রবীন্দ্রনাথ: সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে উজ্জ্বল নক্ষত্র



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৮ আগস্ট ২০১৯, ১৪:৩৬

বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের আসন পোক্ত বলেই জানি। আমরা যারা এখন জীবনের গোধূলি বেলায়, আমাদের জানা আছে একাত্তরে কী হয়েছিল। কী ঘটেছিল পাকিস্তান আমলে। পাকিস্তান ও ভারত দুটো দেশই স্বাধীন হয়েছিল ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গর্ভে। ব্রিটিশের চাল হোক আর আমাদের অজ্ঞতা হোক-সত্য হলো এই কোনো সম্প্রদায়ের নেতাই মূলত ধর্মের বাইরে পা রাখতে পারেননি।

বলাবাহুল্য জিন্নাহ যেহেতু মাটির সন্তান ছিলেন না তাই উপমহাদেশের মানুষের জন্য তার তেমন কোনো টানও ছিল না। আমাদের পূর্বপুরুষরা সেই সময় পাকিস্তানে থাকার জন্য ভোট দেয়। সে সুবাদে আমরা পড়ি পূর্ব পাকিস্তানে। যে রাষ্ট্রের সূচনাতেই আমাদের ভাষা বাংলা ভাষা পড়ে ঘোর বিপদে। পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ভাষী নেতারা ধরে নিয়েছিল তারাই আমাদের চাইতে সেরা। আর সে কারণে তারা যা বলবে, সেটাই চলবে, সেটাই আইন।

এরা বাংলা ভাষাকে আক্রমণ করার পাশাপাশি কবি রবীন্দ্রনাথকেও টার্গেট করে। অমুসলিম বলে তার চর্চা, তার গান, সবকিছু নিষিদ্ধ করা হয়। নিষিদ্ধ করাটা আইনের কাজ হলেও মানুষের মন তা মানবে কি মানবে না, তা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। তখন আমরা দেখেছি আশ্চর্যজনকভাবে আরো বড় আরো ব্যপ্ত হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ; শাসকদের লাঠি, জুলুম বা আইন রবীন্দ্রনাথকে ঠেকাতে পারেনি। বরং আরো বিপুল বেগে ফিরে আসেন তিনি। এমনই বেগ যে আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখন তার সতীর্থ ও বাংলার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে স্বতন্ত্র আবাস ভূমি রচনার স্বপ্ন দেখছিলেন তখন রবীন্দ্রনাথই হয়ে উঠেছিলেন দীপশিখা। বাংলার আকাশে ভরসার রবি করোজ্জ্বল এক মানুষ।

আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান তখন হাতিয়ার। যুদ্ধের ময়দানেও তিনি ছিলেন শক্তি। দেশ মুক্ত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু তার প্রতিশ্রুতি রাখতে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি গানটিকে জাতীয় সংগীত করে নেন। কিন্তু বাকি সব অর্জনের মতো এই গানটিও দেশবিরোধী রাজাকার আর জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর না পছন্দের। তারা বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পর যেসব অর্জন মুছে ফেলতে চেয়েছিল জাতীয় সংগীত তার একটি। কিন্তু তাদের সব অপ প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় আমাদের দেশপ্রেমিক জনগণ। সে সময় আমি দেখেছি তারুণ্য কতটা অগ্রগামী আর স্বদেশপ্রেমী ছিল। আজ এতবছর পর আমরা কি দেখছি? জাতীয় সংগীত নিয়ে বিভ্রান্তি যায়নি। বরং সামাজিক মিডিয়ার এই রমরমা কালে এর বিরুদ্ধে বললেও সমর্থন আর নোংরা মন্তব্যের ঢল বয়ে যায়। এমন সব কথা লিখা হয় যা পড়লে বা দেখলে যে কোনো স্বাভাবিক মানুষের শরীর খারাপ হতে বাধ্য।

কেন এমন হলো? আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে ভারত বিরোধিতাই এর কারণ। ভারত মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন আর সহায়তার জন্য বাঙালির মনে জায়গা নিলেও তা এখন ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে আসছে। এর জন্য সেদেশের রাজনীতি ও নেতারা কম দায়ী না। দায়ী তাদের নীতিও। সীমান্ত সমস্যা পানি বণ্টনসহ আরও অনেক বিষয়ে তাদের একচোখা নীতি বাঙালিকে শান্তিতে রাখেনি। এই রাজনীতি সংস্কৃতিকে গ্রাস করবে বা করতে পারে। কিন্তু কতটা? আজ দেখছি যুবাদের ভেতরই এই বিরোধিতা প্রকট। তারা এই বিরোধিতাকে রবীন্দ্রনাথের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। সেটাই আজ বড় সমস্যা।

এর ওপরে আছে আরও কিছু সমস্যা। বিরোধিতা সামাজিক মিডিয়ার কালে এমন উগ্ররূপ ধারণ করেছে যে কবির ব্যক্তি চরিত্র ও আক্রমণহীন থাকেনি। জীবনের কোনো পর্যায়ে যে অভিযোগ শুনিনি এখন তাও শুনতে হচ্ছে। তারুণ্য বিশ্বাস করে ভাই ঝির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল রহস্যজনক। অথচ কবির সঙ্গে ভাইয়ের মেয়ের সম্পর্ক ছিল অনাবিল ভালোবাসার। স্পর্শকাতর মননশীল বাঙালির মনোজাগতিক ভুবনের রূপকার রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র পড়লেই বোঝা যায় কতটা উদার কতটা খোলামেলা ছিলেন তিনি। এই উদারতা নিয়েও তারুণ্য আজ সন্দেহপ্রবণ। কেন এমন?

