অ্যাটেনডেন্ট সঙ্কট ট্রেন যাত্রীদের দুর্ভোগ



  • আসাদ জোবায়ের
  • ১২ জুন ২০১৯, ১০:৫৬

আন্তঃনগর ট্রেনে অ্যাটেনডেন্ট (পরিচর্যক) সঙ্কট তীব্র রূপ নিয়েছে। পরিচালনা ম্যানুয়েলে প্রতিটি কোচের জন্য একজন করে থাকার কথা; কিন্তু একজন অ্যাটেনডেন্টকে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে চার থেকে পাঁচটি কোচের। দীর্ঘ পথ ভ্রমণে এই একজনের পক্ষে চার/পাঁচটি কোচের দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে যাত্রীরা নানা রকম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

জানা গেছে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের একেকটি আন্তঃনগর ট্রেনের কোচ সংখ্যা ১৫ থেকে ১৬টি। ঈদ যাত্রায় আরো অতিরিক্ত কোচ যোগ করা হচ্ছে। কিন্তু একেকটি ট্রেনের জন্য অ্যাটেনডেন্ট গড়ে চারজনের বেশি নয়। অথচ আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনা ম্যানুয়েলের অধ্যায় ৫-এর ৫.২৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত শর্ত অনুয়ায়ী প্রতিটি কোচে একজন অ্যাটেনডেন্ট নিয়োজিত থাকার কথা। এটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় যাত্রীসেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে যাত্রীরা ট্রেনে উঠা-নামার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন না। একইসঙ্গে কোচ ও আসন খুঁজে পেতে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বিনা টিকিটে অনেক যাত্রী উঠানামা করছেন এবং আসনবিহীন টিকিটধারী যাত্রীরা অবাধে উচ্চশ্রেণির কোচে আরোহণ করায় উচ্চশ্রেণির যাত্রীরা ক্ষুব্ধ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। চলন্ত ট্রেনে টিকিট চেকিং কর্মসূচিতে অবৈধ যাত্রীদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ যাত্রীদের রেলওয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে না।

জানা গেছে, আগের মন্ত্রীর সময়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এই অ্যাটেনডেন্ট সেবা নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বর্তমান ম্যানেজমেন্ট দায়িত্ব নেয়ার পরে তা থমকে গেছে। মহানগর প্রভাতী/ তূর্ণা এক্সপ্রেসা, উপকূল এক্সপ্রেস ও ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসে অনবোড সার্ভিস বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ন্যস্ত করার জন্য দরপত্রের মাধ্যমে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত করা হলেও রহস্যজনক কারণে তা আটকে গেছে। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো- বলাকা ইন্টারন্যাশনাল, এন. সাফা কর্পোরেশন ও স্বপ্নীল অ্যাসোসিয়েট। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশসহ কার্যবিবরণীর সারসংক্ষেপ গত ১ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে রেলসচিবের দফতরে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত তার সুরাহা হয়নি। এরপর নতুন চালু হওয়া ট্রেনগুলোতেও এ ধরনের কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।

রাজশাহী রুটে নতুন চালু হওয়া বনলতা এক্সপ্রেসের একজন যাত্রী মায়িশা আক্তার। কমলাপুর স্টেশনে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ট্রেনে অ্যাটেনডেন্ট বলে কাউকে তো আমাদের চোখে পড়ে না। টিটি, খাবার সরবরাহকারী ও পুলিশ ছাড়া ট্রেনের আর কেউ যাত্রীসেবায় নিয়োজিত আছে বলে তো জানি না। তিনি বলেন, ট্রেনে উঠে সিট পাওয়াটাই বড় কথা। আর কোনো সেবা আশা করার মতো অবস্থাতে কি বাংলাদেশ এসেছে? আসেনি।

একই ট্রেনের আরেক যাত্রী দিদারুল মজুমদার বলেন, নানা সমস্যাতেই তো আমাদের পড়তে হয়। এই যেমন হিজড়ারা এসে ব্ল্যাকমেইল করে চাঁদাবাজি করে। এটা তো বন্ধ হওয়া উচিত। মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে না। কাকে করব সেই অভিযোগ? কাউকে তো পাই না।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) মো. শামসুজ্জামান লোকবলের এ সঙ্কটের কথা শিকার করে বলেন, অ্যাটেনডেন্ট (পরিচর্যক) এই মুহূর্তে কত আছে সেই তথ্য আমি দিতে পারব না। তবে সঙ্কটের কারণে আমরা ট্রেনের সব বগিতে দিতে পারছি না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, রেলের যৌবন ফিরিয়ে আনতে সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সারা দেশে রেলের উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন সেক্টরে রেলের জনবলের সমস্যা আছে। আমরা সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি।

