নেপথ্যের হোতাদের খুঁজছে পুলিশ



  • শাহীন করিম
  • ১২ জুন ২০১৯, ১০:২৪

বিভিন্ন সময়ে অটোমেটেড টেলার মেশিনে (এটিএম) ডিজিটাল জালিয়াতি করে বুথ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়া চক্রগুলোর নেপথ্যের হোতাদের খুঁজছে পুলিশ। সম্প্রতি ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার সময় একটি গ্রুপের সদস্য ৬ ইউক্রেনিয়ান নাগরিক গ্রেফতার হয়। তবে এটিএম বুথ জালিয়াতির ঘটনায় বিদেশি একাধিক গ্রুপ জড়িত বলে জানতে পেরেছে গোয়েন্দারা। তাদের শনাক্ত করতে নিবিড়ভাবে কাজ করছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা (সিআইডি)।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট ডিবি ও সিআইডি কর্মকর্তারা জানান, খিলগাঁও তালতলা মার্কেটের সামনে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বুথ থেকে জালিয়াতির ঘটনায় ইউক্রেনের ছয় নাগরিককে গ্রেফতার হলেও ভিতালি ক্লিমচাক নামে আরেকজন পালিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে তার বিস্তারিত তথ্য বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে সরবরাহ করা হয়েছে। এই জালিয়াতচক্রটি বিভিন্ন ব্যাংকের ৯টি বুথ থেকে অন্তত ১৫ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে তদন্তকারীরা। গ্রেফতারকৃত ছয় ইউক্রেনের নাগরিকের ক্রিমিনাল রেকর্ড জানতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

একই সূত্রমতে, এই গ্রুপে ১২-১৫ জন সদস্য জড়িত বলেও মনে করছে পুলিশ। জালিয়াত চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করতে গত এক মাসে দেশে আসা সব বিদেশি নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইউক্রেনের নাগরিকদের বিষয়ে চলছে বিশেষ নজরদারি।

এদিকে ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় মামলা করেছে সিআইডি। সোমবার সিআইডির এসআই প্রশান্ত কুমার শিকদার বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় সাত বিদেশির বিরুদ্ধে মুদ্রা পাচার আইনে এই মামলা করেন। এই সাতজনই ইউক্রেনের নাগরিক। তাদের মধ্যে ছয়জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, এই বিদেশিসহ সংঘবদ্ধ দেশি-বিদেশি জালিয়াত চক্রটি ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে তা স্থানান্তর করেছে, যা মানিলন্ডরিং আইনের ৪(২) ধারা অপরাধ। সিআইডি আসামিদের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য বের করার চেষ্টা করবে বলে জানান তিনি।

হাতেনাতে গ্রেফতার ওই ছয় বিদেশি হলেন-দেনিস ভিতোমস্কি (২০), নাজারি ভজনোক (১৯), ভালেনতিন সোকোলোভস্কি (৩৭), সের্গেই উইক্রাইনেত্স (৩৩), শেভচুক আলেগ (৪৬) ও ভালোদিমির ত্রিশেনস্কি (৩৭)। আর পলাতক ব্যক্তি হলেন ভিতালি ক্লিমচুক। ঘটনার পরপরই ২ জুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে খিলগাঁও থানায় একই আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করে ডাচ-বাংলা কর্তৃপক্ষ। ওই মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে। ডিবি ছয় আসামিকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের অনুমতিও নিয়েছে। দোভাষীর মাধ্যমে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানা গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য ও হোতাদের গ্রেফতার করতে পারলে আরো নতুন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

এদিকে এটিএম বুথ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার খবর জানাজানি হওয়ার পর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চক্রের সব সদস্যকে শনাক্তের চেষ্টা করছে পুলিশ। ঠিক কী প্রযুক্তি ব্যবহার করে জালিয়াত চক্রের সদস্যরা এভাবে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, তা জানতে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সোমবার বৈঠক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও ডাচ-বাংলা ব্যাংকের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে গভীর আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গত জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে এটিএম বুথে ‘জেক পর্টিন সিস্টেম’ নামে নতুন ধরনের এই জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। এর সূত্র ধরে তদন্ত করে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গ্রুপ ‘হিডেন কোবরা’ জড়িত বলে শনাক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তদন্ত সংস্থা। ‘ফাস্টক্যাশ ক্যাম্পেইন’ নামে চালানো ওই জালিয়াতির আগাম তথ্য বাংলাদেশের পুলিশকেও জানায় মার্কিন সংস্থাটি। গত ৩০ মে বাংলাদেশে আসা সাত ইউক্রেনীয়র ঈদের ছুটিতে বুথে রাখা বেশি পরিমাণে টাকা হাতিয়ে ৬ জুন ভারতে চলে যাওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশে বেশি এটিএম বুথ থাকায় অভিনব কায়দায় বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছিল জালিয়াত চক্রটি।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো এটিএম কার্ড ক্লোন না করেই ও পিন কোড ছাড়া অভিনব পদ্ধতিতে জালিয়াতি করার বিষয়টি বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ঘটেছে। জালিয়াত-চক্রের সদস্যরা কী প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, তা জানার জন্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দু’টি পদ্ধতিতে এই চক্রটি এটিএম বুথে জালিয়াতি করে থাকতে পারে- তা হলো শুধু এটিএম বুথের সিস্টেম হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়া অথবা এটিএম বুথের সার্ভার হ্যাকিংয়ের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়া। এখন আমরা এসব জালিয়াত চক্রের হোতাদের সন্ধান করছি।

ডিবি ও সিআইডি কর্মকর্তারা জানান, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ঘটনায় গ্রেফতার ইউক্রেনের ছয় নাগরিক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাদের পূর্ববর্তী ক্রিমিনাল রেকর্ড ও তাদের সহযোগীদের সম্পর্কেও তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পলাতক ভিতালিকে ধরতেও অভিযান চলছে। তদন্তে পুলিশ সদর দফতরের মাধ্যমে ইন্টারপোলের সহায়তা নেয়া হচ্ছে।

জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ সুপার (এসএস) মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ডিবির পাশাপাশি আমরাও এটিএম বুথ জালিয়াতির ব্যাপারে তদন্ত করছি। মানিলন্ডারিং আইনে মামলায় আর্থিক জালিয়াতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্য চক্রগুলোর সদস্যদের গ্রেফতার ও হোতাদের শনাক্তের কাজ চলছে।
গ্রেফতারকৃত ছয় ইউক্রেনের নাগরিকের জিজ্ঞাসাবাদে বিষয়ে ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাহিদুর রহমান রিপন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মুখ খোলেনি। তাই আমরা তাদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করছি। প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো তদন্ত করতে বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া হচ্ছে। আসামিরা রুশ ভাষা জানে। এজন্য দোভাষীও জোগাড় করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে পলাতক আসামি ভিতালিকে ধরতেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস




Loading...
ads




Loading...