বিভাসিত সেনা নেতৃত্ব ও গণতন্ত্র

বিভাসিত সেনা নেতৃত্ব ও গণতন্ত্র
বিভাসিত সেনা নেতৃত্ব ও গণতন্ত্র - সংগৃহীত


  • ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:১৫

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট অভিশপ্ত প্রত্যুষে বাংলার ইতিহাসের মহানায়ক স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কতিপয় বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার বুলেটের আঘাতে সপরিবারে নিহত হন। বিদেশে অবস্থানের কারণে জাতির জনকের ঔরসজাত দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান।

হয়তো বাঙালির ভাগ্যবদল ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার পুনঃজাগরণ ঘটবে বলেই সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় তারা বেঁচে যান। তবে ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু পরিবারের ওপর বর্বরোচিত হামলায় যে সব সেনা কর্মকর্তা সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল তাদের বিচারকার্য সম্পন্ন হলেও অনুঘটকদের বিচার কিন্তু আজও হয়নি। নেপথ্যের কুশীলবরা রয়েছে অধরা।

দীর্ঘ বছর পর হলেও ১৫ আগস্ট হামলার নেপথ্যে যারা অনুঘটকের ভ‚মিকায় ছিল তাদের খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে একটি কমিশন গঠন করার যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতে তার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে কথা বাড়াতে চাই না। কথাটি হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েই একটি জাতি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটান।

অনেক রক্ত ঝরেছে স্বাধীনতার সংগ্রামে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে আর কোনোদিন স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না- এ প্রত্যাশা ছিল সবার। বাংলাভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় নানা পর্বের আন্দোলনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রচণ্ড সংগ্রাম ও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে মানুষের মন হয়েছিল সক্রিয়, তেজময় ও প্রচুর প্রাণশক্তিসম্পন্ন। বলতে দ্বিধা নেই ১৯৪৭ সালের পূর্বে ভারতবর্ষ বিভক্তির আগে কিছু সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতা ব্যতীত কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা বাঙালির হাতে ছিল না। দেশ ভাগের পর আশা করা হয়েছিল বাঙালি রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হবে। কেন না ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বে বাঙালির অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি কিন্তু ’৪৭-এর পরও গোটা ভারতের কোথাও বাঙালি তার রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেনি।

উল্লেখ্য, পাকিস্তানে বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তেজোদ্দীপ্ত সংগ্রামের সফল পরিণতিই বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক ক্ষমতা পেল বটে কিন্তু ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করবে তা জানা ছিল না। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর একটা ব্যাপক পরিবর্তন ঘটল। যারা নগণ্য ছিল তারা গণ্যমান্য ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হলো।

বঙ্গবন্ধুর নামের দোহাই দিয়েই শুরু হয় ক্ষমতার অপব্যবহার। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হলে শেষ পর্যন্ত তাকেও প্রাণ দিতে হলো সপরিবারে। তারপর আর একটি ধাক্কা এলো বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ওপর। নতুন অপশক্তি চেপে বসল আমাদের ওপর। এভাবে চলতে থাকে যেমন ঢেউ উঠে আর পড়ে।

রাজনৈতিক নেতা খন্দকার মোস্তাক রাষ্ট্রপতি হলেন। তদানীন্তন বঙ্গবন্ধুর সহচর অনেকেই প্রাণের ভয়ে মোস্তাক সরকারে যোগ দিলেন। জিয়া হয়ে গেলেন সেনাপ্রধান। স্বাধীনতাযুদ্ধের বীর সেনানায়ক এমএজি ওসমানীসহ প্রায় সবাই হাত গুটিয়ে ফেললেন, অসহায় আত্মসমর্পণে রাজনৈতিক এক শ্রেণির নেতার মন অধঃপতনের নীচুস্তরের দৃশ্য ভেসে উঠল রাজনৈতিক অঙ্গনে।

জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল, মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহম্মদ, এইচ এম কামরুজ্জামান, অতি উচ্চ মানসিকতার পরিচয় দিয়ে মোস্তাক সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে ইতিহাসে সমুজ্জ্বল রয়েছেন। ১৯৭৫ ৩ নভেম্বর একই চক্র জেলখানায় উল্লেখিত চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সে সময় স্বাধীন সার্বভৌম দেশের সেনাবাহিনী এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি করে।

সাড়ে তিন মাসেরও কম মোস্তাকের রাজত্বে এক ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছিল। মোস্তাক রাষ্ট্রপতি হলেও মূল ক্ষমতা ছিল সেনাবাহিনীর হাতে। ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে আর একটি ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় সিংহাসনে কে ছিল তা বাংলার জনগণের কাছে ছিল অজানা। সমস্ত মিডিয়া ছিল বন্ধ। এক অজানা আশঙ্কার মধ্যে বাংলার মানুষ দিন অতিক্রম করছিল।

