রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কি অশনিসংকেত হয়ে উঠছে

রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কি অশনিসংকেত হয়ে উঠছে
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কি অশনিসংকেত হয়ে উঠছে - ছবি: সংগৃহীত


  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:৩১

বাংলাদেশে প্রায় এগারো লক্ষ্য রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। এতসংখ্যক শরণার্থী কোনো দেশ বর্তমান সময়ে আশ্রয় দিয়েছে কিনা, দেয় কিনা তা আমার জানা নেই। জানা নেই এমন অতীত ইতিহাসও। বেশ প্রশংসিত হয়েছে বাংলাদেশ এমন মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে। যারা প্রশংসা করেছেন, তাদের অর্জনের থলিতে এমন দুঃসাহসিক মানবতার দৃষ্টান্ত আছে কিনা, সেটাও প্রশ্ন।

বিশ্ব শান্তির জন্য সক্রিয় আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বরা বাংলাদেশের ভ‚মিকার জন্য করতালি দিয়েছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবরের পাতায় আমরা সেসব দেখেছি দেশে বসে। ভেবেছি, আমরা কতখানি দয়ালু, মানবিক জাতি। আর সব পরিচয় ছাপিয়ে এটা যেন নিঃসন্দেহে গর্বিত হওয়ার মতো পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে শুরু থেকেই আশ্রয় দেয়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিল অনেকেই। মিয়ানমার থেকে কোনো ভালো বা ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে তো এরা এদেশে প্রবেশ করেনি। এরা প্রবেশ করেছে অত্যাচারের নৃশংস অভিজ্ঞতা ও ভয়াবহতা, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের অভ্যস্ততা, মাদক আসক্তি ও এইডসের মতো মরণব্যাধি সঙ্গে করে।

এইডস রোগীর সংখ্যা বাংলাদেশে যে সংখ্যক ছিল, রোহিঙ্গারা এসে বাংলাদেশে এইডস রোগীর সংখ্যা সম্ভবত দ্বিগুণ হয়েছে। এমন একটি সংবাদ পত্রিকার পাতায় প্রকাশ পেয়েছিল। আবার মনস্তাত্তি¡ক দৃষ্টিতে বলা যায় যে, নৃশংস অত্যাচারের শিকার ব্যক্তিগোষ্ঠীর ভেতর সৃজনশীলতা, শৃঙ্খলা বোধ খুঁজে পাওয়া বেশ দুর্লভ।

কারণ, এমন অভিজ্ঞতা ব্যক্তির ভেতর সুস্থতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। শুরুতে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই কেবল হুমকিতে পড়তে পারে বলে মনে হয়নি বরং বড় ভয় হয়েছে এদেশের নিরাপত্তা, সামাজিক শৃঙ্খলা কখন যে ভেঙে যায়। এমনই ভয় সম্প্রতি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আর তাই মানবতার পরিচয় দেয়া দেশটা কতটা নিরাপদ, সেই শঙ্কটা সম্প্রতি তীব্র হয়ে উঠেছে। নিশ্চিত অনেকেই তা নিয়ে ভাবছেন।

মিয়ানমার কতটা সভ্য কিংবা মানবতাসম্পন্ন দেশ, সেটা কারোর অজানা নয়। সেই দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ভিন্ন। দেশ ভিন্ন, সুতরাং কৃষ্টি, সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকবেই কিন্তু এই ভিন্নতা বর্তমান বিশ্বের লিখিত, পঠিত সভ্যতার এবং মানবাধিকারের বিপরীত অবস্থানে করে। ফলে বিশ্ব শান্তির জন্য যারা দাপিয়ে চলেন, নির্ঘুমে রাত কাটান, তাদের কাছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ এক কথায়, চরম মানবতাবাদী দেশ। সেই চরম মানবতাবাদী দেশটার কল্যাণের জন্য বিশ্বনেতারাই বা কী করছেন বা করতে পারবেন, সম্ভবত তারাও জানেন বলে মনে হয় না।

