কিডনি রোগ: চিকিৎসার সীমানায় সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৩ জুন ২০১৯, ১৩:৫৮

মানুষের জীবনরহস্য কেন্দ্রভ‚ত রক্তকণিকার গভীরে। শিরা-উপশিরায় বহমান রক্তে যখন অপ্রয়োজনীয় উপাদান মিশ্রিত হয় তখন প্রতিনিয়ত রক্তকে শোধন করে কিডনি।

সৃষ্টির অপার রহস্য মেশানো কার্যক্ষমতায় কিডনি আন্তঃজাল দিয়ে অবিরতভাবে শোধন করে রক্ত। মনে হতে পারে, মানবদেহ সৃষ্টির বিস্ময়কর রহস্যের সূচনা এই কার্যক্রমেই নিহিত।

মানুষের দেহের বহুমুখী কার্যপরিধিতে লিভার, ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড, কিডনি পৃথক পৃথক সত্তায় ক্রিয়াশীল। লিভার, ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হলে অনেক সময় ক্ষয়ে যাওয়া অংশ আপন বৈশিষ্ট্যে পূরণ হয়। কিন্তু কিডনির ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটে না। কোনোভাবে এই দেহাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রথম ধাপে ওষুধের মাধ্যমে নিরাময়ের চেষ্টা করা হয়।

এতে না হলে রোগীকে রক্ত পরিশোধনের জন্য মোটা অঙ্কের খরচে ডায়ালাইসিস করাতে হয়। তাও না হলে নিতে হয় কিডনি পরিবর্তনের ব্যয়বহুল ঝুঁকি। তখনই ওঠে রোগীর আর্থিক সামর্থ্যরে প্রশ্ন। আর যদি রোগী হয় সামর্থ্যহীন, তাহলে সে ভাসতে থাকে অনিশ্চিত জীবনের সীমাহীন আঁধারে। বিশ্বজুড়ে কিডনি রোগ এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। কিডনি সুরক্ষায় ও রোগ সচেতনতার জন্য প্রতি বছর পালন করা হয় বিশ্ব কিডনি দিবস।

১৯ মে মানবকণ্ঠে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে, প্রায় ২ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে এ রোগে ভুগছে। প্রতি বছর আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ হাজার রোগীর কিডনি পুরোপুরি অকেজো হচ্ছে। প্রকাশিত সংবাদটি খুবই উদ্বেজনক। পরিসংখ্যানে যেভাবে বলা হচ্ছে, তাতে কে যে কখন আক্রান্ত হয়ে যাবে বলা মুশকিল। আর একবার এ রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্তিম পর্যায়ে গেলে রোগীকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করা হয় ডায়ালাইসিস করে, নয়তো কিডনি প্রতিস্থাপন করে। আর এ রোগের চিকিৎসায় দেশে রয়েছে ব্যাপক সীমাবদ্ধতা।

চিকিৎসার সীমাবদ্ধতার চিত্র আরো স্পষ্ট হয়েছে কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রধানের গণমাধ্যমকে দেয়া এক তথ্যে। তার মতে, বছরে যে ৪০ হাজার রোগীর কিডনি বিকল হচ্ছে, তাদের সবার চিকিৎসা দিতে চাইলে মানসম্মত হাসপাতালের পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যাপ্তিটা বাড়ানো দরকার। এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে নতুন ৪০ হাজার রোগীকে ডায়ালাইসিস সেবা দেয়া এবং কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। আমাদের যে সুযোগ-সুবিধা আছে, তাতে আমরা ৪০ হাজার রোগীর মাত্র ২০ ভাগকে ডায়ালাইসিস বা প্রতিস্থাপন সুবিধা দিতে পারি। বাকি ৮০ ভাগ রোগীই চিকিৎসার অভাবে মারা যায়।

সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সংশ্লিষ্ট বিষেশজ্ঞগণ তাদের মত দেন। সেখানে তারা বলেন, বিশ্বের প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের কিডনি রোগে ভুগছে। প্রতি বছর ২৪ লাখ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ আকস্মিক কিডনি রোগে আক্রান্ত হয় প্রতি বছর। এদের মধ্য থেকে প্রায় ১৭ লাখ রোগী অকালে মারা যায়।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বিষয় বর্ণনায় কিডনি রোগের যে ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে, তাতে বাঁচতে হলে রোগীদের বেছে নিতে হয় ডায়ালাইসিসের পথ। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ডায়ালাইসিসে খরচ কেমন? সরকারি হাসপাতালগুলোতে একবার ডায়ালাইসিস করাতে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে খরচ হয় সাড়ে তিন হাজার থেকে আট হাজার। কিডনি অকেজো হওয়া একজন রোগীকে সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার ডায়ালাইসিস করাতে হয়।

