বাংলাদেশ নিয়ে বিজেপির নির্বোধ আলোচনা



  • কূটনীতিক প্রতিবেদক
  • ৩০ মার্চ ২০১৯, ০৯:৩০

অমিত শাহঅভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা অর্জনের সস্তা পন্থা হিসেবে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তার প্রতিবেশী দেশকে নিচু দেখানোর প্রতিযোগিতায় মেতেছে। কিন্তু তার প্রভাবে ভারতের পররাষ্ট্র নীতিতে যে দুর্যোগ নেমে আসার সম্ভাবনা আছে, তা মনে রাখছে না দলটি। দীর্ঘ সময়ে ভারতের জন্যই বিষয়টা ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দেবে। আর সেই জন্য যাবতীয় দায় নিতে হবে বিজেপিকে।

বিশ্বের কেউ আশা করে না ভারতের ২০১৯ নির্বাচনের আগে পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির পথে হাঁটবে বিজেপি। এ ছাড়াও লাইন অব কন্ট্রোলে (এলওসি) বাড়তি সহিংসতার পর তাদের জন্য সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি ছাড়া নির্বাচনে এগিয়ে থাকার আর কোন অস্ত্র নেই। কিন্তু বন্ধু রাষ্ট্র বাংলাদেশকে নিয়েও অপবাদ রটিয়ে দেয়া তাদের কাল্পনিক সব বক্তব্যে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে একবারও ভাবছেন না এই নেতারা। যেখানে বাংলাদেশ তেমন কোন প্রাপ্তি ছাড়াই সীমান্তাঞ্চলে ভারতকে নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে, তারপরও ভারতের এমন আচরণের প্রভাব কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

প্রাথমিকভাবে নরেন্দ্র মোদীর সরকার যৌক্তিকভাবেই ঢাকাকে জানায়, আসামের নাগরিকদের জাতীয় নিবন্ধন নিয়ে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এটি ভারতের একান্ত অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু এরপর হঠাৎ করেই বিজেপি প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ বলে বসলেন, (ভারতে থাকা) বাংলাদেশের অবৈধ নাগরিকেরা ‘উইপোকা’। শুধু তাই নয়, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদীর দেয়া হুমকিকে অনুসরণ করেই তিনি জানান, ‘তল্পি তল্পা গুছিয়ে নাও।’

অমিত শাহের এই বক্তব্যকে ঢাকা দিল্লির ‘দাফতরিক সিদ্ধান্ত নয়’ বলে জানায়। বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এ কথা জানান। আর তার পরেই ভারতীয় গণমাধ্যম অমিত শাহের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে। কিন্তু বাংলাদেশের মত গর্বিত একটি জাতি এতে খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের পাশে বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়ে রয়েছে দেশটি।

বরং অমিত শাহের এই বক্তব্য বাংলাদেশের মানুষের পাশাপাশি ভারতের বাঙ্গালি, হিন্দু এবং মুসলিমদের বিমর্ষ করেছে, যারা আসামের নাগরিক নিবন্ধন থেকে বাদ পড়েছেন। আসামের এনআরসি থেকে বাঙ্গালি হিন্দুদের বাদে দেয়ায় তাদের রক্ষায় বিজেপি বারবার দেয়া প্রতিশ্রুতি বাগড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। কেননা আসামে বাদ পড় নাগরিকদের সিংহভাগ বাঙ্গালি হিন্দু। আসামের নাগরিক নিবন্ধন থেকে বাদ পড়া তালিকাকে ‘উইপোকা’ নিধনের প্রথম ধাপ হিসেবে বর্ণনা করেছে অমিত শাহ, যেখানে হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই রয়েছে।

এই বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দারুণ সমালোচনার মুখে পড়েছেন অমিত শাহ। ফেসবুকে তাকে এক বাঙ্গালি জানায়, আমার রাজ্যের (গুজরাটের) নিরব মোদী ‘আসল ঘুণপোকা’, যে ভারতের অর্থনীতি কুঁড়ে খাচ্ছে।

অমিত শাহকে আন্দামানের জেলের দিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দেন অপর এক ব্যক্তি। যেখানে মাত্র একজন গুজরাটের নাগরিক এবং ৮০ ভাগ অবিভক্ত বাংলার মানুষ। যাদের নিয়ে কলকাতায় স্মারক রয়েছে যেখানে লেখা, ‘হিন্দু মুসলিম বুঝি না, বাংলা ছাড়া জানিনা।’

