বাংলাদেশের ওপর রানের বোঝা

বাংলাদেশের ওপর রানের বোঝা
বাংলাদেশের ওপর রানের বোঝা - সংগৃহীত


  • মহিউদ্দিন পলাশ
  • ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:৪৯

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৮৯২ সালে লেখা ছোট গল্প— ‘কাবুলিওয়ালা’ যেন এ যুগে ফিরে এসেছে রশিদ খানদের হাত ধরে। কাবুলিওয়ালা গল্পের নায়ক রহমত শেখ কলকাতায় এসেছিলেন ব্যবসা করতে। আর রশিদ খানরা বাংলাদেশে এসেছেন টেস্ট জিততে। সেই পথে তারা এখন ধাবমান হরিণ। চট্টগ্রাম টেস্টে টস জয় থেকে শুরু করে তৃতীয় দিন পর্যন্ত তারা আছেন সঠিক কক্ষপথে।

এই তিন দিন তারা স্বাগতিকদের একটিবারের জন্যও মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ দেননি। নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে বাংলাদেশকে রেখেছেন চাপে। আফগানদের দ্বতীয় ইনিংস এখনো শেষ হয়নি। হাতে আছে দুই উইকেট। তাতেই তারা এগিয়ে আছে ৩৭৪ রানে। এর চেয়ে বেশি রান তাড়া করে বিশ্ব ক্রিকেটেও জয়ের রেকর্ড নেই খুব বেশি।

অঙ্কের হিসাবে মাত্র ৯টি। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে এই লিড থাকছে না। এখানে আজ আরো রান যোগ হবে। হতে পারে সেই টার্গেট চারশও অতিক্রম করে গেছে। চারশ অতিক্রম করুক বা নাই করুক; যে টার্গেটই থাক, সেই রানই অতিক্রম করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ ইতিহাস বলে বাংলাদেশের সামনে এত রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড নেই।

চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান ২০০৮ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে করা ৪১৩ হলেও জিততে পারেনি। হেরেছিল ১০৭ রানে। তিনশোর্ধ ইনিংসও আছে কয়েকটি। কিন্তু সেখানেও জিততে পারেনি। হেরেছিল সবগুলোতে। সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড খুব বড় নয়। ২১৪ রানে জয়। ২০০৯ সালে গ্রানাডাতে উইন্ডিজের বিপক্ষে ৬ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ জিতেছিল ৪ উইকেটে।

এ ছাড়া ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নিজেদের শততম টেস্টে বাংলাদেশ ১৯০ রান তাড়া করে জিতেছিল ৪ উইকেটই। কিন্তু এবার বাংলাদেশ জলন্ত উনুনের সামনে। যেখানে দাউ দাউ করে জ্বলছে আফগানিস্তানের বিচিত্র স্পিন আক্রমণ। সেই আক্রমণ সামাল দিয়ে সাফল্যের সাথে তরী নিয়ে তীরে ভেড়া কঠিনই হবে। রশিদ খানের নেতৃত্বে ২২ গজের উইকেটে যে উত্তাল ঢেউ উঠবে, সেই ঢেউ বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কোথায় নিয়ে আছড়ে ফেলে কে জানে। লম্বা ব্যাটিং লাইন আছে! কিন্তু তাতে কী? এক সময় এভারেস্ট জয় করা কঠিন ছিল।

কিন্তু এখন তা আর সেই কঠিনেরে বেড়াজালে নেই। অনেকেই এভারেস্ট জয় করছেন। বাংলাদেশকে এই টেস্ট জিততে হলেও এভারেস্ট জয় করার চেয়েও বড় কিছু করতে হবে! কিন্তু আফগানরা বলা যায় জয়ের ঘ্রাণ পেতে শুরু করেছে। ইব্রাহীম জর্দান মনে করেন তারা জয়ের পথে ৭০ ভাগ এগিয়ে আছেন। বাংলাদেশকে এখন পর্যন্ত যেখানে কোনো সুযোগ দেয়নি আফগানিস্তান।

শেষ সময়ে এসে দেয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। আজ তারা থাকবে জয়ের মুডে। মনোবল থাকবে চাঙ্গা। বাংলাদেশকে এ সব প্রতিক‚লতা মেনে নিয়েই লড়াই করতে হবে! আফগানদের জয়ের পথে বাংলাদেশ প্রতিক‚ল হয়ে উঠার সম্ভাবনা কম। তবে আফগানদের জয়ের পথে প্রতিক‚ল হয়ে উঠতে পারে বৈরী আবহাওয়া। বৃষ্টি ও আলোর স্বল্পতার কারণে খেলা গতকাল ২০ মিনিট আগেই শেষ হয়ে যায়। আজ তা শুরুতেই পুষিয়ে নেয়া হবে। খেলা হবে ৯৫ ওভার। কিন্তু আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আছে বৃষ্টির সম্ভাবনা। এখন এই বৃষ্টিই হতে পারে বাংলাদেশের বড় বন্ধু!

