হজযাত্রীদের স্বাস্থ্যগত প্রস্তুতি



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৮ জুলাই ২০১৯, ২১:২৩

মুসলমানদের মধ্যে যাদের আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য রয়েছে তাদের হজ পালন বাধ্যতাম‚লক করা হয়েছে ইসলাম ধর্মে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মুসলমান হজব্রত পালন করেন। হজব্রত পালনকালে হাজিদের স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এত বিপুল সংখ্যক মানুষের ভিড়, হজব্রত পালনের জন্য শারীরিক পরিশ্রম এবং সৌদি আরবের পরিবেশগত ভিন্নতা ইত্যাদি মিলিয়ে হাজিরা নানারকম স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হন।

হাজিদের স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আমাদের দেশে যেমন হাজিক্যাম্পে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়, তেমনি সৌদি সরকারও প্রতিবছর হাজিদের স্বাস্থ্য রক্ষার ব্যাপারে আগাম দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে। যেমন ইতোপূর্বে সার্স এবং বার্ড ফ্লু এই দু’টি রোগের ব্যাপারে দেয়া হয়েছিল আগাম সতর্কতামূলক নির্দেশনা। এদিকে বিভিন্ন মেডিক্যাল জার্নালে হাজিদের স্বাস্থ্য রক্ষায় করণীয় নিয়ে বেশ কিছু গবেষণালব্ধ নিবন্ধ ছাপা হয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম মেডিকেল জার্নাল বিএমজে বা ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের ৩৩০ ভলিউমে প্রকাশিত এক নিবন্ধে দুই গবেষক আব্দুল রশীদ এবং আজিম শেখ বলেছেন, গরমজনিত শারীরিক অসাড়তা এবং হিটস্ট্রোক বা গরমজনিত অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শীতকালে হজ হলেও মক্কার গড় তাপমাত্রা দিনে ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং রাতে ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড-এর মধ্যে থাকে। এছাড়া বলা হয়েছে, মাথা উন্মুক্ত থাকার কারণে পুরুষের মধ্যে গরমজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কিছুটা বেশি। এজন্য হজের সময় সাদা ছাতা ব্যবহারের উপদেশ দেয়া হয়েছে এই নিবন্ধে।

নিবন্ধে হাজিদের মধ্যে সংক্রামক রোগের ঝুঁকির বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে মেনিনগোক্কাল মেনিনজাইটিস বা মেনিনগোকক্কাস নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত ইনফেকশনের বিষয়টি বেশ সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত বলে মত দিয়েছেন গবেষকরা। উল্লেখ্য, ১৯৮৭, ২০০০ এবং ২০০১ সালে হাজিদের মধ্যে মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত এই ইনফেকশন দেখা দিয়েছিল। অন্যান্য ইনফেকশনের মধ্যে শেভ বা ক্ষৌরকর্ম করার প্রাক্কালে এইচআইভি, হেপাটাইটিস-বি এবং সি এর ঝুঁকির কথাও এসেছে এই গবেষণায়।

সংক্রামক রোগ সম্পর্কে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে আর একটি নামকরা মেডিকেল জার্নাল, দ্য ল্যানসেট। ল্যানসেটের ৩৬৭ ভলিউমে প্রকাশিত এক গবেষণায় সার্স, বার্ড ফ্লু এবং রক্তক্ষরা জ্বর সম্পর্কে বিশে সতর্কতা অবলম্বনের উপদেশ দেয়া হয়েছে।

কিন্তু প্রত্যেকটি গবেষণাপত্রে এ কথাও বলা হয়েছে যে, এইসব স্বাস্থ্য ঝুঁকির প্রায় সবই প্রতিরোধ করা সম্ভব কিংবা এড়ানো সম্ভব সতর্কতাম‚লক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে।