অমিত শাহের এই ‘উইপোকার’ বক্তব্যের রেশ কাটার আগেই কামান দাগের সুবরামানিয়াম স্বামী। আগরতলায় দেয়া এক বক্তব্যে তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধদের ওপর সহিংসতা বন্ধ না হলে ভারত বাংলাদেশে হামলার কথা ভাববে। যদিও বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ কোন ভূমিকায় সুবরামানিয়াম নেই। কিন্তু ভারতের টেলিভিশনের নিয়মিত মুখ তিনি এবং সেখানে প্রতিবেশী দেশকে আঘাত করে আলোচনার জন্য বিশেষভাবে তিনি আমন্ত্রিত হন। এর পাশাপাশি সংসদে নিজ দলের প্রতিনিধিও তিনি।

এটি বাড়াবাড়ি। কেননা ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার হার অনেক কম। আর এটা নিয়ে বাংলাদেশে হামলার হুমকি দেয়া উন্মাদনা ছাড়া আর কিছু নয়।

কিন্তু এই উন্মাদনার পেছনেও রয়েছে এক পরিকল্পনা। সাম্প্রদায়িক বিভক্তি বাড়ানোর এক পরিকল্পনার অংশ এটি। বাংলাদেশকে আঘাত করা এই শক্তি পশ্চিম বঙ্গের সীমান্তঞ্চলেও আসামের মত নাগরিক নিবন্ধন চায়। অবশ্য বিষয়টি করার ক্ষেত্রে বিজেপি এরই মধ্যে সাবধান করে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। তবে আসামের নাগরিক নিবন্ধন সাপে-বড় হয়েছে মমতার জন্য। কেননা সেখানে শুধু মুসলিমদের নয়, এর পাশাপাশি বাঙ্গালিদের নাগরিকত্বও বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে সাম্প্রদায়ীক রাজনীতির যে খেলা সেখানে বিজেপির থেকে এগিয়ে থাকছেন তিনি।

কিন্তু অমিত শাহ ও সুবরামানিয়ামের মত বাগড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের সাথে ভারতের দ্বী-পাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশ ভূমিকা না রাখলে পূর্বের রাজ্যগুলো নিয়ে ভারতের কিছুই করার নেই। কোন কিছু না পেয়েয়েও হাসিনা সরকার এ ক্ষেত্রে ভারতকে সহযোগিতা করে গেছে। নিরাপত্তা ইস্যু থেকে শুরু করে পূর্বের রাজ্যগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা, সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতকে সাহায্য করেছে। এটা সত্য মমতা ব্যানার্জির একগুঁয়েমির কারণে তিস্তা চুক্তি সম্ভব হয়নি। কিন্তু ভারতের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কেন্দ্র সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারত। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ছোট একটি অনুরোধ ভারতের গুজরাটের একটি সরবরাহ কেন্দ্রের সুবিধার জন্য বন্ধ রাখা মোদী সরকারের জন্য কতটা যৌক্তিক তা ভেবে দেখা দরকার।

কিন্তু এই ক্ষুদ্র মনের মানুষগুলো অন্তত পক্ষে তাদের এই নির্ভরযোগ্য বন্ধুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেই পারে। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানকে বারবার এক কাতারে দেখানো তাদের কখনই উচিত নয়। তাদের নিজেদের ইতিহাস সঠিকভাবে দেখতে হবে।

অবৈধ নাগরিক নিয়ে তাদের পাগলের প্রলাপ বন্ধ করতে হবে। তাদের মনে রাখা উচিত কয়েক লাখ ভারতীয় বর্তমানে বাংলাদেশে কাজ করছে এবং আয় করছে। আর এখানে ভারতের থেকে ক্রমশ এগিয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক বেশ কিছু কার্যক্রম রয়েছে। বর্তমানে নেপাল এমনকি মালদ্বীপও ভারতের দিকে আঙ্গুল তুলে রাখছে। তাই দিল্লির উচিত বাংলাদেশ ইস্যুতে আরো যত্নবান হওয়া। পশ্চিমে যখন শত্রুভাবাপন্ন অবস্থা বাড়ছে তখন ঢাকায় শত্রুভাবাপন্ন সরকার নিয়ে দেশের সার্বিক কার্যক্রম মুকাবিলা দিল্লির জন্য বেশ কঠিন হবে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ



Loading...


Loading...