সূর্য না ডোবার দেশে রোজা রাখে যে ভাবে



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৮ এপ্রিল ২০১৯, ০৭:৪২

রমজান মাস আসছে। সারা বিশ্বের মুসলিমরা রোজা রাখবেন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। পৃথিবীর জনসংখ্যার ২২ শতাংশ বা ১.৬ বিলিয়ন মুসলিম এই পবিত্র মাসে সিয়াম পালন করেন। কিন্তু যে দেশে কখনোই সূর্য অস্ত যায়না বা খুব অল্প সময়ের জন্য অস্ত যায় সেখানের মুসলিমরা কীভাবে রোজা রাখবেন?

সুমেরুবৃত্তে বা উত্তর মেরুতে যারা অবস্থান করেন তারা রোজায় অনেক চ্যালেঞ্জিং সময় পার করেন, কারণ সেখানে ২৪ ঘণ্টাই সূর্যের আলো থাকে। লেপল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও সুইডেন এ গ্রীষ্মের সময় সূর্য অস্তই যায়না বা খুবই কম সময়ের জন্য অস্ত যায়। তেমনি শীতকালেরও একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে সূর্য উঠতে দেখা যায় না। গ্রীষ্মকালের এ সময়টাকে ‘মেরু দিন’ এবং শীতকালের এই সময়টাকে ‘মেরু রাত্রি’ বলা হয়ে থাকে। স্ক্যান্ডেনেভিয়া অঞ্চলের দেশ সুইডেনের কিরুনা শহরটি আর্কটিক সার্কেল বা উত্তর মেরু বলয়ের আরও ১৪৫ কিলোমিটার ভেতরে। এখানে গ্রীষ্মকালেও পর্বত চূড়াগুলো সাদা বরফে ঢাকা থাকে। পুরো গ্রীষ্মকালেই রাতের আকাশ থাকে অনেকটাই আলোকিত, পুরো শীতকালে দিনের আলোর দেখা মেলা ভার।

মাত্র ১০০ বছরের কিছু আগে বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে কিরুনা শহরের পত্তন হয়েছিল মূলত লোহার খনিকে ঘিরে। খনির শহর কিরুনায় সব মিলিয়ে হাজার বিশেক বাসিন্দার মধ্যে একটা বড় অংশই অভিবাসী শ্রমিক। এদের মধ্যে আছেন বিভিন্ন দেশ থেকে সুইডেনে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী মুসলিমরাও। গত কয়েক দশকে এখানে আসা মুসলিমরা ভৌগোলিক কারণে নামাজের সময়সূচি এবং রোজা রাখা নিয়ে বিপাকে পড়েন। এ বিষয়ে মুসলিম ধর্ম-তাত্ত্বিকদের নির্ধারণ করা কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকায় কিরুনার মাত্র কয়েক শ মুসলিমও ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম মেনে চলেন।

সিরিয়া থেকে আসা গাশান আলানকার জানান, ‘রাত সাড়ে তিনটার সময় সেহরি করে আমি যখন রোজা শুরু করি, তখনো আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করতে থাকে মধ্যরাতের সূর্য। আমার ঘরে দুই পরত করে পর্দা লাগানো থাকলেও বাইরে থেকে আসা আলোর মধ্যেই আমাকে ঘুমাতে যেতে হয়।’

আলানকার সৌদি আরবের মক্কা নগরের সময়ের সঙ্গে মিল রেখে রোজা রাখেন। তবে, তার ইবাদত কবুল হয় কি না, তা নিয়ে সংশয়ও আছে আলানকারের। সিরিয়ায় যুদ্ধের কবল থেকে পালিয়ে মাত্র সাত মাস আগে লেবানন হয়ে তুরস্ক ও গ্রিস ঘুরে কিরুনায় আসেন তিনি। মক্কার সময়ের সঙ্গে মিল রেখে রোজা রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওইটাই ইসলামের জন্মভূমি। আমি ভুল করছি কি না, জানি না। কিন্তু আল্লাহর ঘরকে ঘিরে আমার ইবাদত তো কবুল হওয়ার কথা।’

বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের অনুসরণ করা হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে মাস বা তারিখ শুরু হয় চাঁদ দেখা যাওয়ার মধ্য দিয়ে সন্ধ্যায়। আর প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় নির্ধারণ হয়ে থাকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত মেনে চলে সূর্যের অবস্থানের সাপেক্ষে। গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির সঙ্গে হিসাব মেলালে দেখা যায়, চাঁদের পরিক্রমা অনুসারে প্রতিবছরই ১১ দিন করে এগিয়ে আসে রমজান মাস। আর এই হিসাবে প্রতি ৩৩ বছরে একবার ঘুরেফিরে ঠিক একই সময়ে রমজান পালনের সুযোগ পান মুসলিমরা।

যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উত্তর মেরুর দেশ ফিনল্যান্ডে বাস করা একজনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়, তার অভিজ্ঞতার বিষয়টি জানা যায় সেখানে। তিনি বলেন, ‘রোজা শুরু হয় রাত ১ টা ৩৫ মিনিটে (সকাল ধরা হয়) এবং শেষ হয় ১২.৪৮ মিনিটে (সন্ধ্যা ধরা হয়)। তাই এখানে রোজার সময়টা হচ্ছে ২৩ ঘণ্টা ৫ মিনিট। আমার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন এবং পরিবারের সদস্যরা যারা বাংলাদেশে বাস করেন তারা বিশ্বাস করতে পারেন না যে, ২০ ঘণ্টার বেশি সময় আমরা রোজা রাখতে পারি। তাই তারা যখন শুনে যে, আমরা ২৩ ঘণ্টা বা সাড়ে ২২ ঘণ্টা রোজা রাখি তখন তারা বলে যে, এটা অবিশ্বাস্য, কীভাবে তোমরা এটা ম্যানেজ কর? আল্লাহকে ধন্যবাদ যে, কোন না কোন ভাবে আমরা এটা করতে পারি এবং আমরা খুব ভালোভাবেই তা করতে পারছি’।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

 



Loading...


Loading...