শেষ পর্যায়ে ৯০ ভাগ রোগীই এক থেকে দুইবার ডায়ালাইসিস করার পর আর এটা করাতে পারে না। অবশেষে মারা যায়। ১০ ভাগের কম রোগী এটার ব্যয়ভার বহন করতে পারে। এই হচ্ছে ডায়ালাইসিস সেবার চিত্র।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই রোগ আশঙ্কাজনক মাত্রায় বাড়ছে কেন? এই রোগের অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে, প্রস্রাবের প্রদাহ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ব্যাপক মাত্রায় ব্যথানাশকের ব্যবহার এবং খাদ্যাভ্যাস। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বংশগত কারণে এই রোগ হতে পারে। তাছাড়া ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, অলস জীবনযাপন ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের কারণে এ রোগ হতে পারে আবার ডায়রিয়া, বমি, রক্তক্ষরণ, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, হেপাটাইটিস, কোলস্টেরল, ভেজাল খাদ্য থেকে আকস্মিক কিডনি বিকল হতে পারে।

তাই একটু সচেতন হলে সুস্থ জীবনধারার মাধ্যমে কিডনি বিকল হওয়া কমতে পারে। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানি, জীবাণুমুক্ত খাবার, হাত ধোয়ার অভ্যাস, প্রয়োজনে খাবার স্যালাইন খাওয়া, সময়মতো টিকা নেয়া আকস্মিক কিডনি বিকল ঠেকাতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, যেসব রোগের কারণে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাঝে মাঝে কিডনি পরীক্ষা করানো দরকার।

এবার আসা যাক কিডনি প্রতিস্থাপন প্রসঙ্গে। দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনে সাধারণত ব্যয় হয় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। তবে কিডনি পাওয়াটা একটা বড় বিষয়। এই কিডনি পাওয়া নিয়ে দেশে তৈরি হয়েছে আরেক জটিল অধ্যায়। ২০ মে মানবজমিনে প্রকাশিত এক সংবাদে কিডনি বেচাকেনার ভয়ঙ্কর চক্রের কথা বলা হয়েছে। সারাদেশে ১০ থেকে ১৫টি গ্রুপ সক্রিয়। তারা কম দামে কিডনি কিনে বেশি দামে বিক্রি করে। নওগাঁ, পাবনা, জয়পুরহাট, দিনাজপুর জেলার দিনমজুর, শ্রমিক, ভানচালক, রিকশা চালক, কৃষক-এমন লোকদের প্রলোভন দিয়ে দেশে কিংবা ভারতে নিয়ে গিয়ে কিডনি বেচাকেনা করায় এই চক্র। আসলে সমাজে কিডনি বিকলতা বেড়ে যাওয়ার কারণে এই দুর্বৃত্ত শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে।

গত ১৪ মার্চ পালিত হলো ১৪তম বিশ্ব কিডনি দিবস। ওই দিনে কিডনি রোগের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে দুটি প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্য ভ‚মিকা উল্লেখ করার মতো। একটি প্রতিষ্ঠান মাসব্যাপী আরেকটি প্রতিষ্ঠান সপ্তাহব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির অংশ হিসেবে কর্মসূচি পালন করে।

এই দিবস উপলক্ষে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল ইনসাফ বারাকাহ কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল। ১৪ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল ২০১৯ পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলে। এক মাস প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হয়। ক্যাম্পে রেজিস্ট্রেশনভুক্ত রোগীদের কিডনি সম্পর্কিত সিরাম ক্রিটিনিন, ইউরিন আর/ই, পরীক্ষা ফ্রি করা হয়। কিডনি রোগ সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লিফলেট বিতরণ, ফেস্টুন, ব্যানার প্রদর্শন ও পোস্টার লাগানো হয়।

