তিন তালাক আইন নিয়ে বহু প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৮ জুন ২০১৯, ১৬:৩১

ভারতে ইসলাম ধর্মের আগমনের একেবারে শুরু থেকেই ধর্মীয় আইনের মাধ্যমে মুসলিম মেয়েদের বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। একাধিক বিয়ে, সম্পত্তির মালিকানা, সন্তানের অভিভাবকত্ব ইত্যাদির মাধ্যমে পুরুষকে দেয়া হয়েছে শ্রেষ্ঠত্ব এবং স্বেচ্ছাচারিতার অধিকার। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুরই পরিবর্তন সাধন করতে হয়। এভাবেই বিশ্বের সমস্ত ইসলামিক রাষ্ট্রে সংস্কারের মাধ্যমে ধর্মীয় আইনের পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। ফলে মুসলিম মহিলারা পুরুষের সমান না হলেও তালাক, খোরপোশ, সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা লাভ করেছেন।

ভারতের মুসলিম মহিলারা যুগ যুগ ধরে পুরুষের পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত মেনে চলেছেন। তাৎক্ষণিক তিন তালাকের শিকার শাহবানু খোরপোশের দাবিতে মামলা দায়ের করেন। সুপ্রিম কোর্টের রায় শাহবানুর পক্ষে গেলে ‌‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড এবং জামাত-ই-উলেমা হিন্দের মতো কট্টর ধর্মীয় সংগঠনের সদস্যরা দেশ জুড়ে আন্দোলনের হুমকি দেন। ভয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী লোকসভায় নতুন বিল পাশ করিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় বদলে ফেলতে বাধ্য করেন। এই সম্পূর্ণ ঘটনাটি মুসলিম মহিলাদের মনে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। রাজনৈতিক দলের হাত ধরেই তারা প্রতিবাদ আন্দোলনে সামিল হন।

সেই সঙ্গে গড়ে ওঠে ‘আওয়াজে নিশান’ ইত্যাদি নামে বিভিন্ন মুসলিম মহিলা সংগঠন। তখন সেলফোন ছিল না, তাই চিঠির মাধ্যমে, ডাক মারফৎ, টেলিগ্রাম করে, তালাক রেকর্ড করা ক্যাসেট পাঠিয়ে, একতরফা তালাক দেয়া হত। এমনকি, স্ত্রীর ঘরের দরজায় তালাকনামা সেঁটে দিয়ে যাওয়া হত। এই সমস্ত তালাকপ্রাপ্ত মহিলা কোথাও সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে, কোথাও একা প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। অনেকে কোর্টেও যান। এই আন্দোলনে পুরুষরা বা অন্য সম্প্রদায়ের মহিলারা যোগ দেননি। হয়তো তাই এই আন্দোলন তালাকপ্রাপ্ত মহিলাদের কোনো আশার আলো দেখাতে পারেনি। কিন্তু আন্দোলন চলতেই থাকে।

ব্যক্তিগত আইন বলবৎ থাকায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধির সম্ভাবনাকে দূরে সরিয়ে মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার নামে ১৯৭২ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড গঠন করে শরীয়তি আইনের প্রয়োগকে আরো জোরদার করা হয়েছিল। মুসলিম মহিলা সংগঠনগুলি বাধ্য হয়ে বার বার এই ল’ বোর্ডের দ্বারস্থ হয়ে মৌখিক তালাক বাতিল করে আদালতের মাধ্যমে তালাক হোক, তালাকপ্রাপ্ত মহিলাদের আজীবন খোরপোশ দেয়ার ব্যবস্থা হোক এবং পুরুষের বহু বিবাহের অধিকার বাতিল করা হোক— এই দাবি জানিয়ে এসেছে ‘ল’ বোর্ডের কাছে। কিন্তু বোর্ড মেয়ে মানুষদের কথায় কর্ণপাত করা দূরে থাক, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। দম্ভভরে জানিয়ে দিয়েছে, মেয়েদের পুরুষের সমান অধিকার দেওয়া যাবে না, যা দেয়া আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

‘তালাক’ শব্দের অর্থ মুক্ত করা বা বিচ্ছিন্ন করা। বিবাহ বিচ্ছেদকে তাই ‘তালাক’ বলা হয়। এই বিচ্ছেদের পদ্ধতি নিয়ে এক একজন মানুষ এক এক ধরনের মত দিয়েছেন। পদ্ধতি অনুযায়ী, তালাক তিন প্রকার। ‘আহসান’ তালাক সর্বাপেক্ষা ভাল। হাসান তালাকও ভাল কিন্তু বিদ্দাত তালাক অবৈধ। শরীয়ত বিরুদ্ধ।

