১৬ হাজার এক কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে ১১ ব্যাংক

১৬ হাজার এক কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে ১১ ব্যাংক
মূলধন ঘাটতিতে ১১ ব্যাংক - ফাইল ছবি


  • মৃত্তিকা সাহা
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:৫৩

ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে যাওয়ায় মূলধন ঘাটতিও বেড়ে যাচ্ছে। আমানতকারীদের অর্থ নিরাপদ রাখতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয় ব্যাংকগুলোকে। কিন্তু দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের ১১ ব্যাংক তা করতে পারেনি। এ ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি হয়েছে ১৬ হাজার এক কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাসেল-৩ নীতিমালার আলোকে ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি সে পরিমাণ মূলধন রাখতে হচ্ছে। কোনো ব্যাংক এ পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে মূলধন ঘাটতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুন প্রান্তিকে মূলধন ঘাটতি মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে ১১টি ব্যাংক। তাদের মোট ঘাটতির পরিমাণ ১৬ হাজার এক কোটি টাকা। এর আগে গত মার্চ পর্যন্ত ১০টি ব্যাংকের ১৮ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি ছিল। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকের সংখ্যা একটি বাড়লেও ঘাটতির পরিমাণ কমেছে ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুন ’১৯ শেষে সরকারি ও বিশেষায়িত খাতের ৭টি, বেসরকারি খাতের তিনটি ও বিদেশি একটি ব্যাংক রয়েছে। সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে আলোচিত ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স গ্রুপ জালিয়াতির অকুস্থল জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির বর্তমানে মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা।

এর আগে মার্চ শেষে ঘাটতি ছিল ৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো ব্যাংকের পক্ষে সর্বোচ্চ মূলধন ঘাটতি এটি। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ কৃষিব্যাংক। ব্যাংকটি ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। হলমার্কসহ বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতে নাম আসা সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি গত মার্চ শেষে ১৩ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকলেও জুন শেষে ঘাটতি কিছুটা বেড়েছে।

এ ছাড়া ঋণের নামে অর্থ লুটে নেয়া বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি বেড়েছে। গত মার্চ শেষে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ছিল ২৩৬ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি গত মার্চ শেষে ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা হলেও এবারে তাদের ঘাটতি কাটিয়ে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫৬ কোটি টাকা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায় করা হয়েছে। গত বছরজুড়ে আদায় করা হয়েছিল প্রায় হাজার কোটি টাকা। মূলধন ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার তালিকায় আছে, রূপালী, বাংলাদেশ কৃষি, রাজশাহী কৃষিউন্নয়ন ব্যাংক, বেসরকারি খাতের এবি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অফ পাকিস্তান।

নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের জোগান দেয়া অর্থ ও মুনাফার একটি অংশ মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। কোনো ব্যাংক মূলধনে ঘাটতি রেখে তার শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারে না। সম্প্রতি খেলাপি গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে পাচ্ছেন। এ ছাড়া সহজশর্তে ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণের বাড়তি মেয়াদের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে সেসব সুবিধা পাওয়ার পরও কমেনি খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর আগের প্রান্তিক অর্থাৎ মার্চ মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যা ওই সময়ের বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। খেলাপি ঋণ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মূলধন ঘাটতি বাড়ে। সামগ্রিক মূলধন সংরক্ষণের হার দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। সংরক্ষণ বিবেচনাতে ব্যাংক খাতে মার্চের তুলনায় জুনে মূলধন পর্যাপ্ততার হার সামান্য বেড়েছে। মার্চে সংরক্ষণের হার ছিল ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ। এগারোটি ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের মূলধন ঘাটতি থাকলেও কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে সংরক্ষণের হার কিছুটা বেড়েছে।

এদিকে সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, বছরের পর বছর কোনো ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি থাকতে পারবে না। আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত মেনে নেবে। ২ বছরের পর মূলধন ঘাটতি হলে ওই ব্যাংককে হয় মার্জার অর্থাৎ অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভ‚ত হয়ে যেতে হবে, অথবা বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণে কোনো ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি হলে, তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কিভাবে মূলধন ঘাটতি পূরণ করবে তার পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে তা মনিটরিং করবে। এভাবে দুই বছর পর আইন অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি বেড়ে যাওয়া মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এটা সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাই ফুটে উঠেছে। এর ফলে শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, পুরো অর্থনীতিতেই বিপর্যয় নেমে আসবে। বিদেশি বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে ঘাটতির মুখে পড়া ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বিদেশি ব্যাংকগুলো লেনদেন করতে আস্থার সঙ্কট দেখা দেয়। এতে পণ্য আমদানি-রফতানিতে গ্যারান্টি হিসেবে তাদের বাড়তি ফি দিতে হয়, যার প্রভাবে ব্যবসা ব্যয় বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুর্নীতি ও লুটপাটের দায় জনগণের ঘাড়েও চাপানো হচ্ছে। কেননা দুর্নীতির দায় মেটানো হচ্ছে জনগণের অর্থ দিয়ে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়লে মূলধন ঘাটতি বাড়বেই। রাষ্ট্রীয় মালিকানার অনেক ব্যাংক বিনিয়োগের গুণগতমান যাচাই-বাছাই না করেই নানা প্রেক্ষাপটের কারণে ঋণ বিতরণ করেছে। যা পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের জন্য বোঝা হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে ব্যাংকের সংরক্ষিত মূলধন ঘাটতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে প্রতি বছর অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে খেলাপি ঋণ আদায়ে আরো কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেয়া উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক, বেসিক এবং জনতা ব্যাংকসহ বড় বড় ঋণ কেলেঙ্কারি হয়েছে। ওইসব ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের খাতায় মন্দঋণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কিন্তু এসব মন্দঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে গেছে। এ সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণ করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অবকাঠামো সুবিধার অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। এতে বেড়ে গেছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার অর্থই হলো ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে যাওয়া।

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...