অধিবেশনের প্রথম দিনেই সংসদ উত্তাল



  • জাহাঙ্গীর কিরণ
  • ১২ জুন ২০১৯, ১০:১৯

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন টানা তৃতীয় মেয়াদের সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনেই উত্তাল হয়ে উঠেছে জাতীয় সংসদ। স্বল্প সংখ্যক সদস্যের বিরোধী দল বিএনপি এবং সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির এমপিদের সরকারের কঠোর সমালোচনা এবং আক্রমণাত্মক বক্তব্যে বারুদ ছড়ায় শান্ত অধিবেশনে। মূলত ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখাকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর আক্রমণ শুরু হলেও সংসদ উত্তপ্ত হয় বিএনপির একমাত্র সংরক্ষিত আসনের সদস্য রুমিন ফারহানার তীর্যক বক্তব্যে। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি সংসদকে অবৈধ আখ্যায়িত করায় সরকারি দলের এমপিরা ক্ষোভে ফুঁসে উঠেন। বিএনপির অপর সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলে পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়। হৈ-হুল্লোড় আর চিত্কার-চেচামেচি করে টেবিল থাপড়ে এর প্রতিবাদ করতে থাকেন সরকারদলীয় এমপিরা। অধিবেশন কক্ষের নিয়ন্ত্রণ আনতে শেষ পর্যন্ত স্পিকার বিএনপির ওই নেত্রীর মাইক বন্ধ করে দিলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। পরে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের দাবিতে সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় শব্দটি এক্সপাঞ্জ করেন স্পিকার।

গতকাল মঙ্গলবার মাগরিবের নামাজের বিরতির পর স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হলে পয়েন্ট অব অর্ডারে সংসদে উত্তাপ ছড়ায়। চাঁদ দেখা নিয়ে বিভ্রাটসহ বিভিন্ন বিষয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য রাখেন সরকারি দলের রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, ফখরুল ইমাম, ডা. রুস্তম আলী ফরাজী, পীর ফজলুর রহমান, বিএনপির হারুনুর রশীদ, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও সরকারি দলের পংকজ নাথ।

রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, বিএনপির একজন সংসদ সদস্য নিজে শপথ নিয়ে বর্তমান সংসদ যে বৈধ, তার প্রমাণ দিয়েছেন। আবার অধিবেশনে সংসদকে অবৈধ বলে দেশের ১৬ কোটি মানুষকে অপমানিত করেছেন, ভোটারদের অবমাননা করেছেন। তিনি বিএনপির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বক্তব্য এক্সপাঞ্জের দাবি জানান। এ সময় স্পিকার কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সংসদকে অবৈধ বলা অংশটুকু এক্সপাঞ্জ করে দেন।

বিএনপির হারুন অর রশিদ ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে বিভ্রাটের সমালোচনা করে বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হচ্ছে ইসলাম। ঈদের চাঁদ দেখা কমিটি রয়েছে। চাঁদ দেখা যায় সন্ধ্যার সময়। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী প্রথমে রাত ৯টায় ঘোষণা দিলেন, কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি, ঈদ হবে না। আবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ করেই আবার বলা হলো, চাঁদ দেখা গেছে, কাল ঈদ। এ নিয়ে জনমনে মারাত্মক ভোগান্তির সৃষ্টি করেছে। আর ধর্ম যার যার, উৎসব সবার- এ কথা যারা বলেন তাদের জ্ঞানের অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, এ কথাটি যদি মানতে হয় তাহলে রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করা উচিত। চাঁদ দেখা নিয়ে বিভ্রাটের জন্য ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ জানান।

ফ্লোর নিয়ে বর্তমান সংসদকে অবৈধ বলায় সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ফ্লোর নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। টিআইবিসহ সবাই বলেছে এ সংসদ জনগণের ভোটে হয়নি। তাই খুশি হব এই সংসদের মেয়াদ যেন একদিনও না বাড়ে। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে। তাকে রাজনৈতিক কারণে জামিন দেয়া হচ্ছে না। সরকারের মিথ্যা মামলার কারণে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারছেন না। তার এমন বক্তব্যের বিরুদ্ধে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে ব্যারিস্টার ফারহানার বক্তব্য প্রত্যাহার ও এক্সপাঞ্জের দাবি জানান। পরে স্পিকার আর কাউকে ফ্লোর না দিয়ে দিনের পরবর্তী কার্যসূচিতে প্রবেশ করলে উত্তেজনার অবসান হয়।

জাতীয় পার্টির ডা. রুস্তম আলী ফরাজী ফ্লোর নিয়ে বলেন, ৯০ ভাগেরও বেশি ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ, তবুও বিক্রি হচ্ছে। আর চাঁদ দেখা নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের তড়িঘড়ি করা উচিত হয়নি। জাতীয় পার্টির পীর ফজলুর রহমান বলেন, ৭৫ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে দেশে মদ-জুয়ার লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। জঙ্গিবাদ, বাংলা ভাই-শায়খ আবদুর রহমানদের তত্পরতা বিএনপি আমলে দেশবাসী দেখেছে। কিন্তু ঈদে চাঁদ দেখানো নিয়ে জনগণকে ভোগান্তি দেয়া হয়েছে। আর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বালিশের দাম নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় চলছে।

সরকারি দলের পংকজ দেবনাথ বলেন, জনমতের চাপে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এদিন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। সম্পূর্ণ বিনা অপরাধে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃশাসন-লুটপাটের কারণেই এই ওয়ান ইলেভেনের সৃষ্টি হয়েছিল।

এর আগে ফ্লোর নিয়ে জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, টাকার অভাবে অনেক হাসপাতালে মানুষকে সুচিকিৎসা দিতে পারি না। অথচ পত্রিকায় দেখলাম, যেখানে হাসপাতাল নেই অথচ যন্ত্রপাতি কিনতে জার্মান যাচ্ছে একটি প্রতিনিধি দল। আবার অনেক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে কিন্তু সেগুলো ব্যবহার করার সুযোগ না থাকায় পড়ে আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ যেসব যন্ত্রপাতি পড়ে আছে দয়া করে আমাদের দিয়ে দেন। জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম বলেন, দেশে আসলে হচ্ছেটা কি? নির্বাচনের আগে এই সরকারের একটি প্রতিশ্রুতি ছিলো দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র। এখন দেখতে পাচ্ছি কিছুই হচ্ছে না। ব্যাংক থেকে অনেক টাকা গায়েব হয়ে গেছে। এত টাকা গেল কোথায়? বলা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ ছড়িয়েছে তাহলে ব্যাংকের টাকা গেল কোথায়। ঋণের টাকা ফেরত আসছে না। আসলে টাকা যাচ্ছে কোথায় সরকারের সেটা খতিয়ে দেখা উচিত।

মানবকণ্ঠ/এসএস




Loading...
ads




Loading...