জাপানে নতুন কর্মসংস্থান

জাপানে নতুন কর্মসংস্থান
সাহাদাৎ রানা - ফাইল ছবি


  • সাহাদাৎ রানা
  • ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:৪৪

বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৬৫টি দেশে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি বিভিন্ন পেশায় কর্মরত আছেন। এত বিপুল সংখ্যক জনশক্তির পরিশ্রমের প্রাপ্তিটাও আমাদের দেশের জন্য কিন্তু কম নয়। কারণ যারা বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছেন তারা তাদের উপার্জনের বড় একটা অংশ দেশে পাঠান। তাদের মূল উদ্দেশ্যই হলো প্রিয়জনদের জন্য উপার্জন করা। আমাদের দেশ থেকে এত বিপুল জনশক্তির অর্থনৈতিক প্রাপ্তিটাও অনেক বড়। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন আমাদের সে খবরই দিচ্ছে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেমিট্যান্স আহরণে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ।

আর এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান তিন-এ। ধীরে ধীরে এমন প্রাপ্তির সংখ্যাটা আরো বাড়ছে। বিশেষ করে গত প্রায় দুই দশক ধরে আমাদের দেশ থেকে জনশক্তি রফতানির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর ফলে সব দিক দিয়েই লাভবান হচ্ছি আমরা। বিশেষ করে দক্ষ শ্রম রফতানিতে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ এখন একটি প্রভাবশালী দেশে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, ইদানীং বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে বাংলাদেশের শ্রমিকদের বিপুল চাহিদাও তৈরি হয়েছে। কারণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ জনশক্তি আমরা রফতানি করতে সক্ষম হচ্ছি। এবং এর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। এটা আমাদের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক খবর।

ইতিবাচক আরো একটি খবর দিয়ে লেখায় প্রবেশ করা যাক। খবরটি হলো- জাপানে নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে অনেক নতুন কর্মসংস্থানের। সম্প্রতি জাপানের রাজধানী টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি সহযোগিতা চুক্তি সই করেছেন বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব রৌনক জাহান ও জাপানের বিচার বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ইমিগ্রেশন সার্ভিস এজেন্সির কমিশনার সোকো সাসাকি। এই চুক্তির ফলে জাপানে কর্মী পাঠানোর তালিকায় নবম দেশ হিসেবে যুক্ত হলো বাংলাদেশ। এখন এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ পাঁচ বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে পারবে জাপানে। মূলত এই চুক্তির আওতায় আগামী পাঁচ বছর জাপানে ১৪টি খাতে বিশেষায়িত দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর বিষয়টি বাস্তবায়িত হবে। এখানে মূলত দুটি ক্যাটাগরিতে জনশক্তি জাপানে যাবে।

প্রথম ক্যাটাগরির বিষয়টি হলো- যেখানে আগামী পাঁচ বছরে কেয়ার ওয়ার্কার, বিল্ডিং ক্লিনিং ম্যানেজমেন্ট, মেশিন পার্টস ইন্ডাস্ট্রিজ, ইলেকট্রিক, ইলেকট্রনিক্স, কনস্ট্রাকশন, জাহাজ শিল্প, অটোমোবাইল, কৃষিসহ দেশটির ১৪টি খাতে লোক নেবে জাপান। তবে সেই শ্রমিককে অবশ্যই দক্ষ এবং জাপানি ভাষায় পারদর্শী হতে হবে। তবেই বাংলাদেশি কর্মী হিসেবে নিয়োগ পাবে সেখানে। এটা কর্মসংস্থানে জাপানে যেতে ইচ্ছুক মানুষের জন্য নতুন আলোর দিগন্ত। প্রথম ক্যাটাগরির পর রয়েছে আরো বড় কিছুর হাতছানি। এখানে প্রথম ক্যাটাগরিতে জাপানি ভাষা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ বাংলাদেশিরা পরিবার ছাড়া জাপানে পাঁচ বছর পর্যন্ত কাজ করার সুযোগ পাবেন। এরপর তাদের জন্য রয়েছে দ্বিতীয় ধাপ। যেখানে দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে প্রথম ক্যাটাগরিতে পাঁচ বছর কাটানো কর্মীদের থেকে জাপানি ভাষা ও নির্দিষ্ট কাজে বেশি দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীরা পরিবারসহ অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাজ করার সুযোগ পাবেন। এটা দক্ষ শ্রমিকদের জন্য আশার খবর। এখানে আরো আনন্দের তথ্য হলো, বিনা খরচে জাপান যাওয়ার সুযোগ পাবেন এসব দক্ষ কর্মীরা।

