রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তোড়জোড়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তোড়জোড়
রোহিঙ্গা - ফাইল ছবি


  • সেলিম আহমেদ
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৫:৩১

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে ফের তোড়জোড় শুরু করেছে বাংলাদেশ। এর আগে দুবার তাদের ফিরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। নাগরিকত্ব, নিরাপত্তাসহ অন্তত চারটি শর্ত না মানলে কোনোভাবেই তারা দেশে ফিরবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। সাম্প্রতিককালে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় বেড়েছে অপরাধ কর্মকাণ্ড। ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়ারও চেষ্টা করেছে তারা। সৃষ্টি করতে চাচ্ছে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। ফলে তাদের ফিরিয়ে দিতে কঠোর হতে হচ্ছে সরকারকে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ফের জোরদার করতে ইতোমধ্যে অপকর্মে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ৪১টি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) কার্যক্রম প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের মহাসমাবেশের পেছনে জড়িতদের শনাক্ত করেছে তদন্ত কমিটি। তালিকায় রোহিঙ্গা নেতা ছাড়াও কক্সবাজারের এনজিও, আইনজীবী, কলেজের প্রভাষক, ‘আরআরসি’র কর্মকর্তা ও পুলিশসহ একাধিক সংগঠনের কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে। অন্যদিকে গত দুই বছরে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পরও থামছে না রোহিঙ্গা আগমন।

টেকনাফ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা আবারো নতুন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত শুক্রবার রাতে ফের বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালায় ৬ রোহিঙ্গার একটি পরিবার। তবে তাদের প্রবেশে বাধা দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির সদস্যরা। এর আগেও গত কয়েক দিনে ২২ জন রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় প্রতিহত করে বিজিবি। জালিয়াতি করে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (সিবিআইইউ) ভর্তি হওয়া আলোচিত রোহিঙ্গা শিক্ষার্থী রাহিমা আক্তার ওরফে রাহি খুশিকেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার সনদসহ সব তথ্যাদি যাচাই করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে কমিটি রিপোর্ট দেবে।

এদিকে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে নিউইয়র্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র। চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কার্যালয়ে এ বৈঠকে বসতে পারেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার চীনের ওপর আস্থা রাখছে। চীনের মধ্যস্থতায় এবং উপস্থিতিতে এরই মধ্যে দুইদেশের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ ২২ আগস্ট দ্বিতীয়বারের মতো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। এ সঙ্কট কাটাতে চীনের উদ্যোগ চলমান রয়েছে। আগামী ত্রিপক্ষীয় বৈঠকটিও চীনের উদ্যোগেই হচ্ছে। বৈঠকের তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হলেও তা চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে হতে পারে। এজন্য প্রস্তুতি চলছে।

এ প্রসঙ্গে মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সাবেক নিউজ এডিটর ল্যারি জ্যাগান ব্যাংকক পোস্টে প্রকাশিত এক কলামে লিখেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার উভয়ই রাজি হয়েছে। আবার সহায়তা (এইড), বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ও মিয়ানমার চীনের ওপর নির্ভরশীল। দুটি দেশই কৌশলগত অবস্থান থেকে বেইজিংয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকা এবং নেপিডো উভয়েরই শক্তিশালী সামরিক যোগাযোগ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, রোহিঙ্গা সঙ্কটে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার উভয়েই বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের ওপর আস্থা রেখেছে।

গত দুই বছরে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পরও যেন থামছে না রোহিঙ্গাদের এপারে আসা। টেকনাফ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা আবারো নতুন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে গত শুক্রবার রাতে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালায় ৬ রোহিঙ্গার একটি পরিবার। তবে তাদের প্রবেশে বাধা দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির সদস্যরা। এর আগেও গত কয়েক দিনে ২২ জন রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় প্রতিহত করে বিজিবি।

টেকনাফ-২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর শরীফুল ইসলাম জোমাদ্দার জানান, শুক্রবার গভীর রাতে হ্নীলা নয়াপাড়া নাফ নদীর কুতুবদিয়া ঘাট এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালায় ৬ রোহিঙ্গা। এ সময় বিজিবির একটি টহলদল তাদের আটক করে। তাদের মধ্যে ৩ জন নারী ও ৩ জন শিশু ছিল। পরে গভীর রাতে আটক রোহিঙ্গাদের একই সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়।

মেজর শরীফুল ইসলাম জোমাদ্দার বলেন, নতুন করে কোনো রোহিঙ্গা ঢুকতে দেয়া হবে না। রোহিঙ্গা প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে বিজিবি। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পাশাপাশি মাদক পাচার ঠেকাতে মিয়ানমার সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের মহাসমাবেশের পেছনে জড়িতদের শনাক্ত করেছে ৩ সেপ্টেম্বর এনজিও ব্যুরোতে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে মদদদাতা হিসেবে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে তারা হলেনÑ আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানিটি রাইটসের (এআরএসপিএইচ) সভাপতি মুহিববুল্লাহ, সহ-সভাপতি মাস্টার আব্দুর রহিম, সাধারণ সম্পাদক ও উখিয়া ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক নূরুল মাসুদ ভূঁইয়া, সংগঠনের উপদেষ্টা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দুলাল মল্লিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ফরিদুল আলম ও মাওলানা ইউসুফ, কক্সবাজার জেলা দায়রা জজ আদালতের পিপি মাহবুবুর রহমান, কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি দমন কমিশনের পিপি মো. আব্দুর রহিম ও ক্যাম্পে নিয়োজিত পুলিশের এএসআই বোরহান উদ্দিন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় ছয়টি এনজিওকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাছাড়া তদন্তে যেসব প্রতিষ্ঠান এবং কর্মকর্তাদের নাম আসছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার।

এছাড়া পরিচয় প্রকাশ হওয়ার পর কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (সিবিআইইউ) থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে রোহিঙ্গা শিক্ষার্থী রাহিমা আক্তার ওরফে রাহি খুশিকে। তার সনদসহ সব তথ্যাদি যাচাই করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে কমিটি রিপোর্ট দেবে।

সম্প্রতি জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে রোহিঙ্গা তরুণী রাহি খুশিকে নিয়ে একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রচার করে। যাতে দেখা যায়, খুশি উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে একটি এনজিওকর্মী হিসেবে নিজের স্বদেশী রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। এর পরই বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নানা খবর ও স্যোশাল মিডিয়ায় আলোচনা শুরু হয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। পুরনো ও নতুন মিলিয়ে এখন উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি শিবিরে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭ অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। এরপর গত বছরের নভেম্বর মাসে প্রথম দফা ও ২২ আগস্ট দ্বিতীয় দফা উদ্যোগ নিয়ে ভেস্তে যায়।

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...