জানা গেছে, পূর্বাঞ্চলে পুরনো জনবল কাঠামো অনুযায়ী ২১৫ জন অ্যাটেনডেন্টের পদ মঞ্জুরি ছিল। তবে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৫৬ জন, এরমধ্যে অনেকেই অবসরে গেছেন। মামলা ও অসুস্থতার কারণে আরো ৩৩ জন কর্মস্থলে অনুপস্থিত। নতুন জনবল কাঠামো অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগে ৫১২ জন অ্যাটেনডেন্ট প্রয়োজন হলেও কর্মরত মাত্র ৯০ জন। একই চিত্র ঢাকা বিভাগে, এখানে ৯১৫ জনের বিপরীতে কাজ করছেন ১৫০ জন। বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী পশ্চিমাঞ্চল রেলের পাকশী বিভাগে মঞ্জুরী পদ রয়েছে ১৩৫, কর্মরত রয়েছেন ৮৯ জন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে নূন্যতম মঞ্জুরী প্রয়োজন ২৭০ জন। একইভাবে লালমনিরহাট বিভাগে মঞ্জুরী পদ রয়েছে ১০০, কর্মরত রয়েছে ৬৬, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ন্যূনতম মঞ্জুরী প্রয়োজন ২০০ জন। বিশেষ করে এই দুই বিভাগে মঞ্জুরী পদ রয়েছে ২৩৫, কর্মরত রয়েছেন ১৫৫, বর্তমান প্রেক্ষাপটে নূন্যতম মঞ্জুরী প্রয়োজন ৪৭০ জন। সদ্য চালু হওয়া বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে প্রতিবগিতে ১ জন করে অ্যাটেনডেন্ট থাকার নিয়ম থাকলেও ১২ বগিতে মাত্র ৪ জন অ্যাটেনডেন্ট ডিউটি করছে।

সরকার আউট সোর্সিং-এর বিষয়টি গুরুত্ব দিলেও রেলওয়ে নিয়োগ বানিজ্যের কারণে সরাসরি নিয়োগে আগ্রহি। সরাসরি লোক নিয়োগ দিলে সরকারের খরচ জনপ্রতি দ্বিগুণেরও বেশি হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন- ১টি ট্রেন সরকারি অ্যাটেনডেন্ট দিয়ে চালালে রেলের ১ জন অ্যাটেনডেন্টের বেতন প্রায় ২১ হাজার টাকা। মাইলেজ দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। সব মিলে ১ জন এটেনডেন্ট-এর বেতন দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ হাজার টাকা এবং অন্যান্য সুবিধা। সেই হিসেবে ১টি ট্রেনে ২ শিফটে অ্যাটেনডেন্ট প্রয়োজন ৩০ জন। ৩০ জনের বেতন ২০ লাখ ৭০ হাজার টাকা। মালামাল আড়াই লাখ টাকা। সর্বমোট একটি ট্রেনে এই খাতে মাসিক খরচ দাঁড়ায় প্রায় তেইশ লাখ টাকা। কিন্তু বেসরকারি খাতে অ্যাটেনডেন্ট নিয়োগ দিলে একটি ট্রেনে খরচ দাঁড়ায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। তাই বেসরকারি খাতকে উত্সাহিত করা উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল মিলে মোট ৪৯টি আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনা করে। পশ্চিমাঞ্চলে ইতোমধ্যে ২টি নন স্টপ ট্রেন চালু হয়েছে। ট্রেনের নন স্টপ ভাড়া নিলেও যাত্রীসেবার বিষয়টি কেউ বিবেচনা করছে না। খবর নিয়ে জানা যায়, রেলওয়ের জামাতপন্থি একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার একগুঁয়েমির কারণে সদ্য চালু হওয়া বণলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে ক্যাটারিং সেবা পর্যন্ত বন্ধ করা হয়েছে। অথচ আন্তঃনগর ম্যানুয়েল অনুযায়ী প্রত্যেক আন্তঃনগর ট্রেনে ক্যাটারিং সেবা অবশ্যই থাকতে হবে। ১৯৯৮ সাল থেকে যতগুলো আন্তঃনগর ট্রেন চালু হয়েছে সবগুলো ট্রেনে অ্যাটেনডেন্ট সঙ্কটের কারণে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে ঠিকাদার নিয়োগ করে যাত্রীসেবা প্রদান করলেও বর্তমানে চালু হওয়া পঞ্চগড় ও বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে অ্যাটেনডেন্ট নিয়োগ করা হয়নি। পঞ্চগড় ও বণলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে ১২/১৩ বগিতে ৪ জন করে স্টুয়ার্ড নিয়োজিত আছে। মোবাইল ক্লিনার নেই এবং টিস্যু, সাবান, এরোসল ও এয়ারফ্রেশনার পাওয়া যায় না।

মানবকণ্ঠ/এসএস



Loading...
ads


Loading...