আন্তর্জাতিক কিডনি দিবস-২০১৯ উপলক্ষে বিআরবি হসপিটালের নিজস্ব কম্পাউন্ডে সপ্তাহব্যাপী কিডনি রোগ পরীক্ষা নামমাত্র মূল্যে করা হয়। একই সঙ্গে কিডনি দীর্ঘদিন সুস্থ রাখার বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়। কিডনির সুস্থ রাখার বিষয়ে বিশদ আলোচনা এবং সচেতনতার গুরুত্ব দেশবাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।

এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মতো হয়তো এমন আরো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান কিডনি দিবসে এ রকম মুক্ত আয়োজন করে থাকতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কিডনি রোগের সচেতনা সৃষ্টির লক্ষ্যে এই ধরনের আয়োজন করতে পারে, তাহলে সরকারি প্রতিষ্ঠনগুলো কেন বড় পরিসরে আয়োজন করতে পারবে না? কেন শোভাযাত্রার মতো সীমিত আয়োজনে কর্মসূচি সীমাবদ্ধ রাখবে? আসলে বলতে হয় পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের অভাব। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে হোক আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে হোক, কিডনি রোগের সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হলে হয়তো অনেকে বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে বেঁচে যেতে পারে।
এক মাস ফ্রি ব্যয়বহুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো বেসরকারি হাসপাতালের জন্য সহজ কোনো কাজ নয়। ত্যাগের এই উদ্যোগ মানুষের সেবায় এগিয়ে আসা জাতীয় পর্যায়ে একটা উদাহরণ হতে পারে। দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর কিডনি ইউনিটের দায়িত্বশীলদের উচিত, কিডনি রোগের চিকিৎসার এই সঙ্কট মুহূর্তে বারাকা কিডনি হাসপাতালের মতো উদাহরণ সৃষ্টি করা। শুধু মুনাফা অর্জন নয়, জনসেবায় আর্থিকভাবে ত্যাগ স্বীকার করে ফ্রিতেও যে কিডনি রোগের পরীক্ষ-নিরীক্ষা করা যায়, বারাকা কিডনি হাসপাতাল তার উদাহরণ হয়ে রইলো।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, কিডনি রোগের যে নাজুক অবস্থা এখন চলছে তাতে কোনোভাবেই বাংলাদেশে আগামী ২০ বছরে সব কিডনি রোগীকে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে না। তবে গ্রামপর্যায়ে যে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো গড়ে তোলা হয়েছে, এসব অবকাঠমোকে সক্রিয় করা হলে এখান থেকে কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস এবং উচ্চরক্তচাপ-এসব রোগ প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
সরকারি ও বেসরকারিভাবে এ রোগের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সরকারের একার পক্ষে পর্যবেক্ষণে যেটা সম্ভব নয়, অনেক সময় বেসরকারি খাত সেটা সম্ভব করে তুলে, এমন সাফল্যমণ্ডিত বেসরকারি খাতের অনেক উদাহরণ দেশে আছে।

কিডনি রোগের চিকিৎসা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ডায়ালাইসিসের মেশিনসহ যাবতীয় চিকিৎসা-সরঞ্জামাদি শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ দেয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। সেই সঙ্গে চিকিৎসা-সরঞ্জামাদির ওপর ভর্তুকি দেয়া হলে এ রোগের চিকিৎসা নিয়ে যে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, তা কিছুটা হলেও দূর হতে পারে। সেই সঙ্গে তৈরি হতে পারে নতুন আরো কিছু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা।

সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিকসহ সব হাসপাতালে যদি কিডনি রোগের পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হয় তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অঙ্কুরেই রোগ শনাক্ত করে কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা যেতে পারে। যে লক্ষণগুলো কিডনি রোগের জন্য বেশি দায়ী, সেগুলোর চিকিৎসার সুযোগ ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার থাকা দরকার। গরিবদের জন্য এসব রোগের ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করার কথা ভাবা যেতে পারে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি সারাদেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে কিডনির চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত ইউনিট প্রতিষ্ঠা করে এবং চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে আনার ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তাহলে সীমাবদ্ধতার প্রাচীরে ঘেরা মৃত্যু সীমানায় দাঁড়ানো কিডনি রোগীরা পেতে পারে চিকিৎসার এক নতুন দিগন্ত।
- লেখক: সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...