কদিন ধরে প্রচার মাধ্যমে দেখছি, প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার হাতে দামি দামি মুঠোফোন। এই তথ্য পুলিশ সূত্রে পেয়েছে প্রচার মাধ্যম। টেকনাফ-উখিয়ায় সিম বিক্রির ছোট-বড় ৩০০টি দোকান রয়েছে। রোহিঙ্গারা স্থানীয় দোকান থেকেই সিম কিনছেন অথচ এরা বাংলাদেশি নন। সিম কেনার জন্য বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র লাগে।

বাংলাদেশের নাগরিক না হওয়ার কারণে এদের বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকার কথাও নয়। আর এই জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া সিমও পাওয়ার কথা নয়। আমি দুই দুইবার জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে না থাকায় সিম কিনতে পারিনি। তাহলে? পত্রিকার পাতায় পড়ছি লম্বা লম্বা ফিরস্তি। সিম বিক্রেতারা বলছেন, তারা নিয়ম ছাড়া সিম বিক্রি করেন না।

নিশ্চয়ই অন্য একটি চক্র সিম কিনে সিম বিক্রি করছে রোহিঙ্গাদের কাছে। তাহলে প্রশ্ন চলে আসে এই বিক্রেতারা কারা? সেখানে তো উন্নয়ন ও নিরাপত্তা বিষয়ে অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ওখানকার হোটেল-মোটেলের বাণিজ্য বেড়ে গেছে। এই অবস্থায় ৩০০টি সিম বিক্রির দোকান কী করে টেকনাম ও উখিয়ায় জায়গা পেল?

আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ কী তাহলে ওইসব এলাকায়? তারা যে সব তথ্য এখন দিচ্ছে, তা প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে তারাই বা পূর্বে কী ভ‚মিকা রেখেছিলেন? তাদের চোখের আড়ালে এসব হলে ধরে নিতে হবে যে, তারা মোটেও আইন প্রয়োগের জন্য নিরাপদ নন। নয় কি? জবাবদিহিতা তো তাদেরও থাকতে হবে।

আর যারা জাতীয়পত্র ইস্যু করেন, তারা কীভাবে দায় এড়িয়ে যাবেন যে, রোহিঙ্গারা কী করে জাতীয়পত্র পায় সেই প্রসঙ্গে। পত্রিকার পাতায় পড়লাম একজন রোহিঙ্গার ভুয়া জাতীয়পত্রের তদন্ত করতে গিয়ে ইসির সার্ভারে আরো ৪৬টি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশনের সার্ভার তো সুরক্ষিত।

প্রতিটি কম্পিউটারে আলাদা আইপি বা ইন্টারনেট প্রটোকল নম্বর রয়েছে। এই নম্বর জানেন ইসির কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তারাই কেবল পারেন ইসির সার্ভারে তথ্য আপলোড করতে। বাইরের লোকের পক্ষে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সার্ভারে দেয়া সম্ভব নয়। তাহলে কী বলবার থাকে নির্বাচন কমিশনের, নাগরিকত্ব প্রশ্নে আমরা বেশ সুরক্ষিত, নিরাপদ, তাই কি? আমরা বলতে পারি যে, আমরা অরক্ষিত হয়ে পড়ছি।

জাতীয় পরিচয়পত্রে জালিয়াতির বিষয়টি দেশটার নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে কতটা ভয়ঙ্কর পরিণতি টেনে আনতে পারে, বুঝে না থাকলে তা অতিসত্বর বুঝে নেয়া জরুরি। আর কী করে হলো এমন দুঃসাহসিক জালিয়াতি, এর দায় কিন্তু কোনো স্তরের কর্মকর্তা বা কর্মচারী এড়াতে পারবেন না। তদন্ত কমিটি হয়েছে বরাবরের ন্যায়।

তদন্ত কতটা আত্মসমালোচনার হবে বা আত্মপক্ষ সমর্থনের হবে, সেটা নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের ওপর। তদন্ত বিষয়টি নিছক লোক বোঝানো বা দেখানো না হয়, সেই দিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সেই সঙ্গে কী করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশে অবস্থান করে, তারও কারণ খতিয়ে দেখা দরকার।

