ডায়াবেটিস প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা



সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ডায়াবেটিস মহামারী আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব বয়সী মানুষই আজ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বর্তমানে সারাবিশ্বে ডায়াবেটিস রোগের বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান নবম। বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগী রয়েছে প্রায় ১ কোটি। বছরে বাড়ছে আরো এক লাখ রোগী। কেবলমাত্র সচেতনতার অভাবেই এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাংলাদেশে ২ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। একটা সময় ছিল যখন মনে করা হতো ডায়াবেটিস ৪০ এর পরে হয়। বর্তমানে সব বয়সরে মানুষই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে এমনকি হরমোন সংশ্লিষ্ট এই রোগের প্রকোপ শহর ছাড়িয়ে এখন গ্রামেও বেড়ে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বৈশ্বিক পরিবর্তনের ফলাফল। তাই জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে পাঠ্যপুস্তকে সঠিক জীবনাচরণ সম্পর্কে তথ্য অন্তর্ভুক্তি, মিডিয়ায় গণসচেতনতা, শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক নেতাদের প্রশিক্ষণ, সমাজকর্মীদের সচেতন করে তোলা, সচেতনতায় ক্যাম্প ইত্যাদির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বংশগত বিষয়টি যেহেতু এড়ানো সম্ভব নয় তাই অন্য ঝুঁকিগুলো কমিয়ে ফেলতে হবে।

৩৫ বছরের পর থেকে বছরে অন্তত একবার রক্তের সুগার পরীক্ষা, ওজন হ্রাস, দুর্বলতা, পিপাসা বৃদ্ধি বা ঘন ঘন প্রস্রাব ইত্যাদি কোনো লক্ষণ দেখা গেলে অবিলম্বে রক্তের সুগার পরীক্ষা করে নেয়া, পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস আছে এমন কেউ সন্তান ধারণের পর রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা, গর্ভধারণের ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে অবশ্যই সুগার পরীক্ষা করা ইত্যাদির মাধ্যমে ডায়াবেটিস শনাক্ত করা যায়। রোগীদের নিজেরই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার দক্ষতা অর্জন করা দরকার। জীবনপ্রণালির কাক্সিক্ষত পরিবর্তন, রোগের লক্ষণ ও ঝুঁকি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন, কখন কেন সুগার পরীক্ষা করা জরুরি, পরীক্ষার সহজলভ্যতা ও ব্যয় সংকোচন এ বিষয়গুলো সবার জানা উচিত।

হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস। বলেন, ডায়াবেটিস কোনো প্রাণঘাতী রোগ নয়। তবে সব রোগের উপসর্গ হিসেবে কাজ করে। নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস আক্রান্ত একজন ব্যক্তি শতভাগ সুস্থ থেকে দীর্ঘায়ু লাভ করতে পারেন। ওষুধের ব্যবহার ছাড়া শুধু ব্যায়াম, খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাত্র ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিনে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

ডায়াবেটিস সমিতির মহাসচিব অধ্যাপক একে আজাদ খান বলেন, অপরিকল্পিত জীবন পদ্ধতি এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে ডায়াবেটিস মহামারী আকার ধারণ করেছে। সচেতন হয়ে সুশৃক্সক্ষল জীবনযাপন করলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বেসরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবুদস সালাম বলেন, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি ডায়াবেটিসে ভুগছেন। আগে প্রতিদিন ৫৬ ইউনিট করে ইনসুলিন নিতেন। বর্তমানে ইনসুলিন ও ওষুধ ছাড়াই ব্যায়াম ও খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুস্থ আছেন। ঢাকার মোহাম্পুরের বাসিন্দা ফরিদা আক্তার জানান, আগে প্রতিদিন ১০০ ইউনিট করে ইনসুলিন নিতে হতো। এখন চিকিৎসকের পরামর্শ পালন করে তিনি ইনসুলিন ছাড়াই সুস্থ আছেন। ডা. ফজলে রাব্বী খান বলেন দুঃখজনক হলেও সত্য, পত্রপত্রিকায় চিকিৎসাবিষয়ক অনেক লেখালেখি প্রকাশিত হওয়ার পরও মানুষের সচেতনতা আশানুরূপ বাড়ছে না।

ফলে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীরা জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যে অসুখটাকে মাত্র অল্প কিছু টাকার ওষুধ খেয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, শুধু সচেতনতা ও সঠিক নির্দেশনার অভাবে লাখ লাখ টাকা খরচ করেও অনেক সময় শেষ রক্ষা হচ্ছে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার ও দেশ। অধ্যপাক ডাক্তার ফারুক পাঠান বলেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে রোগীর হৃদযন্ত্র, কিডনি, চোখ, রক্তনালি, স্নায়ুতন্ত্রসহ শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গে জটিলতা দেখা দেয়। তাই প্রতিরোধের দিকে নজর দিতে হবে।

ঘরে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করুন। তারপর বাইরে, যেমন অফিসে বা স্কুল-কলেজেও। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং ডায়াবেটিস প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতামূলক নিবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। ফাস্টফুড ও কোমলপানীয়র প্রতি আসক্তির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে নিজেরা জানুন, অন্যদেরও জানান। ধূমপান ডায়াবেটিসের জটিলতা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। তাই এটা সম্পূর্ণরূপে বাদ দিতে হবে। হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট বা সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট হাঁটা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমিয়ে দেবে।

মানবকণ্ঠ/এএম



Loading...


Loading...