর্য অস্তগামী। সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছে। মাঠে কাজ করছেন কিউরেটর মাঠ কর্মীরা। হঠাৎ দেখা গেল কেউরেটর ভারতের প্রবীণ হিঙ্গানিকার পিচের কভার তুলে অফ স্পিন বোলিং করছেন। তার করা এক একটি বল প্রচণ্ড বাঁক খাচ্ছে। এমনিতেই চট্টগ্রাম টেস্টের পূর্বাভাস ছিল উইকেট হবে ঘূর্ণি বলের বিচরণ ক্ষেত্র। ব্যাটসম্যানদের জন্য চরম পরীক্ষা। প্রবীণ হিঙ্গানিকারের বল এমন বাঁকা খাওয়ার পর সেই ধারার আরো বদ্ধমূল হয়। খেলা হবে স্পিন বনাম স্পিন। সাকিব বনাম রশিদ খান। সকালে দুই দলই সেরা একাদশে চারজন করে স্পিনার রাখে। আফগানরা একজন পেসার রাখলেও বাংলাদেশ কোনো পেসারই রাখেনি। সেখানে একজন ব্যাটসম্যান বাড়ানো হয়। এক থেকে নয় পর্যন্ত লম্বা ব্যাটিং লাইন। দশ নম্বরে তাইজুলও মোটামুটি ভালো ব্যাািটং করে থাকেন। যাতে আফগানদের বৈচিত্র্যময় স্পিন আক্রমণে কাবু হতে না পারে দল। বাকি থাকে শুধু মাঠের লড়াই দেখার।
কিন্তু এ কী?

কোথায় সেই বাঁক। কোথায় ঘূর্ণি বলের মন্ত্র। উইকেট করছে স্বাভাবিক আচরণ। যেখানে সহজেই বিচরণ করছেন আফগান ব্যাটসম্যানরা। বাংলাদেশের জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছে উইকেট। উইকেটের এই রকম চরিত্র বদলে যাওয়ার কারণে দিনটি আর বাংলাদেশ করে নিতে পারেনি। উল্টো এখন তারা চাপে। রহমত শাহর (১০২) সেঞ্চুরি আর সেঞ্চুরির অপেক্ষায় থাকা আসগর আফগানের অপরাজিত ৮৮ রানে ভর করে দিনটি আফগানরা নিজেদের করে নিয়েছে। দিন শেষে তাদের পুঁজি ৫ উইকেটে ২৭১ রান। স্পিন উইকেট মানেই সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ‘বিষ’ ছড়ানো বাড়বে। যেখানে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করা খুবই কঠিন হয়ে উঠবে। বাংলাদেশকে সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গে দৌড়াতে হবে। কাজটি কিন্তু হবে খুবই কঠিন।

এ রকম অবস্থায় পড়ে পুড়তে না হলে আজ আফগানদের দ্রæতই অলআউট করতে হবে। তারপর নিজেদের ভাণ্ডার করতে হবে সমৃদ্ধ। যদি এই সূত্র মেলাতে না পারা যায়, তা হলে সাগরিকায় সার্বক্ষণিকই চাপে থাকতে হবে স্বাগতিকদের। বাংলাদেশের জন্য হতাশা আর নিরানন্দ দিনে বাংলাদেশের তৃতীয় বোলার হিসেবে শততম উইকেট নেয়া তাইজুল ইসলাম মনে করেন এখনো ম্যাচে আছে বাংলাদেশ। আফগানরা রান খুব বেশি করতে পারেনি। দ্রæতই তাদের অলআউট করা সম্ভব। ঘটতে পারে মিরাক্কল। ১০ রানে পড়তে পারে ৫ উইকেট!

সাগরিকায় উইকেট যে আচরণ করেছে তা চমকে যাওয়ার মতো। এর আগে উইন্ডিজের বিপক্ষে এ রকম উইকেট বানিয়ে কাবু করা হয়েছিল তাদের। সেই টেস্টেও একাদশে ছিল না কোনো পেসার। কিংবা তারও আগে মিরপুরে ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়াকেও শিকার করা হয়েছিল স্পিনারদের স্বর্গরাজ্য বানিয়ে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক পেসার (কামরুল ইসলাম রাব্বি) থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ছিলেন দুই (মোস্তাফিজ ও শফিউল) পেসার। কিন্তু এবার বাংলাদেশের পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে চলেছেন আফগান যুদ্ধারা। বাংলার জমিনে তাদের ব্যাটসম্যারা করছেন নৃত্য। তাদের নৃত্য থামাতে দলনেতা সাকিব একে একে আটজন বোলার ব্যবহার করেছেন। কিন্তু কামিয়াব হতে পারেননি।