প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলো হলো-

১. হজ পালনের অদম্য আকাক্সক্ষা নিয়ে হজের উদ্দেশে যাত্রা করার প্রাক্কালে একজন হাজির কাছে কোনো কিছুকেই আর বাধা মনে হয় না। এই মানসিকতার বশবর্তী হয়ে অনেকে অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে পড়েন। ফলে দেখা যায় হজ যাত্রার আগেই হাজিক্যাম্পে তিনি পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। এটা কখনোই কাম্য নয়। হজের শুরুতেই তাই শক্তি সঞ্চয়ের জন্য ধীর স্থির থাকতে হবে। অহেতুক ছোটাছুটি এখানে কাম্য নয়।

২. হজের সময় রোদ এড়াতে কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা যেতে পারে। দরকার হলে মাথায় সাদা ছাতা ব্যবহার করতে হবে। গরমজনিত ঝুঁকি এড়াতে প্রচুর পানি পান করতে হবে। রাতে ভ্রমণ করতে হবে। কিছুটা লবণাক্ত খাবার এ সময়ে দরকার হয়, ঘামের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়া লবণের ঘাটতি মেটানার জন্য।

৩. শরীরের পানি স্বল্পতা এড়াতে সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি রাখতে হবে। অতিরিক্ত ঘামের কারণে সৃষ্ট শারীরিক অবসাদ কাটাতে খাবার স্যালাইন গ্রহণ করা যেতে পারে। এই স্যালাইন ডায়রিযা হলেও উপকারে আসে। কাজেই সঙ্গে নিতে পারেন খাবার স্যালাইনও।

৪. বেশিরভাগ হাজিরাই গলাব্যথা, কাশি, ঘনঘন হাঁচি, সর্দি এবং জ্বরে ভুগে থাকেন। হঠাৎ পরিবেশ পরিবর্তনের জন্য এমন হয়ে থাকে। এ সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সাধারণ কিছু ওষুধপত্র যেমন- ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল, হাঁচি-সর্দির জন্য ফেক্সোফেনাডিন জাতীয় ওষুধ, কাশির জন্য এডোভাস সিরাপ কিংবা সিনেকড ট্যাবলেট গ্রহণ করা যেতে পারে। এগুলো অল্পকিছু করে সঙ্গে নিয়ে যাওয়াই ভালো।

৫. এ ছাড়া হজ পালনের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পর থেকে মাল্টিভিটামিন (ফিলওয়েল গোল্ড/সিলভার) গ্রহণ করা উচিত। কারণ হজের দিনগুলোতে সুষম খাবারের অভাব দেখা দিতে পারে। সেই ঘাটতি পূরণে প্রতিদিনই মাল্টিভিটামিন গ্রহণ করা উচিত।

৬. যদি কারো অ্যাজমা হাঁপানি থাকে তখন অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে হজব্রত পালনের পথে কীভাবে চলতে হবে সে বিষয়ে সম্যক ধারণা ও প্রস্তুতি থাকতে হবে। কারণ হজ পালনের সময় বেশ কিছু ধূলিময় স্থান অতিক্রম করতে হতে পারে। সে কারণে সঙ্গে রাখতে হবে হাঁপানির প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো।

৭. মসজিদে বা অন্য কোথাও চলা ফেরার সময় কড়া সুগন্ধি ব্যবহার করা উচিত হবে না। কারণ সুগন্ধি হাঁপানি এবং বিশেষ ধরনের মাথা ব্যথা মাইগ্রেনের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয় বলে মনে করা হয়।

৮. হজব্রত পালনের সময হাজিদের অনেক হাঁটতে হয়। কাজেই দেশে থাকতেই হাঁটার প্রস্তুতি নিতে হবে। হাঁটা খুব ভালো ব্যায়াম। হজের জন্য রওনা হওয়ার ৬-৮ সপ্তাহ আগে থেকেই হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে হঠাৎ অতিরিক্ত হাঁটার কারণে পায়ের মাংসপেশিতে খিল ধরতে পারে কিংবা মাংসপেশি কিছুটা ব্যথা হতে পারে।

৯. হজ পালনের সময় ভিড়ের মধ্যে একজন হাজি থেকে অন্যেজনের দূরত্ব থাকে বড়জোর ১ ফুট। এত কাছাকাছি অবস্থানের কারণে যে কোনো সংক্রামক রোগ খুব সহজেই একজন থেকে অন্যজনে ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। কাজেই ঝুঁকি এড়াতে হোটেল বা অবস্থানস্থল থেকে বের হওযার সময় মুখে মাস্ক বা মুখোশ পরা যেতে পারে।

