কোরবানি ও ঈদের দিনের আমল


  • ১১ আগস্ট ২০১৯, ১৬:০৭

ইসলামে কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কোরবানি নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে’ সূরা হাজ্জ-৩৪। কোরবানি মূলত নামাজের সঙ্গে সংযুক্ত ইবাদত, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন। ’ সূরা কাওসার-২।

কোরবানি নামাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আপনি বলুন : আমার নামাজ, আমার কোরবানি এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে।’ সূরা আনআম-১৬২। এটি আদায় করা কারো মতে ওয়াজিব আবার কারো মতে সুন্নাতে মোয়াক্কাদা। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রা. থেকে বর্ণিত, ‘আমি ইবনে উমার রা.-র নিকট কোরবানি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম যে, তা ওয়াজিব কি না? তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. কোরবানি করেছেন, তাঁর পরে মুসলমানরাও কোরবানি করেছে এবং এ সুন্নাত অব্যাহতভাবে প্রবর্তিত হয়েছে।’ ইবনে মাজাহ ইফা -৩১২৪। তিরমিযী (ইফা) -১৫১২।

ইমাম মালিক রহ. বলেন : “কোরবানি করা সুন্নাত (মুয়াক্কাদা)। ইহা ওয়াজিব নয়। যে কোরবানি ক্রয় করতে সামর্থ্য রাখে, তাঁর পক্ষে কোরবানি না করা আমি পছন্দ করি না।” মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস নং ১০৩১। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, “রাসুল সা. পবিত্র মদিনায় দশ বছর জীবন-যাপন করেছেন। প্রত্যেক বছরই তিনি পশু কোরবানি করেছেন।” তিরমিযি (ইফা)১৫১৩।

রাসুল সা. উম্মতকে কোরবানি দেয়ার জন্য তার বাক্য দ্বারা উদ্বুদ্ধ ও তাকিদ করেছেন, সামর্থ্য থাকা সত্তে¡ও যে ব্যক্তি কোরবানি পালন করে না তার ব্যাপারে তিনি বলেন, “যার কোরবানির সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কোরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।” ইবনে মাজাহ (ইফা)-৩১২৩।

কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যে কোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরি। ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক সম্পাদন করা। এ উদ্দেশ্যক সামনে রেখে কোরবানির করণীয় কিছু জরুরি হাদিস উল্লেখ করা হলো।

কে কোরবানি করবেন: আল মাওছু’আ আল ফিকহিয়া কিতাবে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের সদস্য শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জেদ বলেছেন, প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর একটি কোরবানির পশু ক্রয় করার সামর্থ্য যদি থাকে তাহলে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব /সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। ব্যাখ্যা সূত্র : ইবনে মাজাহ, ৩১২৩।

কোরবানির সময়: মোট তিনদিন কোরবানি করা যায়, জিলহজের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে ১০ তারিখেই কোরবানি করা উত্তম।

কোরবানির দিন প্রথম যে কাজ: বারাআ রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খুৎবাহ দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের আজকের এ দিনে আমরা যে কাজ প্রথম শুরু করব, তাহলো সালাত আদায় করা। অতঃপর ফিরে আসব এবং কোরবানি করব। তাই যে এ রকম করে সে আমাদের রীতি সঠিকভাবে মান্য করল।’ সহীহ বুখারী (ইফা) হাদিস নাম্বার : ৯০৩।

কোন কোন পশু দ্বারা কোরবানি করা যাবে: উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কোরবানি করা যাবে। যেসব পশু কোরবানি করা জায়েজ সেগুলোর নর-মাদী দুটোই কোরবানি করা যায়। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছর, উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে।

কোরবানির পশুতে শরিকের সংখ্যা কত জন: একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কোরবানি দিতে পারবে। ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা এমন একটি পশু কয়েকজন মিলে কোরবানি করলে কারোটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরিক হতে পারবে।
কেমন পশু হবে এবং কি উদ্দেশ্যে কোরবানি হবে: হযরত আয়িশা রা. ও আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত- তারা বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. কোরবানির ইচ্ছা করলে দু’টি মোটাতাজা, মাংসল, শিংযুক্ত, ধুসর বর্ণের মেষ ক্রয় করতেন। কোরবানির পশু হƒষ্টপুষ্ট ও সুন্দর হওয়া উত্তম। পশু কিনতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, কিনার পর ‘দাম বেশি হয়েছে’ ওমুকেরটায় গোস্ত বেশি, ওমুকেরটায় গোস্ত কম এ জাতীয় কথা অথবা লোকদেখানো প্রতিযোগিতা করা যাবে না।