এসব রোহিঙ্গার দ্বারা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে, সেই ব্যক্তির সঙ্গে বাংলাদেশও সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যাবে। কেবল অস্ত্র দিয়েই ধ্বংস কার্যকলাপ হয় না, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসততা অস্ত্রের চাইতেও ধারালো। যার বিনাশ ক্ষমতা বেশি। মনে রাখতে হবে।

দামি দামি মুঠোফোন ব্যবহার আর সিম কিনতে পারার বিষয়টি পরিষ্কার বলে দেয় যে, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে রোহিঙ্গারা আজ বেশ সামর্থ্যবান, সচ্ছল। ওরা খেয়েপরে, ঘুরেফিরে ভালো আছে বেশ। ওরা মিয়ানমারে কেমন ছিল, এখানে কেমন আছে, তার তুলনা করলে একটা পার্থক্য নিশ্চিত খুঁজে পাওয়া যাবে। যে পার্থক্য ওদের প্রস্থানের জন্য অন্তরায় হতে পারে।

ওরা সহজে ফিরতে চাইবে না বলে মনে হয়। বাংলাদেশে তাদের আশ্রয়ের বিষয়টি তাদের ভাগ্য খুলে দিয়েছে কিন্তু বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গাদের এই ভাগ্য খুলে দেয়াটা কতটা নিরাপদ হলো, ভাবতে হবে। যতদূর মনে পড়ে রোহিঙ্গারা যখন এই দেশে আশ্রয় নিতে শুরু করেছিল, তখন তাদের তালিকা তৈরি হচ্ছিল শরণার্থী হিসেবে। এখন তারা শরণার্থী নাকি বাংলাদেশি- এমন প্রশ্ন উদয় হয়েছে। তদন্ত করে দেখতে হচ্ছে। এখন তারা ইউটিউবে আছে। অনলাইনে তারা অনেক কিছু প্রচার করতে শুরু করেছে। এতকিছু অন্যকিছুর ইঙ্গিত দেয়। এতটা বিস্তার আর অবস্থান বাংলাদেশের জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়।

খুব হতাশ নিঃসন্দেহে। আতংকিত। যারা দায়িত্বশীল, তাদের দায়িত্ব নিয়ে। যে ঘটনাগুলো সংঘটিত, প্রকাশিত, প্রচারিত হচ্ছে তা কখনোই মঙ্গলজনক ইঙ্গিত দেয় না। মনে হচ্ছে এমন একটি বিষয়ে আমরা মোটেও যেন দক্ষ ছিলাম না, প্রস্তুত ছিলাম না। শুধু আবেগের বশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী, একজন বাংলাদেশি নাগরিকের মতো বাংলাদেশকে কখনোই ভালোবাসবে না। ভালোবাসতে পারে না।

একজন রিকশাচালক আক্ষেপ করে বলছিলেন, আমাদের দেশে বিদেশিরা ভালো আছে। সরকার আশ্রয় দিয়া তাদের ভাগ্য বদলাইয়া দিছে। তাগো প্রত্যেকের হাতে দামি দামি মোবাইল সেট। টাকা না থাকলে তো এসব হয় না। মরি শুধু আমরা। ছোট দুইডা বাচ্চা দুধ খায়, সবসময় কিনতে পারি না। বড় পোলারে দিছি গ্যারেজের কামে। কী করে আল্লাহই জানে। রাত করে ঘরে ফেরে।

ইচ্ছা ছিল পড়ালেখা করাবার। কপালে হয়নি এমন ইচ্ছা পূরণ। বেশ আক্ষেপ তার কণ্ঠে। বুঝতে অসুবিধে হলো না কাদের কথা বলছে এই রিকশাচালক। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন পাঁচ সদস্যের পরিবার চালান। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা তার। এমন অনেক পেশাজীবী বাংলাদেশি নাগরিক আছেন। রক্ত পানি করা শ্রমে যারা বেঁচে আছেন। জানি তো আমরা সবাই, না?
- লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads




Loading...