দিনটি যে লাগাতর আফগানদের ছিল না তা কিন্তু নয়। প্রথম শেসনে ৩ উইকেট ফেলে দিয়ে বাংলাদেশ চালকের আসনেই ছিল। প্রথম ঘণ্টায় রান ছিল ১৬ ওভারে ১ উইকেটে মাত্র ২৫। ইহসানউল্লাহকে আউট করে বাংলাদেশের হয়ে দ্রæততম একশ’ উইকেট নেয়ার কীর্তি গড়েন তাইজুল। লাঞ্চ বিরতিতে যাওয়ার আগে রানের গতি বাড়লেও উইকেট পড়ে আরো ২টি। রান ছিল তখন ৩ উইকেটে ৭৭। দুই ওপেনারকে তাইজুল ফিরিয়ে দেয়ার পর মাহমুদউল্লাহ হাসমতউল্লাহ শহীদিকে ফিরিয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লাঞ্চ বিরতি হয়ে যায়। তখনো উইকেট পূর্বাভাস অনুযায়ী বার্তা দিয়ে যাচ্ছিল। আফগানিস্তান গোটা দিন টিকতে পারবে কি না এ নিয়েও কথা হচ্ছিল। কিন্তু কাবুলিওয়ালা হয়ে লাঞ্চের পর রহমত শাহর সঙ্গে জুটি বাধেন সাবেক দলপতি আসগর আফগান। তারা উইকেটের সঙ্গে গেঁথে যান। ঠলানোর কোনো ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের স্পর্ধার সামনে ¤øান হয়ে যেতে থাকে ঘূর্ণি বলের কারিগরদের। জুটি ভাঙতে ৪৪ ওভারের সময় সেøা মিডিয়াম পেসার সৌম্য সরকারের হাতেও বল তুলে দিয়েছিলেন সাকিব। কিন্তু ফলাফল শূন্য। যে কারণে চা বিরতি পর্যন্ত কোনো উইকেটই নেয়া সম্ভব হয়নি। এ সময় ৩৫.২ ওভারে যোগ হয় ১১৪ রান।

দ্বিতীয় সেশনটি বাংলাদেশের জন্য হতাশার হলেও আশার পাল তোলা নৌকা তখনো ভেসে যাচ্ছিল। কারণ তিন কাটির খেলায় শেষ সেশনে অনেক কিছুই ঘটান অনেক উদাহরণই আছে। কে জানে শেষ বিকেলে গিয়ে ঘটতে পারে সেই ঘটনাও! সেই সম্ভাবনাও এসে ধরা দিয়েছিল। চা বিরতির পর পরই নাঈম হাসান এক ওভারেই সেঞ্চুরিয়ান রহমত শাহ ও মোহাম্মদ নবীকে ফিরিয়ে দিয়ে তারই আলামত দিয়েছিলেন। আউট হওয়ার আগে রহমত শাহ প্রথম আফগান হিসেবে সেঞ্চুরি করে নিজেকে অমুছনীয় ইতিহাসে নিয়ে যান। কিন্তু এক ওভারে দুই উইকেট নেয়ার উচ্ছ¡াসে আরো রং লাগার পরিবর্তে বিবর্ণ হতে থাকে। সাগরিকা থেকে দেখা যায় সূর্য তার তেজ হারিয়ে অস্তগামী হচ্ছে। বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণও শেষ বিকেলে হারাতে থাকে তেজ। দিনের বাকি সময় আর কোনো উইকেটই নেয়া সম্ভব হয়নি। আসগর আফগানের সঙ্গে জুটি বাধা আফসার জাজাইকে ঠলানোই যায়নি। সাকিব জুয়া খেলতে দ্বিতীয় শেসনে মুমিনুল- ও তৃতীয় শেসনে মোসাদ্দেকের হাতে বল তুলে দিয়েও সফল হতে পারেননি। ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে আসগর-আফসার ৭৪ রান যোগ করে বাংলাদেশের দিকে চোখ রাঙানি বাড়িয়ে দেন। ৯৬ বলে ক্যারিয়ারের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি করা আসগর দিন শেষে ৮৮ রানে অপরাতিজত। তার সঙ্গে ৩৫ রানে অপরাজিত আফসার। আফগানদের এমন ব্যাটিংকে দিন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে আসা তাইজুল ইসলাম মনে করেন তারা মুখস্থ ব্যাটিং করেছে। আর তারা নিজেরাও ভালো বোলিং করেছেন।

সৌম্য সরকারের ৪ ওভার বাদে সারাদিন স্পিনারদের দিয়ে বোলিং করানোর কারণে নির্ধারিত সময়ে ৯০ ওভারের পরিবর্তে খেলা হয় ৯৬ ওভার। তাইজুল সর্বোচ্চ ৩১, মিরাজ ২২ সাকিব ১৭, নাঈম হাসান ১৩ ওভার বোলিং করেন। মাহমুদউল্লাহ, মুমিনুল ও সৌম্য করেন ৪ ওভার করে। মোসাদ্দেক করেন ১ ওভার।

মানবকণ্ঠ/টিএইচ




Loading...
ads




Loading...