বন্যা পরিস্থিতির অবনতি



  • মাহমুদ সালেহীন খান
  • ১৩ জুলাই ২০১৯, ১১:০৮

আষাঢ়ের বিদায় বেলায় টানা বৃষ্টিতে চিরচেনা রূপ ধারণ করেছে বর্ষাকাল। গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে ও পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। দেশজুড়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। আবহাওয়া অধিদফতর থেকে জানিয়েছে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যাবে। বন্যা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।

খাদ্যগুদামে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে মাঠ পর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিস্তা নদী তীরবর্তী চার জেলার নিম্নাঞ্চলও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নেত্রকোনা চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙ্গামাটির কিছু এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। এদিকে, সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ভারি বর্ষণের কারণে দেশের ১০ জেলার ১৩টি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটির সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান এ তথ্য জানান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের নদ-নদীগুলোর ৬২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে, এর মধ্যে ২৬টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সেসব পয়েন্টে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ৫৫১টি সেন্টারকে ঝুঁকিমুক্ত করতে কাজ করা হচ্ছে।

মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জামালপুরে ভাঙনের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে এবং লালমনিহাটে তিস্তা নদীতে ভাঙন দেখা দিয়েছে, এগুলো মোকাবিলায় কাজ শুরু হয়েছে। ত্রাণ সচিব শাহ কামাল বলেন, যেসব জেলা দুর্গত হতে পারে সেগুলোর পাশাপাশি অন্য জেলাগুলোতেও সমান প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

‘প্রতিটি জেলায় দুই হাজার প্যাকেট করে মোট ৫০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। একটি প্যাকেটে চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট, তেল, আটা, মসুরের ডাল, শিশু খাবারসহ একটি পরিবারের সাত দিনের খাবার রয়েছে।’

এখন পর্যন্ত দুই কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং দুই দফায় সাড়ে ১৭ হাজার মেট্রিক টন চাল বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়েছে জানিয়ে শাহ কামাল বলেন, কোনো জেলা প্রশাসকের চাহিদা পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে চাল দেয়া হবে।

ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মেডিকেল টিম গঠন করেছে এবং প্রচুর পরিমাণে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট প্রস্তুত রেখেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরেও কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সরকারি দফতর বন্যা মোকাবিলায় যেসব প্রস্তুতি নিয়েছে সেগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন এনামুর।
তিনি বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সেই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত জনগণকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে সব ধরনের স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সিভিল সার্জনদের নেতৃত্বে টিম গঠন করা হয়েছে যাতে পানিবাহিত রোগ বিস্তার রোধ করা যায়। খাদ্যগুদামের কর্মরতদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া মানবকণ্ঠকে জানান, দেশের ১৩ নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টা ভারি বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। গতকাল থেকে তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া ও দোয়ানি পয়েন্টে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১২.২৫ সেন্টিমিটার ও সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ৭.২০ সেন্টিমিটার, সারিগোয়াইন নদীর পানি সারিঘাট পয়েন্টে ৪৪ সেন্টিমিটার, সোমেশ্বরী নদীর পানি দুর্গাপুর পয়েন্টে ১২.৪০ সেন্টিমিটার ও কমলাকান্দা পয়েন্টে ৬.৬০ সেন্টিমিটার, কংস নদীর পানি জারিয়াজাজইল পয়েন্টে ৯.৯৫ সেন্টিমিটার, সাঙ্গু নদীর পানি দৌহাজারি পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার, মাতামুহুরী নদীর পানি লামা পয়েন্টে ১২.২৫ সেন্টিমিটার ও চিরিংগা পয়েন্টে ৬.২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে তিস্তা নদীর তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক ইরি-বোরো ক্ষেতও তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় পানিবন্দি হয়েছে প্রায় ২ হাজার পরিবার। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলার সঙ্গে চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়েছে। লালমনিরহাটের পাটগ্রামের দহগ্রাম ইউনিয়নে প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কুড়িগ্রামের রাজারহাটে পাঁচ হাজার মানুষ পানিবন্দি। নদীর তীরবর্তী ২০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