যে পশু কোরবানি করা যাবে না: “উবাইদ ইবনে ফাইরূয রা. বলেন, আমি বারাআ ইবনে আযিব রা. কে বললাম, রাসুলুল্লাহ সা. যে ধরনের পশু কোরবানি করতে অপছন্দ অথবা নিষেধ করেছেন সেই সম্পর্কে আমাদের বলুন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর হাতের ইশারায় বলেন, এরূপ, আর আমার হাত তাঁর হাতের চেয়ে ক্ষুদ্র। চার প্রকারের পশু কোরবানি করলে তা যথেষ্ট হবে না। অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট, রুগ্ন পশু যার রোগ সুস্পষ্ট, খোঁড়া পশু যার পঙ্গুত্ব সুস্পষ্ট এবং কৃশকায় দুর্বল পশু যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে। উবাইদ রা. বলেন, আমি ত্রæটিযুক্ত কানবিশিষ্ট পশু কোরবানি করা অপছন্দ করি। বারাআ রা. বলেন, যে ধরনের পশু তুমি নিজে অপছন্দ করো তা পরিহার করো, কিন্তু অন্যদের জন্য তা হারাম করো না।” ইবনে মাজাহ (ইফা)-৩১৪৪। তিরমিযি (ইফা)-১৫০৩।

নিজের কোরবানির পশু নিজে জবাই করা: আনাস রা. থেকে বর্ণিত। “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি সাদা-কালো বর্ণের ভেড়া দ্বারা কোরবানি করেছেন। তখন আমি তাকে দেখতে পাই তিনি ভেড়া দু-টোর পার্শ্বদেশে পা রেখে বিসমিল্লাহ -ও আল্লাহ আল্লাহ” পড়ে নিজের হাতে সে দুটোকে যবাহ করেন।” সহীহ বুখারী (ইফা)-৫১৬০। তিরমিযি (ইফা)-১৫০০। মুসলিম (ইফা) -৪৯২৭। কোরবানির পশু নিজে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করানো যাবে।

কোরবানির গোশত তিনদিনের অধিক রেখে,খাওয়া যাবে কি: জাবির রা. কর্তৃক “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত যে, তিনি তিনদিনের ওপর কোরবানির গোস্ত খাওয়া থেকে নিষেধ করেছেন। আবার পরবর্তী সময়ে বলেছেন, এখন তোমরা খেতে পার, পাথেয় হিসাবে ব্যবহার করতে পার এবং জমা করে রাখতে পার”। সহীহ মুসলিম (ইফা)-৪৯৪৩।

কোরবানির গোশত বণ্টন: আল্লাহ তায়ালা বলেন, “সুতরাং সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় তাদের যবেহ করার সময় তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। অতঃপর যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায় তখন তা থেকে তোমরা আহার কর এবং আহার করাও যে কিছু যাঞ্জা করে না (খোঁজে না) তাকে এবং যে যাঞ্জা করে (খোঁজে) তাকে।” সূরা হাজ্জ-৩৬।

ঐ যাঞ্জা না করা (না খোঁজা) লোকগুলো কারা তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন,“খয়রাত ঐ সকল গরিব লোকের জন্যে যারা আল্লাহর পথে আবদ্ধ হয়ে গেছে-জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র ঘোরাফেরা করতে সক্ষম নয়। অজ্ঞ লোকেরা যাঞ্চা না করার কারণে তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে। তোমরা তাদেরকে তাদের লক্ষণ দ্বারা চিনবে। তারা মানুষের কাছে কাকুতি-মিনতি করে ভিক্ষা চায় না।” সূরা বাকারা-২৭৩। কোরবানির গোশত ঐ সব অভাবি গরিব-মিসকীন আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়াই উত্তম।