কেন আজ তিনি ও তার সৃষ্টি নিয়ে এমন কুয়াশা? এই প্রবণতা কোথায় নিয়ে যাবে আমাদের? সমাজে আজ নানা ধরনের অন্ধকার। বলা উচিত চারদিকে মানুষের হতাশা আর নিরাপত্তাহীনতা দৃশ্যমান। অথচ বাংলাদেশ উন্নতির রথে এগিয়ে যাওয়া দেশ। উন্নয়ন ও নিরাপত্তাহীনতা এমন পাশাপাশি চলাটা অস্বাভাবিক। এতে বোঝা যায় আমাদের সমাজে এখন আসলে কোনো মানদণ্ড বা মূল্যবোধের নিক্তি নাই। রবীন্দ্রনাথের মতো মানুষ যেখানে আশার বাতিঘর হবেন সেখানে তাকে এভাবে অপমান করার কারণ বোঝা মুশকিল। তবে কি আমরা ধরে নেব এই প্রজন্মের মগজ ধোলাই করে দিয়েছে অপইতিহাস। অথবা যে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র দেশ শাসনে সুবিধা করতে পারেনি তারা কি আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিতে চাইছে? অগোচরে কি সেই বিষ এখন জাতির তারুণ্যকে শেষ করে দিচ্ছে?

রবীন্দ্রনাথের মতো সুফি সাধক যিনি তার শান্তি নিকেতনে সর্বধর্মের ধর্মগুরুদের জন্য আলাদা আলাদা গান ঠিক করে রেখেছিলেন, যিনি ফাতেহা ইয়াজদমে বাণী দিতে গিয়ে লিখেছিলেন ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম। বলেছিলেন এই ধর্মের মানুষদের সঙ্গে নেবে না এগুলো ভারতের উন্নতি বা শান্তি নিশ্চিত হবে না, তাকে নিয়ে এ কোন ষড়যন্ত্র? এ কোন ধরনের খেলা?

আমাদের জীবন ও জীবনবোধকে জাগিয়ে রাখার মানুষ কজন আছেন? রবীন্দ্রনাথের গান বাঙালির জীবন সুধা। সকাল থেকে রাত অবধি তিনি গানে গানে আমাদের মনে থাকেন। শুধু দেশে না প্রবাসেও আমাদের জীবনকে মধুময় করে রেখেছেন তিনি। তার কবিতা সংবাদপত্রের শিরোনাম এখনো। এখনো তিনিই আমাদের সাহস ও শৌর্যের প্রতীক। বিশেষত বাঙালির জীবনে যখন নানা ধরনের অনাচার অশান্তি দেখা দেয় যখন সমাজ অধঃপতনের পথ ধরে আমরা তার কবিতায় নিজেদের বাঁচার তাগিদ খুঁজে পাই। তার প্রবন্ধের গভীরতা একটি বাক্যেই বোঝানো সম্ভব। যেখানে তিনি লিখেছিলেন ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’। সে বিশ্বাস কি আবারো ফিরে আসবে জীবনে?
কে আমাদের বলবে:

চিত্ত যেথা ভয় শূন্য উচ্চ যেথা শির
জ্ঞান যেথা মুক্ত যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণ তলে দিবস শর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি...

এমন কবিতার কবিকে অকারণে তুচ্ছ সম্প্রদায়গত কারণে আমরা যদি দূরে ঠেলি আবারো পাকি ভূতের আছড় পড়বে বাঙালির জীবনে। এটা নিশ্চিত তারাই তাকে দূরে সরাব দূরে ঠেলে যারা বাঙালির পুনর্জাগরণকে ভয় পায়। রবীন্দ্রনাথ সেই দূত যিনি নতুন যৌবনের, যিনি বাঙালির ভালোবাসার মুক্তির দূত। বাইশে শ্রাবণে তার প্রতি আমাদের বেদনা ও শোকের ভাষা হোক উদারতার। যাতে আমরা তাকে আবারো অন্তরে ধারণ করতে পারি। তার সোনার বাংলা তোমায় ভালোবাসি আমাদের জীবনে সে ভালোবাসা ফিরে আসুক যা রবীন্দ্রনাথ ও বাঙালিকে একসূত্রে গেঁথে রাখবে। আমরা বলতে পারব বিশ্বসঙ্গে যোগে যেথায় বিহারো সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও। - লেখক : সিডনি প্রবাসী

মানবকণ্ঠ/এএম

 




Loading...
ads




Loading...