এদিকে পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় ৮টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শতাধিক গ্রামের লোকজন। অপরদিকে ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজীর মুহুরী, সিলোনিয়া, কহুয়া নদীর বাঁধ ভেঙে নিম্ন এলাকায় ১৩ স্থানে ১৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়।
চট্টগ্রামে পাহাড় ধস: বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার পোড়া কলোনি পাহাড়ে গতকাল শুক্রবার পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, বৃষ্টিপাতে কাটগড়, পতেঙ্গা, আগ্রাবাদ, হালিশহর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, চকবাজার, ষোলশহর, শুলকবহরসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। প্রবল বৃষ্টিপাতে পাহাড় থেকে বালি ও মাটি সড়কে এসে পড়ায় রাঙ্গুনিয়া ও রাউজানের বিভিন্ন সড়ক এলাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়।

সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি: অব্যাহত বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানে স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও সড়ক ডুবিয়ে ফসলের মাঠ বিশেষ করে আমনের বীজতলা তলিয়ে গেছে। অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ছে। সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার সব ক’টি উপজেলা এবং সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা নতুন করে বন্যাকবলিত হওয়ার খবর এসেছে। সুনামগঞ্জের ৮টি উপজেলায় ১৮৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৬ উপজেলায় ৫০টি মাধ্যমিক ও মাদ্রাসায় পানি ঢুকেছে। অনেক স্থানে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের ১৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে দেড় হাজার মানুষ পানিবন্দি আছেন বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে গত বৃহস্পতিবার ইউপি চেয়ারম্যান নূরুল হক জানান।

এদিকে, ছাতকে টানা এক সপ্তাহ ধরে ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার নিম্নাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সুরমা, চেলা ও পিয়াইন নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

শেরপুরে ৫৬ গ্রাম প্লাবিত: প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে শেরপুরের শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার ৫৬ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত ১৭ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। গত পাঁচ দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে শ্রীবরদীর তিনটি ও ঝিনাইগাতীর পাঁচটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। প্লাবিত গ্রামগুলোর কাঁচা ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, রোপা আমন ধানের বীজতলা, সবজিবাগান ও পুকুরের মাছ পানিতে তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন আবহাওয়া অপরিবর্তিত থাকলে পানিবন্দিদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করা হবে।

ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবেল মাহমুদ বলেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে। তবে যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নীলফামারীতে ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি: নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের দশ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পাহাড়ি ঢল আর ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে গত কয়েকদিন থেকে তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ বেড়েছে। শুক্রবার বিকেলে নদীর পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীতে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা ব্যারাজ বেষ্টিত বাঁধ রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে রেখেছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, তিস্তায় পানি বৃদ্ধির বিষয়টি জেলা প্রশাসক সার্বিকভাবে মনিটরিং করছে। আমিও এলাকা ঘুরে এসেছি। প্রয়োজন অনুযায়ী সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে তাৎক্ষণিকভাবে।

লালমনিরহাটে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সঙ্কট: ৪ দিন ধরে পানিবন্দি পরিবারগুলো রান্না করতে না পারায় তাদের মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এতে জেলার প্রায় ২০ হাজার পরিবার এখন পানিবন্দি অবস্থায় দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। শুক্রবার দুপুরে তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, আমি বন্যা এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখছি। যেখানে যেভাবে প্রয়োজন সেভাবেই সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ভেঙে যাওয়া রাস্তা মেরামতের জন্য ৫ হাজার বালুর বস্তা ও জেলায় ৬৮ টন চাল ত্রাণ হিসেবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

লামায় পরিস্থিতির উন্নতি: বান্দরবানের লামা উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সামগ্রিক উন্নতি হয়েছে। উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা মাতামুহুরী নদীর পানি নেমে যাওয়ায় শুক্রবার ভোর রাতে প্লাবিত এলাকা থেকে পানি কমতে শুরু করে। তবে বন্যায় ও পাহাড় ধসে ছয় শতাধিক ঘরবাড়ি, দোকানপাট, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ফসল ও মাছ চাষের ক্ষতি হয়েছে।

লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, শুক্রবার ভোর থেকে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি দেখা দেয়। কয়েকদিনের প্রবল বৃষ্টিপাতে ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলায় ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, কালভার্ট ব্রিজ, সবজি ও মাছ চাষের ক্ষতি হয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এএম

 



Loading...
ads


Loading...