এটা নিঃসন্দেহে আমাদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য একটি বড় সুযোগ। এর জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। বিশেষ করে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার।

এমন একটা সময় ছিল যখন আমাদের দেশের মানুষ কাজের জন্য জাপানে যাওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল। কারণ সেখানে যাওয়া মানেই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। মাঝে নানা কারণে সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র অনেকটা ম্লান হয়েছিল। জাপানে সেভাবে যেতে পারেনি বাংলাদেশি শ্রমিকরা। অবশ্য দুই বছর আগে এর মূল জট খোলে। সে সময় এ বিষয়ে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল।

এরপর ২০১৭ সাল থেকে কারিগরি শিক্ষানবিস হিসেবে কিছু কর্মী যাচ্ছেন জাপানে। এর আওতায় ইতোমধ্যে সরকারিভাবে কারিগরি শিক্ষানবিস হিসেবে কর্মী পাঠানো হচ্ছে। এবার নতুন করে ১৪ খাতে বিশেষায়িত দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে যে চুক্তি স্বাক্ষর হলো তা আমাদের জন্য নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। এমন একটি সুখবর আমাদের নতুন করে আশান্বিত করেছে। বিশেষ করে জাপানের মতো উন্নত দেশের শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে।

জাপানের মতো একটি উন্নত দেশে এভাবে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার খবর আমাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক। কারণ জাপান অর্থনৈতিকভাবে অনেক শক্তিশালী দেশ। বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে জাপানের বেশ সুনাম রয়েছে বিশ্ব শ্রমবাজারে। কেননা, বাস্তবতা হলো এখন মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের অবস্থা আর আগের মতো নেই। ঠিক এই সময়ে বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে জাপানের দ্বার উন্মোচিত হওয়া মানে আমাদের জন্য আয়ের বড় সুযোগ তৈরি হওয়া। বড় সুযোগ এ কারণে যে, সারা বিশ্বে বাংলাদেশি শ্রমিক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে থাকলেও শিল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে উপস্থিতি আশানুরূপ নয়, তুলনামূলক কম।

তবে যারা জাপান যেতে ইচ্ছুক তাদের কিছু অত্যাবশ্যকীয় শর্তের দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে। কেননা এখানে ইচ্ছে করলেই মধ্যপ্রাচ্যের মতো অদক্ষ-আধাদক্ষ শ্রমিক পাঠানো যাবে না। জাপান দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিক নেবে। এক্ষেত্রে শ্রমিককে অবশ্যই কিছু বিষয়ে জানতে ও মানতে হবে। যেহেতু আগামী পাঁচ বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ বিদেশি কর্মী নেবে জাপান তাই এখানে সুযোগটাও থাকছে দীর্ঘদিন ধরেই। তাই সুযোগটা নিতে হবে। আমাদের এক্ষেত্রে কিছু পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। প্রথম কথা হলো- সবার আগে জাপানে জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে জোর দিতে হবে জাপানি ভাষা শিক্ষার ওপর।

যিনি বা যারা জাপানে কর্মসংস্থানের বিষয়ে আগ্রহী হবেন তাদের সবার আগে শিখতে হবে জাপানি ভাষা। তাই এখন যারা যেতে আগ্রহী তারা জাপানি ভাষা শেখার প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারেন। কারণ চার মাস মেয়াদি জাপানি ভাষা শেখার প্রশিক্ষণের পর পরীক্ষায় বসবেন আগ্রহী কর্মীরা। যারা প্রাথমিকভাবে এখানে উত্তীর্ণ হবেন তারপর তাদের জাপানের ব্যবস্থাপনায় আরো চার মাসের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। সেখানে প্রশিক্ষণের পর শিক্ষানবিস হিসেবে সুযোগ পাবেন জাপান যাওয়ার। এখানে চুক্তি অনুযায়ী যারা জাপানে চাকরি পাবেন, তাদের কোনো অর্থ খরচ করতে হবে না। বিনা খরচে তারা সেখানে যেতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে সবাইকে প্রতারকদের কাছ থেকে সতর্ক থাকতে হবে।

অবশ্য এখানে আরো একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়াতে ইতোমধ্যে বেসরকারি জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এর ফলে অনেক যুবক জাপানি ভাষা শিখে ও প্রশিক্ষণ নিয়ে উপকৃত হবেন। যারা যোগ্য তারাই যেতে পারবেন জাপানে। এর ফলে জাপানে আমাদের দক্ষ শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হোক,
এমনটাই প্রত্যাশা। - লেখক: সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...