৭ নভেম্বর তথাকথিত সিপাহি বিপ্লবের নামে অসংখ্য সেনা অফিসারকে হত্যা করা হয়। সেনা ছাউনির বিভিন্ন গ্রæপের সাংঘর্ষিক পরিবেশের মধ্যে চতুর জিয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তিনি দক্ষিণপন্থিদের সহযোগিতায় বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করেন। মূলত জিয়াউর রহমানের একটা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল ক্ষমতা দখলের। উচ্চাভিলাষী ক্ষমতালোভী জিয়ার পরবর্তী কর্মকাণ্ডে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়। বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি বানিয়ে নিজে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়ে দেশ চালাতে শুরু করেন।

অতঃপর ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে সায়েমকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতি হন। ক্ষমতালোভী সুচতুর জিয়া যখন বুঝতে পারেন যে, সামরিক পোশাকের শাসন বেশি দিন স্থায়ী থাকলে জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে। তাই তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সেনা ছাউনির ভেতরেই একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। জনগণের টাকায় ক্ষমতার গণ্ডির ভেতর থেকে ১৯৭৮ সালে পহেলা সেপ্টেম্বর বিএনপি নামক একটি দলের জন্ম হয়। যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেন।

বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে জিয়া রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচারকেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জনবিচ্ছিন্ন ও সামাজিক অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ নিয়ে জিয়া বিএনপি নামক একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। এর সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দর্শন ছিল না, এখনো নেই। মিথ্যা ভাঁওতাবাজি করেও তিনি বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হন। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে হ্যাঁ-না ভোটের ব্যবস্থা করেন। জিয়া সুষ্ঠু ও সুস্থ রাজনীতিটাই ধ্বংস করেছেন। ধোঁকা দিয়ে এদেশের মানুষকে বোকা বানানোর কাজটি জিয়া যথার্থভাবে করতে সক্ষম হন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য বন্ধে মোস্তাকের ইনডেমিনিটি অধ্যাদেশকে জিয়া তার আমলে পাতানো সংসদে আইন পাস করে স্থায়ীভাবে বিচার বন্ধের ব্যবস্থা করলেও কালের প্রবাহে সে বিচারকাজ বন্ধ রাখা সম্ভব হয়নি। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে এটাই তার বড় প্রমাণ।
১৯৮১ সালে ৩০ মে জিয়া প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে সামরিক বাহিনীর বুলেটের আঘাতে নিহত হন।

জিয়ার পর্ব শেষ হয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। অতঃপর ২০ নভেম্বর নির্বাচনে সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে সাত্তারকে সরিয়ে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। ক্ষমতা দখল করে তিনি জিয়ার পথই অনুসরণ করেন। সামরিক আইন জারি করেন। শুরু হয় আবার স্বেচ্ছাচারী শাসন।

এরশাদ সামরিক আইন জারি করে দেশকে কয়েকটি সামরিক প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করেন। এভাবেই চলতে থাকে। জিয়ার মতো তিনিও ক্ষমতায় থেকে রাজনৈতিক দল গঠন করেন। প্রথমে জনদল পরবর্তীতে জাতীয় পার্টি নামক দল গঠন ভুয়া গণতন্ত্রের খেলা শুরু করেন। তিনি এক ধাপ এগিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেন অথচ কী নির্মম পরিহাস সেই এরশাদ ২০১৪ থেকে ১৮ পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সহযোগী ছিলেন। মহাজোট সরকারে এরশাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূতের দায়িত্বও পালন করেছেন। রাজনীতিতে সব কিছুই সম্ভব।

এটা সবাই জানে, তারপরও প্রাসঙ্গিকভাবেই উল্লেখ করতে হচ্ছে যে, জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টিরও সুনির্দিষ্ট কোনো আদর্শ ছিল না। ছিল না কোনো দর্শন। তিনি সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রবর্তন করে স্বাধীন বাংলাদেশের মূল চেতনার প্রতি চপেটাঘাত করেন। সেই ব্যথা নিয়ে আমাদের চলতে হচ্ছে এবং আজীবন চলতে হবে। কেননা ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক চেতনা বরণকারী দল আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েও রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বাদ দিতে সাহস পায়নি।

এটা এতটাই স্পর্শকাতর যে, এটাতে হাত দিলে গদি উল্টে যেতে পারে। উল্লেখ্য, এরশাদের সামরিক শাসন ও জিয়ার সামরিক শাসনের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। একটা পার্থক্য ছিল এই যে, এরশাদ যে কয়টি অঞ্চল ভাগ করেছিল তার একেকটি ভাগের একজন করে মালিক তৈরি করেছিল। মনে আছে সামরিক ‘ক’ অঞ্চলের প্রশাসক ছিলেন মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান। তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল।

একদিন বিকেলে আমি তার মোহাম্মদপুরের বাসায় গিয়েছিলাম আধুনিক সাজসজ্জায় সুসজ্জিত বাস ভবনের ড্রইং রুমে বসে একসঙ্গে চা পান করতে করতে উনি বলেছিলেন ‘আসলে সামরিক আইন বলে কিছুই নেই। ইহা ব্যক্তি ইচ্ছানির্ভর একটি আইন অর্থাৎ সামরিক আইনের প্রধান প্রশাসকের ইচ্ছামাফিক দেশ পরিচালনার কাজটিই এই আইনের প্রধান শর্ত। কাজেই সামরিক শাসক প্রধান যদি সৎ ও আদর্শবান হন তবে একটি দেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে তাতে জনগণের সমর্থনও থাকে।