স্ত্রী গর্ভবতী নয়, ঋতুর সময়কাল নয়, এই অবস্থায় স্বামী এক তালাক দিলে, তিন মাস পর স্বাভাবিক ভাবেই তালাক হয়ে যাবে। তবে এই তিন মাসের মধ্যে দু’জনের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গেলে, স্বামী এই স্ত্রীকে পুনর্বিবাহ করতে পারেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় তালাকে ‘আহসান’।

স্বামী যদি সমস্ত নিয়ম মেনে স্ত্রীকে তিন মাসে তিন তালাক দেন, তবে স্বামীর জন্য সেই স্ত্রী অবৈধ বা হারাম হয়ে যাবে। তাকে আর গ্রহণ করা যাবে না। তবে ভবিষ্যতে বিয়ের সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। যদি মহিলার অন্য কারো সঙ্গে বিয়ের পর সেই স্বামীও তালাক দেন বা মারা যান, তা হলে দু’জনে সহমত হলে বিয়ে করতে পারেন। এই বিচ্ছেদকে বলা হয় ‘তালাক-এ-হাসান’।

কেউ যদি স্ত্রীকে একসঙ্গে তিন তালাক দেয় কিম্বা ঋতু চলাকালে তালাক দেয়, তা হলে তার জন্য পুরুষটি পাপী হিসেবে চিহ্নিত হয়। গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দেয়াও অবৈধ বা হারাম। এই তাৎক্ষণিক তালাককে বলা হয় তালাক-এ-বিদ্দাৎ।

মূলত তালাক-এ-বিদ্দাৎ বাতিলের দাবিতেই ভারতীয় মুসলিম মহিলাদের আন্দোলন। ২০১৬-তে ইসরত জাহান, আফরিন রহমান, গুলশন পারভিন-সহ যে পাঁচ জন তালাকপ্রাপ্ত মহিলা সুপ্রিম কোর্টে তাৎক্ষণিক তিন তালাক বাতিলের আর্জি জানিয়েছিলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭-র ২২ আগস্ট কোর্ট রায় ঘোষণা করে। বলা হয়, তাৎক্ষণিক তিন তালাক ‘অসাংবিধানিক’। বিচারপতি এস আবদুল নাজির এবং বিচারপতি জে এস খেহর ৬ মাস সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তিন তালাক বন্ধ রেখে সরকারকে নতুন আইন তৈরির নির্দেশ দেন। এই ৬ মাসের মধ্যেও তিন তালাকের ঘটনা কিন্তু ঘটতেই থাকে। আমাদের রাজ্যের মুসলিম নেতা-মন্ত্রীরা প্রচার করতে থাকেন, তিন তালাক খুব ভাল। সুপ্রিম কোর্টকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জামাত–ই-উলেমা হিন্দ প্রচার করতে থাকে, তারা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মানবে না।

কিন্তু পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, খোদার কাছে সব চেয়ে অপ্রিয় হল ‘তালাক’। মর্তে কেউ ‘তালাক’ উচ্চারণ করলে বেহেস্তে খোদার আরস কেঁপে ওঠে। তথাকথিত খোদার খাস বান্দা মোল্লা-মুফতিরা তালাক-এ-বিদ্দাৎ, মানে অবৈধ তালাকের ক্ষেত্রেও লাগামছাড়া। যথেচ্ছ একতরফা তালাক বাতিলে তাদের ঘোর আপত্তি। ধর্মীয় সংগঠনগুলি ও ‘ল’ বোর্ড এমন ভাবে প্রচার শুরু করল যেন সুপ্রিম কোর্ট ও কেন্দ্রীয় সরকার তালাক ব্যবস্থাকেই বাতিল করে দিতে চাইছে। কিন্তু সত্যিটা তো তা নয়। ইসলামে বলা হয়েছে, অসুখি জীবন বয়ে বেড়ানোর চেয়ে তালাক হয়ে যাওয়া ভাল। এটা অবশ্যই ইসলামের একটা ভাল দিক। তবে এও বলা হয়েছে, তুচ্ছ কারণে, যেমন মদ্যপ অবস্থায়, রাগের বশে, ঘুমের ঘোরে তালাক বৈধ নয়। কিন্তু আমাদের ধর্মগুরুদের বক্তব্য, স্ত্রীর উদ্দেশে তালাক উচ্চারণ করলেই তালাক হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে দোষ তালাকের নয়, তালাক দাতার। সে পাপের ভাগীদার হবে। তাই কোনো পুরুষ অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় তালাক দিয়ে ভুল বুঝতে পারলেও ছোট-বড় ধর্ম বিশেষজ্ঞদের হাত থেকে রেহাই পান না। তাঁরা ফতোয়া দেন, আর একসঙ্গে সংসার করা যাবে না। ওর ‘হালালা নিকা’ দিতে হবে। হালালা নিকা হল, তালাকপ্রাপ্ত মহিলার অন্য এক পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে, এই চুক্তিতে যে পুরুষটি মহিলাকে শুদ্ধ করার জন্য বিয়ে করে তিন মাসের মধ্যে তালাক দিয়ে দেবেন। শুধু বিয়ে নয়, দু’জনের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কও হতে হবে। স্বামীনির্ভর অসহায় স্ত্রী সন্তানের মুখ চেয়ে এই জঘন্য প্রথা মেনে নিতে বাধ্য হন।

সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রকে নতুন আইন করার যে নির্দেশ দিয়েছিল, তা রূপায়ণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার সেপ্টেম্বরে অর্ডিন্যান্স জারি করে। তাৎক্ষণিক তিন তালাক, হালালা নিকার মতো অভিশপ্ত প্রথাগুলি বাতিলের লক্ষ্যে ২৭ ডিসেম্বর লোকসভায় প্রবল বাদ-প্রতিবাদের মধ্যে ভোটের মাধ্যমে তিন তালাক বিলটি পাশ হয়ে যায়। কংগ্রেস এবং এডিএমকে ভোট বয়কট করে। প্রথম অর্ডিন্যান্স জারির সময় বলা হয়েছিল, তালাকপ্রাপ্ত মহিলার হয়ে যে কেউ স্বামীর বিরুদ্ধে কোর্টে অভিযোগ জানাতে পারবেন। এ বারের সংশোধিত বিলে বলা হয়েছে, স্ত্রী বা তার নিকটাত্মীয় ছাড়া অন্য কেউ কোর্টে অভিযোগ জানাতে পারবেন না। এটি প্রথমে জামিন অযোগ্য ধারা ছিল। সংশোধনের পর স্বামী-স্ত্রী সমঝোতায় এলে শুধুমাত্র স্ত্রী কোর্টে স্বামীর জামিনের আবেদন করতে পারবেন। তালাক প্রমাণ হলে স্বামীর তিন বছর জেল হবে। এই সময় স্ত্রী-সন্তানদের খোরপোশ দিতে বাধ্য থাকবেন স্বামী। প্রয়োজনে স্বামীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।

লোকসভায় তালাক বিল পাশ হলেও রাজ্যসভায় আজও বিলটি আটকে রয়েছে। বিরোধীদের আপত্তির কারণ, তিন তালাককে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অর্ডিন্যান্স জারি করা। স্বামীর জেল হলে পরিবারের ভরণপোষণ কী ভাবে হবে?

যুক্তিটি কিন্তু অগ্রাহ্য করার মতো নয়। ভারতীয় মুসলিম মহিলাদের তাৎক্ষণিক তালাক বিরোধী আন্দোলনে কোথাও স্বামীর কারাবাসের দাবি করা হয়নি। তালাক যদি অবৈধ হয়, তবে তা গ্রাহ্যে আনার প্রয়োজন কী? এক জন দিনমজুর জেলে বসে কী করে খোরপোশ দেবেন? স্ত্রীর সঙ্গে জেলফেরত স্বামী সংসার করবেন তো? সম্পত্তি যাঁদের নেই, তাদের কী বাজেয়াপ্ত হবে? তা হলে কি মুসলিম মহিলাদের মুক্তির নামে পুরুষদের জেলে পাঠানোই মোদীর আসল উদ্দেশ্য? এর সদুত্তর না পাওয়া গেলে মুসলিম মহিলাদের অবস্থা হবে ‘পুনর্মুষিক ভব’। দরিদ্র পরিবারের স্বামীনির্ভর তাৎক্ষণিক তালাকের শিকার অসহায় মহিলারা কোর্টে না গিয়ে সংসার, সন্তানের জন্য হালালা নিকাই মেনে নেবেন। এই অর্ধেক আকাশে কবে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটবে তা কে বলবে? তাই এদের কাছে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ একেবারেই মূল্যহীন।




Loading...
ads




Loading...