গণপিটুনি, রেণু হত্যা ও হৃদয় সমাচার

আনন্দ কুটুম

আনন্দ কুটুম। ছবি- রাহমান আজাদ।


  • ২৬ জুলাই ২০১৯, ১৭:৪৩

ডকু-ফিকশন ঢংয়ে নির্মিত আব্বাস কিয়ারোস্তমি’র 'ক্লোজআপ' সিনেমাটি নিশ্চয় দেখেছেন? গল্পটা তবুও আবার বলি..

হোসেন নামের এক ব্যক্তি একদিন আকস্মিকভাবে একটি পরিবারের সাথে পরিচিত হয়। তিনি যখন বুঝতে পারেন যে, বিখ্যাত চিত্রপরিচালক মোহসেন মাখমালবাফের ব্যাপারে পরিবারটির আগ্রহ আছে, তখন সে নিজেকে মাখমালবাফ বলে পরিচয় দেয় এবং পরিবারটিকে তার সিনেমায় কাজ করার অফার দেয়। প্রথমে এই অফার পরিবারটি গ্রহণ করে, বিনিময়ে হোসেন তাদের কাছ থেকে কিছু সুযোগ সুবিধাও নেয়। একসময় পরিবারটি যখন বুঝতে পারে যে, হোসেন একজন ফ্রড এবং সে মোটেই মাখমালবাফ নয়, তখন তারা পুলিশে অভিযোগ দায়ের করে। পুলিশ তাকে ধরে কোর্টে চালান করে।

এটা মূলত একটি সত্য ঘটনা। আব্বাস এই সত্য ঘটনার প্রায় মধ্যবর্তী অবস্থায় ঘটনাটার সাথে যুক্ত হয় এবং ফিল্ম শুট করে (অর্থাৎ ডকুমেন্টারি অংশ) বাকি যেটুকু আগে ঘটে গেছে সেটা রিক্রিয়েট করা হয় এবং তাতে অভিনয় করে হোসেন নিজেই। একটি দৃশ্যে অবশ্য মাখমালবাফ নিজেও অভিনয় করেন।

বলা হয় আব্বাসের সকল সিনেমার মধ্যে এটি অধিক মানবিক সিনেমা। এই সিনেমার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আব্বাস বলেন- এটা আমাদের জন্য খুবই লজ্জার বিষয় যে, আমরা এমন একটি সমাজ নির্মাণ করেছি যেখানে একজন বেকার যুবককে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে জীবিকা নির্বাহের পথ খুজতে হয়।

উপরের এই গল্পটি কেন বললাম, আসুন সেটা বলি।

রাজধানীর বাড্ডায় রেণুকে হৃদয় নামের যে ছেলেটি পিটিয়ে মেরে ফেলেছে সে ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। আমরা সবাই রেনুকে পিটিয়ে মারার দৃশ্য দেখেছি। ভয়ংকর, বীভৎস। ছেলেটির বয়স কত হবে? ১৫-১৬, খুব বেশি হলে ১৭? হৃদয় যখন রেনুকে পিটিয়েছে তখন তার চারপাশে শতশত মানুষ। যারা হৃদয়ের থেকে বড়, অভিজ্ঞ এবং নিশ্চয় কেউ কেউ শিক্ষিতও হবেন। সে যখন রেনুকে খুন করে তখন কিন্তু একা করেনি। সকলের সমর্থন নিয়েই করেছে। শতশত মানুষ দেখেছে, ভিডিও করেছে, মারো মারো বলে শোর তুলেছে কিন্তু বাধা দেয়নি।

আচ্ছা আপনাদের একবারও কি ঠিক মনে এই প্রশ্ন জাগেনি যে, এই ১৫-১৬ বছরের এই বাচ্চার মনে এই হিংস্রতা কোথা থেকে এলো? কোথায় পেলো এই বীভৎসতা সে? কেন সে মানুষ খুনের মত নির্দয় কাজ করতে গেলো?

হৃদয় ধরা পরেছে। হয়ত তার বিচার হবে। দেশের সিংহভাগ মানুষই চায় তার ফাঁসি হোক। হয়ত হবেও। কিন্তু এই ফাঁসির মধ্য দিয়ে কি এদেশের কিশোর অপরাধ নির্মূল হবে? মানে কোনোভাবে আমরা কি বলতে পারি যে হৃদয়ের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মধ্য দিয়ে দেশ কিশোর অপরাধ মুক্ত হবে আর কখনো এমন কিছু ঘটবে না?

তা আপনি বলতে পারেন না। আজ হৃদয়ের ফাঁসি হলেও কাল আরো অসংখ্য হৃদয়ের জন্ম হবে। কিন্তু কেন? কেন এমন নিষ্ঠুর হৃদয়দের জন্ম হয় সমাজে? মায়ের পেট থেকে শিশু তো অপরাধবিদ্যা শিখে জন্মায় না। তাহলে কেন সে অপরাধী হয়?

১. সমাজ বা রাষ্ট্র তাকে সঠিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পেরেছিলো?
২. রাষ্ট্র তার সঠিক নিউট্রেশনের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলো?
৩. সমাজ তাকে মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছিলো?
৪. রাষ্ট্র কি তাকে আইন মেনে চলার শিক্ষা দিয়েছিলো?
৫. সমাজ তাকে পজেটিভ অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলো?

যদি উত্তরগুলো 'না' হয়, তবে ভেবে বলুন তো হৃদয়ের সাথে আর কার কার ফাঁসি হওয়া উচিৎ?

বড়ই দুঃখজনক যে, আমরা এমন সমাজ নির্মাণ করেছি যে সমাজের শিশুরা মানবিক শিক্ষার অভাবে হিংস্র পশুতে রূপান্তরিত হচ্ছে। রাষ্ট্র তার সুশিক্ষার ব্যাপারে উদাসীন। এই দায় কি রাষ্ট্র বা সমাজের নয়??

লেখক- আনন্দ কুটুম : চলচ্চিত্রকর্মী ও সমালোচক।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads




Loading...