সমীকরণ মিলছে না হত্যা-আত্মহত্যার: আলামত পরীক্ষা হচ্ছে সিআইডির ল্যাবে



রাজধানীর উত্তরখানের ময়নারটেক এলাকার এক বাসায় মা-মেয়ে ও ছেলের মৃত্যু নিয়ে ধূম্রজাল কাটেনি। ফরেনসিক চিকিৎসকরা প্রথমে এটিকে ত্রিপল হত্যাকাণ্ড বলার চেষ্টা করলেও এখন সন্দেহ করছেন আত্মহত্যা। সেক্ষেত্রে কে-কাকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন সেটির সমীকরণও মিলছে না। তবে পুলিশ বলছে, নিবিড় তদন্ত ছাড়া এটি হত্যাকাণ্ড নাকি আত্মহত্যা তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। সিআইডির রাসায়নিক পরীক্ষায় সত্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

এদিকে উত্তরখানের ময়নারটেক এলাকার ওই বাসা থেকে মা-মেয়ে ও ছেলের লাশ উদ্ধারের পাশাপাশি রক্তমাখা বটি,ছুরি, কীটনাশকের বোতল ও ঘুমের ওষুধের প্যাকেট এবং দু’টি চিরকুট উদ্ধার করেছে পুলিশ।

সে আলামতগুলো পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ল্যাবে (পরীক্ষাগার) পাঠানো হয়েছে। বটি ও ছুরিতে হাতের ছাপ ও চিরকুটের হাতের লেখা সেখানে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। যদিও উদ্ধার করা চিরকুটে আত্মহত্যার কথা দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে মা-মেয়ে ও ছেলের মৃত্যুর কারণ বিষয়ে গতকাল বুধবার নতুন তথ্য জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. সোহেল মাহমুদ। উত্তরখানের ওই বাসা পরিদর্শন শেষে ফরেনসিক মেডিসিনের এই চিকিৎসক জানান, ওই তিনজনের মধ্যে দুইজনকে হত্যার পর একজন আত্মহত্যা করেছেন। ওই চিকিৎসকের ধারণা, মা হয়ত দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেছেন অথবা ছেলে তার মা ও বোনকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন।

এর আগে সোমবার তিনজনের ময়নাতদন্ত শেষে ডা. সোহেল মাহমুদ জানিয়েছিলেন, ওই তিনজনকে হত্যা করা হতে পারে। দুইজনকে শ্বাসরোধে ও একজনকে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছিল বলে ধারণা করছি। লাশ উদ্ধারের অন্তত ৭২ ঘণ্টা আগে তাদের মৃত্যু হয়।

গতকাল ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ঘটনাস্থল ও পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী দেখা যায়, দরজা ভেতর থেকে লক ছিল ও ভেতর থেকে ছিটকানি মারা ছিল। শাবল দিয়ে তা ভাঙা হয়েছে। দুইটি কক্ষের বিছানায় রক্ত ও বমি পাওয়া গেছে। সেগুলো সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সিআইডিতে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ডাইনিং টেবিলে কীটনাশকের বোতল ও ঘুমের ওষুধের প্যাকেটে দুটো ওষুধ পাওয়া গেছে। ওই প্যাকেটে দশটি ট্যাবলেট থাকার কথা ছিল। আটটি নেই। পুলিশ দুটি ছুরি ও একটি বটি জব্দ করেছে। তা থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

রোববার রাতে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে উত্তরখানের ময়নারটেক এলাকার এক বাসার দরজা ভেঙে মা জাহানারা বেগম মুক্তা (৫০), তার মেয়ে তাসফিয়া সুলতানা মীম (২০) ও ছেলে মুহিব হাসান রশ্মির (৩০) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মা ও মেয়ের লাশ ছিল বিছানায়; আর ছেলের লাশ মেঝেতে পড়ে ছিল। লাশগুলো ফুলতে শুরু করেছিল বলে দিন দুই আগে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করছিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

ঘরের দুই জায়গায় দুটো চিরকুট পাওয়ার কথা জানিয়েছেন উত্তরখান থানার ওসি খলিলুর রহমান। তিনি জানান, দুই চিরকুটের বক্তব্য একই, তবে হাতের লেখা আলাদা। তাতে লেখা ছিল, ‘আমাদের মৃত্যুর জন্য আমাদের ভাগ্য এবং আমাদের আত্মীয়স্বজনের অবহেলা দায়ী। আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের সম্পত্তি গরিবদের দান করা হোক।’ ওসি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, একটি চিরকুট ছেলের হাতে লেখা, অন্যটি মায়ের। তবে লেখাগুলো আসলেই তাদের কিনা, তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

মা-মেয়ে ও ছেলের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় জাহানারার ভাই মনিরুল হক মঙ্গলবার উত্তরখান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেখানে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। জাহানারার ভাই মনিরুল হক জানিয়েছেন, মহিব হাসান রশ্মিদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের জগন্নাথপুরে। তার বাবা ইকবাল হোসেন মারা গেছেন ২০১৬ সালে। তিনি বিআরডিবিতে চাকরি করতেন। এ মাসের শুরুতে ৪০তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ছেলে রশ্মি। এমবিএ শেষ করার পরও তিনি হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন বলে তার মামার ভাষ্য।

মানবকণ্ঠ/এএম

 



Loading...
ads


Loading...