জীববৈচিত্র্য ও আমাদের ভাবনা



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৯ আগস্ট ২০১৯, ১৪:২৬

জীববৈচিত্র্য শব্দের মূল অর্থটি সর্ব সাধারণের জানা নেই। জানেন এমন মানুষটিও ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অনেক সময় ওলট-পালট করে ফেলেন। কিংবা শব্দটার মধ্যে ভিন্ন কিছু খোঁজার চেষ্টা করেন। আবার অনেকেই শব্দের অর্থটা বোঝেন ঠিকই তবে বোঝাতে সক্ষম নন। ফলে তিনি যাই বোঝেন সেটিকেই জীববৈচিত্র্য হিসাবে ধরে নেন। বেশিরভাগ মানুষেরই ধারণা জীববৈচিত্র্য বলতে বন্যপ্রাণীদের সার্কেলকে বোঝানো হচ্ছে। আসলে তা নয়।

শব্দটার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে প্রাণের বৈচিত্র্য। খুব সহজ অর্থ। তার পরেও মাথায় নিতে পারেন না অনেকেই। ফলে বিষয়টা নিয়ে লেখার আগ্রহ জাগে। এতে করে সর্বসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

আমরা জানি সমগ্র প্রাণিকুলকে বেঁচে থাকতে হলে একটা সার্কেলের প্রয়োজন। আর সেই সার্কেলটিই হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। অর্থাৎ এক প্রজাতিকে টিকে থাকতে হলে অন্য প্রজাতির ওপর নির্ভরশীলতাই হচ্ছে জীববৈচিত্র্যের মূল বিষয়। এ সার্কেলের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মানুষ। মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে সর্ব প্রথম প্রয়োজন খাদ্য এবং ওষুধের, যা আহরিত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য থেকেই। যেমন সহজ উদাহরণটি হচ্ছে; মানুষ খায় হাঁস, হাঁস খায় মাছ, মাছ কেঁচো খায়... ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ রিসাইকেল বলতে যা বুঝায় সেটিই জীববৈচিত্র্য। সুতরাং আমরা বলতে পারি শুধু আমাদের দেশের জন্যই জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব আধিক্য নয়; সমগ্র বিশ্বেই রয়েছে এই জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক প্রয়োজনীয়তা। জীববৈচিত্র্য নিয়ে জানলে যেমনি একজন মানুষ সচেতন হবেন তেমনি অন্যকেও গুরুত্ব বুঝাতে সক্ষম হবেন।

মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাচ্ছি আবার। আমরা জানি বিশ্বে বিষুব অঞ্চলের কাছাকাছি কর্কটক্রান্তি এবং মকরক্রান্তির মাঝামাঝি এলাকা মেগাডাইভারস হিসাবে বিবেচিত। এখানেই সবচেয়ে বেশি জীববৈচিত্র্যের সন্ধান পাওয়া যায়। আর তেমনি একটি অঞ্চলেই আমাদের বাংলাদেশের অবস্থান। সেই হিসাবে আমরা অনেকটাই সৌভাগ্যবান বলতে পারেন। কিন্তু আমরা তার মর্ম উপলব্ধি করতে পারিনি আজ অব্দি। অহেতুক জীবের বিনাশ ঘটাচ্ছি। কারণে অকারেণই এই কাজটি করছি আমরা। যে পোকা বা পতঙ্গটি মারার দরকার নেই; অথচ ওকে পিষে মারছি জুতার নিচে ফেলেই। এটি অনেক সময় কিন্তু ইচ্ছেকৃতই করছি না আমরা, করছি মনের অজান্তেও। এ বদ অভ্যাসটি আমাদের একদিনে তৈরি হয়নি। জন্মের পর অর্থাৎ জ্ঞান হওয়া অবধি থেকে আমরা এসব দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়েছি। অকারণে বন্যপ্রাণী নিধন, পাখির মাংস খাওয়া কিংবা পোকামাকড় পিষে মারা। এসব আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি; করছিও তাই। যা আমরা এখন চট করে পরিহার করতে পারছি না। ফলে জীববৈচিত্র্য আমাদের কাছে তুচ্ছ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের সমগ্র দেশেই জীববৈচিত্র্যে ভরপুর, তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুন্দরবন এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপে জীববৈচিত্র্যে ঠাসা। প্রথমে আমরা সুন্দরবনের হিসাব নিকাষে যাচ্ছি। দুই বাংলাব্যাপী সুন্দরবনের বিস্তৃতি হলেও বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গ অংশের আয়তন ৩৯৮৩ বর্গ কিলোমিটার। মোট দশ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের অরণ্যটি ইতিমধ্যে বিশ্বের অন্যতম ‘ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ’ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে জীববৈচিত্র্যের কারণে। এই শ্বাপদশঙ্কুল অরণ্যটি যুগযুগ ধরে মানুষের কাছে এক রোমাঞ্চকর জঙ্গল হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আর রোমাঞ্চকর বলেই হয়তো এ জঙ্গলের গুরুত্ব অপরিসীম পর্যটকদের কাছে। যার প্রধান কারণ জীববৈচিত্র্য!