যদি অসৎ হন কিংবা দুর্নীতিবাজ হন তাহলে তার বিরুদ্ধে জনগণ আপনা-আপনিই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেমনটি ঘটেছিল এরশাদের বিরুদ্ধে। ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন ঘটে। রাজনীতির নানা মেরুকরণে ভিন্ন এক সমীকরণে ১৯৯১ সালে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পুনঃ যাত্রা শুরু হয় কিন্তু বিএনপি নামক যে দলটি ক্ষমতাসীন হয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রকে হরণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। জনগণ আবার আন্দোলন, সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

১৯৯৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। উল্লেখযোগ্য সফলতার দিকে দেশ এগিয়ে যেতে থাকে। আইনের শাসন বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। দুর্ভাগ্য জাতির, ২০০১ সালে ১ অক্টোবরে একটি ষড়যন্ত্রের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করলে দেশ আবার মধ্য যুগের শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যায়।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম যাত্রার ক্ষমতাকালটি গুড গর্ভনমেন্টের মর্যাদা অর্জন করেছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণেই শেখ হাসিনাকে পরাজয়বরণ করতে হয়। অতি ডানপন্থি ফ্যাঁসিবাদী চক্র ২০০১-এ ক্ষমতাসীন হয়ে দেশকে নব্য পাকিস্তানে রূপান্তর করে। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃশাসন মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিরল ঘটনা। রাজনৈতিক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে শঙ্কিত জনজীবনকে স্বস্তিদানের লক্ষ্যে ওয়ান ইলেভেনে অনির্বাচিত এক নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

ফকরুদ্দিনের নেতৃত্বে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেশ কিছু সংস্কার পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জনগণ তাতে সমর্থন দেয়। এর মধ্যে বহুল আলোচিত পদক্ষেপ ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াসহ বড় বড় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিল্পপতিকে গ্রেফতার করা হয় দুর্নীতির অভিযোগে। প্রথমদিক দিয়ে তাদের কাজে সমর্থন পেলেও ধীরে ধীরে জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। দুর্নীতি রুখতে নিজেরাই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। সেটাকে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলা হলেও মূলত ওই সরকার ছিল সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার।

অন্য অর্থে বেসমারিক মোড়কে সামরিক সরকার। ২ বছর শাসনের পর ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ছিল ওই সরকারের একটা বড় সফলতা। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিপুল বিজয়ের পর শেখ হাসিনা ২য় বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সেই থেকে গণতান্ত্রিক সরকারের ধারাবাহিক পথ চলা। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে দেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে সেই সঙ্গে সেনাবাহিনীতেও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন।

সেনাবাহিনী জনগণেরই একটি অংশ গণতন্ত্র মজবুতকরণে তাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ উন্নয়নমূলক কাজে সশস্ত্রবাহিনীর অবদান কম নয়। সেনা নেতৃত্ব যদি যথার্থ না হয় তবে সে দেশের গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য। সেনা নেতৃত্ব আজ বিভাসিত। বিভাসিত নেতৃত্বের কারণে সেনাবাহিনী তার মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হতে পেড়েছে। বর্তমানে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহম্মেদ অত্যন্ত মেধাবী এবং উচ্চজ্ঞানসম্পন্ন একজন সেনানায়ক। মানবিক উৎকর্ষের এক উচ্চতর পর্যায়ে তিনি অধিষ্ঠিত হতে পেরেছেন।

ভয়হীনতা ও হৃদয়বত্তা এ দুটো গুণের সংহতি ঘটিয়ে কীভাবে কর্মজীবনকে এগিয়ে নিতে হয় সেটি জেনারেল আজিজ দেখিয়ে দিয়েছেন। তীব্র নির্ভীকতা আর তীব্র হৃদয়বেত্তার একত্রে সমাবেশ ঘটানো কঠিন কাজ। সেই কাজটি আজিজের মতো মহত্ত্ববানরাই করতে সক্ষম হন। মানবিক মূল্যবোধ, শান্তি ও সমন্বয়ের মাহাত্ম্য বিরোধের মীমাংসার লক্ষ্যে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ অবিচল আস্থার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছেন জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে।

আমরা কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর গুণকীর্তন করে লেখালেখি করি, বক্তৃতা করি। বেঁচে থাকতে তার কৃতিত্বের মর্যাদা দেই না। তাই আজ আমি সগর্বে বলতে চাই-সেনা নেতৃত্ব বিভাসিত। গণতন্ত্রের যাত্রাকে বেগবান করতে বিভাসিত নেতৃত্বের অপরিহার্যতা বিবেচনায় নিয়ে দেশকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। তবেই দেশ ও জাতির প্রকৃত মঙ্গল হবে।

লেখক: কলাম লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads




Loading...