জবাইকারী কসাইকে গোশত দেওয়া যাবে কি না: জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে না। আলী রা. থেকে বর্ণিত “তাঁকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিজের কোরবানির জানোয়ারের পাশে দাঁড়াতে আর এগুলোর সমুদয় গোস্ত, চামড়া এবং পিঠের আবরণসমূহ বিতরণ করতে নির্দেশ দেন এবং এর থেকে যেন কসাইকে পারিশ্রমিক হিসাবে কিছুই না দেওয়া হয়।” সহীহ বুখারী (ইফা)-১৬০৯। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর, পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোস্ত খাওয়ানো ও দেওয়া যাবে।

কোরবানির পশুর বিক্রীত দ্রব্যের অর্থ পুরোটাই সাদাকা করে দিতে হবে: কোরবানির পশুর চর্বি, হাড়, সিং ও চামড়া কোরবানিদাতা নিজে ব্যবহার করলে করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করেলে অর্থ পুরোটাই সদকা করে দিতে হবে।
ঈদের দিনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত করণীয়: ১) ফজরের নামাজ জামায়াতে আদায় করা।

২) ঈদের দিন গোসল করা। মুয়াত্তা মালেক-৪২৮। ৩) নতুন বা পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা। বায়হাকি-৩/২৮১। ৪) ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদে কিছু না খেয়ে যাওয়া এবং এসে কোরবানির গোস্ত প্রথমে খাওয়া সুন্নাত, যদি খুব দেরি না হয় তবে সুন্নাতটা পালন করা উচিত। বুখারি-৯৫৩, তিরমিযী-৫৪২, দারেমী-১৬০৩। ৫) হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া এবং আসার সময় হেঁটেই আসা এবং ভিন্ন রাস্তা দিয়ে আসা। সহিহ ইবনে মাযাহ-১০৭০। ৬) ঈদের নামাজ মসজিদে না পড়ে ঈদের মাঠে পড়া তবে বৃষ্টির কারণে মসজিদে পড়া জায়েজ রয়েছে।- বুখারি। ৭) আরাফার দিন ফজরের নামাজ থেকে ১৩ জিলহজ আসর নামাজ পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয নামাজের পর এই তাকবীর পাঠ করা- ‘‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’’ এছাড়াও ১৩ তারিখ পর্যন্ত যে কোনো সময় পড়াও উত্তম। -বুখারি।

৮) ঈদের সালাতে নিজেরা যাওয়ার পাশাপাশি মহিলাদেরকে সাথে নেওয়া এবং তাদের জন্য ঈদের মাঠে অবশ্যই আলাদা ব্যবস্থা রাখা। বুখারি-৩২৪। ৯) একে অন্যকে এই বলে ঈদের শুভেচ্ছা জানানো- ‘তাকাববালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ অর্থ- আল্লাহতায়ালা আমাদের ও আপনার ভালো কাজগুলো কবুল করুন। ফাতহুল বারি, অধ্যায়-২, পৃঃ ৪৪৬। ১০) অবশ্যই ঈদের নামাজ আগে আদায় করে এসে তারপর কোরবানি করা, নামাজের আগে কোরবানি করলে কোরবানিই হবে না। -বুখারি-৯৫৫। ১ ১ ) ঈদের দিন অপচয় ও অপব্যয় না করা।

১২ ) গান-বাজনা, নাটক-সিনেমা, বেপর্দাসহ সমস্ত হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা। ১৩ ) শুধুমাত্র ঈদের দিনটাকেই নির্ধারিত করে কবর যিয়ারত করা ঠিক নয়, এমনিতে যে কোনো সময় কবর যিয়ারত করতে পারেন। ১৪ ) ঈদের রাতে কোনো বিশেষ ইবাদত সহিহ সূত্রে প্রমাণিত নয়, সুতরাং কোন বিশেষ ইবাদত করতে হবে না। ঈদের দিনে কোরবানি করাই সর্বোত্তম ইবাদত, অন্য বিশেষ কোনো ইবাদতের প্রমাণ পাওয়া যায় না।

আল্লাহপাক যেন আমাদেরকে তার নির্দেশগুলো রাসুল সা. এর সুন্নাহ মোতাবেক পালন করার তৌফিক দান করেন। আমিন।
- লেখক: সাবেক প্রক্টর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads




Loading...