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এ সুন্দরবনেই পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের শতকরা ৪০ ভাগের সন্ধান পাওয়া গেছে। বিস্ময়কর তথ্য বটে! তন্মধ্যে রয়েছে ২৭০ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৫০ প্রজাতির মাছ ছাড়াও রয়েছে হাঙ্গর, কুমির, ডলফিন ও বিশ্বখ্যাত রয়েলে বেঙ্গল টাইগার। আর বিভিন্ন ধরনের দুষ্পাপ্য উদ্ভিদের কথা আমরা বাদই দিলাম। সূত্রমতে জানা যায়, সুন্দরবনে মোট ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। তন্মধ্যে ৮৭টি একবীজপত্রী, ২৩০টি দ্বিবীজপত্রী, ১৭টি ফার্ন জাতীয়, ১৩ প্রজাতির অর্কিড ও ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল, যার প্রতিটি উদ্ভিদই জীববৈচিত্র্যের রক্ষণাবেক্ষণের ভূমিকা রাখছে।

সুন্দরবনের পরেই রয়েছে সেন্টমার্টিনের দ্বীপের অবস্থান। জীববৈচিত্র্যে ঠাসা সেন্টমার্টিন দ্বীপেও। মাত্র ৮ বর্গকিলোমিটার পরিধির একটা দ্বীপ। অথচ দ্বীপটি যেন জীববৈচিত্র্যের স্বর্গরাজ্য। এক সমীক্ষায় জানা যায়, এই দ্বীপে ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৫০ প্রজাতির মাছ, ৫ প্রজাতির দুর্লভ কাছিম, ১৫ প্রজাতির সাপ, ৩০০ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ২০০ প্রজাতির পাখি (দেশি ও পরিযায়ী মিলিয়ে), ৫ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৫ প্রজাতির টিকটিকি-গিরগিটি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। রয়েছে পাথুরে শিলা ও হরেক রকম শৈবালের রাজ্য। এছাড়াও অসংখ্য নারিকেলগাছ এবং কেয়াবনসহ নানান ধরনের উদ্ভিদ রয়েছে। যার কারণেই সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বলা হয়েছে বিশ্বের দুর্লভতম স্থানের একটি। বিশেষ করে স্বল্প আয়তনের আর কোনো স্থানে এমন নৈসর্গিক দৃশ্য ও বহুল প্রজাতির উদ্ভিদ এবং জীববৈচিত্র্যের সন্ধান পাওয়া
যায় না।

সব মিলিয়ে আমরা গর্বিত আধিক্য জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে বসবাস করতে পেরে। যদিও এর সারমর্ম বুঝতে সক্ষম নন অনেকেই। বেশিরভাগ মানুষেরই ধারণা, কীটপতঙ্গ দেখলেই পিষে ফেলা উচিত। আসলে যে পোকাটি আমাদের বেঁচে থাকতে নানাভাবে সাহায্য করছে, তা কিন্তু আমরা টের পাচ্ছি না মোটেই।

সেটি আমাদের বোঝাতে হবে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে। কেবল বিশেষ দিবসে এর গুরুত্ব তুলে ধরলে চলবে না, সবসময়ই কমবেশি জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে মানুষকে ধারণা দিতে হবে, তাহলেই রক্ষা পাবে আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বিশাল ভাণ্ডারটি।- লেখক: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...