বাইরে প্রকাশ হতে না দিলেও টেস্ট শুরুর আগেই আফগানিস্তান শিবির বাংলাদেশের ডেরায় ভালোই আঘাত করতে শুরু করেছিল। আফগানিস্তানের বিপক্ষে জিততে মরিয়া বাংলাদেশ শিবির উইকেট নিজেদের মতো তৈরির পরামর্শ দিয়েছিল টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে। কিন্তু তা পরে আর পাওয়া যায়নি। যে ময়দান তৈরি হয়েছে যুদ্ধের জন্য সেখানে চলছে আফগান দাপট।

ব্যাটিং-বোলিং কোনো বিভাগেই বাংলাদেশ পেরে উঠছে না। আফগানদের প্রথম ইনিংসের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও বাংলাদেশের বোলাররা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। আফগানরা খেলছে তৃতীয় টেস্ট। কিন্তু তাদের ব্যাটিং দেখে বোঝার উপায় নেই। মনে হবে তারা দীর্ঘ দিন থেকে খেলছে টেস্ট ক্রিকেটে। সেখানে বাংলাদেশই নবীন! কত সহজেই তারা মানিয়ে নিয়েছেন সাদা পোশাকের ক্রিকেটের সাথে।

ইনিংসের পেট মোটা করতে হলে কাউকে না কাউকে বড় ইনিংস খেলতে হয়। প্রথম ইনিংসে সে কাজটি করেছিলেন রহমত শাহ (১০২) ও আসগর আফগান ( ৯২)। দ্বিতীয় ইনিংসে সেই কাজ করতে এগিয়ে আসেন ইব্রাহীম জর্দান (৮৭), আসগর আফগান (৫০)। ইব্রাহীম ২৩০ মিনিট ও আসগর আফগান ১২২ মিনিট ব্যাটিং করেন। পরে সেখানে শামিল হন আসগর জাজাই ৩৪ রানে অপরাজিত থেকে। এই তিনজনের দৃঢ়তায় দ্বিতীয় ইনিংসের ধাক্কা সামলে আফগানরা ক্রমেই নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছে। আজ সেই অবস্থানকে আরো পোক্ত করতে নামবেন অপরাজিত দুই ব্যাটসম্যান ৩৪ রানে আসগর জাজাই ও ০ রানে ইয়ামিন আহমদজাই।

দ্বিতীয় ইনিংসে আফগানরা যে এভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে তা কিন্তু তাদের সূচনায় ছিল না। দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলার নেতা সাকিব আল হাসান জানিয়েছিলেন দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান মোসাদ্দেক ও তাইজুল প্রথম সেশন টিকতে পারলে দলের জন্য খুবই ভালো হবে। আফগানদের লিড ৭০/৮০ হলে খুবই ভালো হবে।


কিন্তু দিনের প্রথম ওভারে তাইজুল ও চতুর্থ ওভারে নাঈম হাসান ফিরে গেলে সেই আশা আর পূর্ণ হয়নি। ২০৫ রানে গুটিয়ে যায় দল। মোসাদ্দেকের আর ফিফটি করা হয়নি। ৪৮ রানে অপরাজিত থাকেন। নাঈমকে আউট করে রশিদ টানা দ্বিতীয় ইনিংসে তুলে নেন ৫ উইকেট। আগের ৫ উইকেট ছিল দেরাদুনে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এ বছরই মার্চে। লিড পায় ১৩৭ রানের। প্রথম ইনিংসে তারা করেছিল ৩৪২ রান। উইকেটের বিবেচনায় এই লিড অনেক বেশি। তখন সাকিবদের উপর চাপ আরো বেড়ে যায়।

ম্যাচে ফিরে আসতে হলে আফগানদের দ্বিতীয় ইনিংসের লেজ বেশি নাড়াচাড়া করতে দেয়া যাবে না। সহজেই কেটে দিতে হবে। সাকিব বল হাতে তুলে নিয়ে প্রথম ওভারেই জোড়া আঘাত (ইহসানউল্লাহ ও রহমত শাহ) হেনে তারই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। লাঞ্চের আগে তাইজুল হাসমতউল্লাহ শহীদিকে ফিরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনার রাস্তা তৈরি করে দিয়েছিলেন। এ সময় উইকেট থেকে স্পিনাররা যেভাবে সুবিধা পাচ্ছিলেন, তাতে করে আফগানিস্তানের বিপক্ষে দিনের বাকি সময় টিকে থাকাই কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠে।

কিন্তু লাঞ্চ বিরতির পর সবকিছু আবার পাল্টে যায়। দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান ওপেনার ইব্রাহীম জর্দান ও আসগর আফগান উইকেটে জমে বসেন। তাদেরকে কিছুতেই আউট করা সম্ভব হচ্ছিল না। এ সময় ইব্রাহীম জর্দান সেঞ্চুরির দিকে এগোচ্ছিলেন। এই জুটি যখন ভাঙে তখন আফগানরা প্রাথমিক বিপর্যয় সামলে নিজেদের অবস্থান মজবুত করে চলেছে। জুটি ভাঙে ১০৮ রানে।

আসগর আফগান ব্যাক টু ব্যাক হাফসেঞ্চুরি করে আউট হন ৫০ রানে। প্রথম ইনিংসে তিনি করেছিলেন ৯২ রান। এরপর আফগানরা আরো ৪ উইকেট হারিয়েছে। কিন্তু তাতে কখনো মড়ক লাগেনি। বিষয়টি এমন ব্যাট যখন করছি তখন আউটতো এক সময় হতেই হবে। তার আগে দলের অবস্থান যতটুকু সম্ভব পোক্ত করা যায়। সেই ধারাবাহিকতায় ইব্রাহীম জর্দানকে ৮৭ রানে ফিরিয়ে দেন নাঈম। পরবর্তীতে মোহাম্মদ নবী (৮), রশিদ খান (২৪), কায়েসের (১৪) আউট দলকে বিপদে ফেলতে পারেনি। রশিদ খানতো নাঈমের এক ওভারে টানা চারটিসহ পাঁচটি বাউন্ডারি হাঁকান।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads




Loading...