১০. যারা চশমা ব্যবহার করেন, অতিরিক্ত একজোড়া বাড়তি চশমা তাদের সঙ্গে নেয়া উচিত। আর এই চশমার লেন্স এবং ফ্রেম প্লাস্টিক জাতীয় উপাদানে তৈরি হলে ভালো। কারণ তাতে চশমা সহজে ভাঙবে না।

১১. বাতাস ত্যাগে অজু নষ্ট হয়। হজের সময় বারবার অজু করা খুবই ঝামেলার ব্যাপার। বাতাস ত্যাগ কমাতে বা এড়াতে পেটে বাড়তি বাতাসের উদ্রেককারী খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। সমস্যা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এন্টাসিড জাতীয় ওষুধেই এই সমস্যা দূর হয়ে যায়।

১২. হজের সময় হাজিরা সাধারণত একসঙ্গে বসবাস করেন। এক রুমে এ সময়ে ৪-১০ জন করে হাজি অবস্থান করেন। এ সময়ে ব্যক্তিগত বদঅভ্যাসগুলো ত্যাগ করার চেষ্টা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, যারা একসঙ্গে অবস্থান করছেন তারা কেউই আপনার পরিবারের সদস্য নন। কাজেই আপনার সব বদঅভ্যাজনিত অসুবিধা তারা মানতে চাইবেন না। কাজেই সে রকম কোনো বদঅভ্যাস থাকলে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, প্রয়োজনে চিকিৎসা নিতে হবে। আপনার নিজস্ব সমস্যা যেন অন্যের সমস্যার কারণ না হয়, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

১৩. অনেক সংক্রামক ব্যাধি আছে যেগুলো টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়। যেমন অনেকই মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত সমস্যা এবং ফ্লু-এর জন্য ভ্যাকসিন নিয়ে থাকেন। হাজিদেরকে হাজি ক্যাম্পেই এ ধরনের ভ্যাকসিন বা টিকা দেয়া হয়ে থাকে।

১৪. হজে যাওয়ার অন্তত ২ মাস আগে দাঁতের চেকআপ করানো উচিত। দাঁতে কোনো সমস্যা থাকলে সেগুলো সারিয়ে নিতে হবে। তা না হলে দাঁতের সামান্য সমস্যা হজব্রত পালনের সময় বড় সমস্যায় ফেলতে পারে। দাঁতের তীব্র ব্যথা নিয়ে হজ পালন কষ্টসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

১৫. হজে ডায়াবেটিস রোগীর পায়ের যত্ন নেয়া জরুরি। পায়ে নরম অথচ টেকসই জুতা পরতে হবে। তা না হলে সামান্য আঘাতে পায়ে ডায়াবেটিসজনিত বড় ক্ষত তৈরি হতে পারে। এছাড়া অন্যান্য ব্যক্তিদেরও পায়ের যতœ হিসাবে নখ কাটা উচিত। যিনি শারীরিকভাবে বেশি ফিট থাকবেন হজ পালনে তিনি কম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বেন। আর এ কারণে হজের জন্য রওনা হওয়ার আগেই নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। শরীরটাকে ফিট করে নিতে হবে। সেইসঙ্গে গুছিয়ে নিতে হবে নিয়মিতভাবে গ্রহণ করা সব ওষুধপত্র ও তার প্রেসক্রিপশন। বাদ যাবে না চশমা, জুতোর মতো দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত উপকরণগুলোর কোনোটাই। অসুস্থ হলে দেরি করা যাবে না। খবর দিতে হবে কাছাকাছি অবস্থিত মেডিক্যাল ক্যাম্পে।

লেখক: ডা. সজল আশফাক

স্বাস্থ্য নিবন্ধকার ও সহযোগী অধ্যাপক, নাক কান গলা বিভাগ, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

মানবকণ্ঠ/এআইএস




Loading...
ads




Loading...