নষ্ট রাজনীতি ও দেশ সমাজের মুক্তি



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৩ জুন ২০১৯, ১৩:৫৫

রাজনীতি এখন কতটা পচে গেছে তার সর্বশেষ উদাহরণ বিএনপি মনোনীত নারী সাংসদ রুমিন ফারহানা। ভদ্রমহিলা সাংসদ হিসেবে শপথ নেয়ার পরপরই মন্তব্য করেছেন এটি একটি অবৈধ সংসদ। একজন শিশুও একথা শুনে হাসবে। যদি তাই হয় তো আপনি অবৈধ হওয়ার জন্য শপথ নিলেন কেন? বৈধ আর অবৈধ নিয়ে এমন মজার খেলা আর কোনো দেশে ঘটে কিনা জানি না।

তবে এর নাম যদি গণতন্ত্র হয় তাহলে বলতে হবে আমাদের গণতন্ত্রের আসলেই কোনো ভবিষ্যৎ নাই। একদিকে ভোট নিয়ে মশকরা, রাতে ভোটের বাক্সভর্তি করে রাখা, জোর করে জিতিয়ে আনা এসব অপবাদ, আরেকদিকে খালি আত্মদম্ভ। বিরোধী দল এখন আসলে হাসির পাত্র। বিএনপিকে আমরা যতভাবে যেভাবে বড় করি না কেন মূলত দল ও শক্তি যে ফাঁপা সেটাই বারবার প্রমাণ করে দিচ্ছে তারা। নির্বাচনের পর থেকে ভোট হয়নি, ভোট ডাকাতি হয়েছে বা এমন নির্বাচন ইহজনমে কেউ দেখেনি এসব কথা মানুষের মনে ঢোকানার চেষ্টা করা দলটি কী করল? যাবো না যাবো না করেও তাদের পুরুষ সাংসদদের প্রায় সবাই মাথা হেঁট করে ঢুকে গেছেন সংসদে।

সেখানেও নাটক। ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামের নেতা ড. কামাল হোসেন বলেন এক কথা, তার নেতারা বলেন আরেক। দুই সাংসদ জিতে আসা এই দলের কেউই শপথ না নিয়ে থাকেনি অথচ তারা গোড়াতে এমন ভাব দেখালেন এমন সব কথা বললেন যাতে মনে হতে পারে জান গেলেও তারা সংসদে যাবেন না। এরপর মানুষের মুখে ব্যঙ্গের হাসি ফুটিয়ে সুলতান মনসুর ফিরলেন, পরে বাকি মুকতাদিরও গেলেন সুড়সুড় করে। এসব ফাজলামোর কী মানে? মানুষ কি বোকা যে এগুলো তারা বোঝে না? এর মধ্যে কপাল খারাপ খালি মির্জা সাহেবের। ফখরুল ইসলাম মনে মনে একশ’ একবার চাইলেও সংসদে যেতে পারলেন না।

শুনলাম তাদের বিলেত প্রবাসী নেতা যুবরাজ তারেক নাকি বাদ সেধেছেন। কেন? এটা নাকি প্রতিবাদ? কেমন প্রতিবাদ? বাকিরা সবাই গেলেন শুধু ফখরুল সাহেব হলেন অভিনব হাস্যকর প্রতিবাদের শিকার। বেচারা তার আসনটি খোয়ানোর পর নিয়মমাফিক সে আসনে উপনির্বাচন ঘোষিত হয়েছে। আরেক কৌতুক দেখুন এবার। যে আসনের বিজয়ী নেতা ভোট কারচুপি আর অবৈধ নির্বাচনের কারণে সংসদে গেলেন না সে আসনে বিএনপি প্রার্থী দিতে ভুল করেনি। এ যেন বছরের সেরা উপহাস। একবার ভোট দিয়ে মানুষ বিএনপিকে জেতাল এখন তারা জানল সে সাংসদ সংসদে যাবেন না। এত বড় নেতা নিজে গেলেন না এখন এক অবলা নারীকে বলছেন আবার অবৈধ সাংসদ হতে। এসব কৌতুক আর কত দিন চলবে কে জানে?

এদিকে আরেক কাণ্ড দেখুন। রুমিনা নামের এক মহিলা যিনি সবসময় সরব তিনি কী করলেন। মনোনীত সাংসদ হয়েই শপথ নিয়ে বললেন এ সংসদ অবৈধ। তাহলে তো সোজাসাপ্টা প্রশ্ন আপনি অবৈধ সন্তান হতে এত আগ্রহী কেন? মুখে খই ফোটা রমণী আপসে পোষ মানলেন কী কারণে? এ সবাই জানে। সবাই বোঝে। যেখানে ফেলো কড়ি, মাখো তেল সেখানে সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে কে থাকে? লুটপাট করার অভিযোগ খালি একতরফা হবে এটা কি কোনো কাজের কথা? তারচেয়ে ছেড়ে দে মা লুটপাট করে খাই। বিএনপিও এখন ধীরে ধীরে খোলসের ভেতর ঢুকছে। হম্বিতম্বি শেষ। শুরু হয়ে গেছে আপসের খেলা। তাদের নেত্রী খালেদা জিয়া কারাগারে না হাসপাতালে সে খবরও এখন আর রাখে না কেউ। এমন এক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে যেখানে তিনি আছেন কিনা সেটাও আসলে বিষয় না। এই যে রাজনীতি বা রাজনীতির নামে খেলাধুলা মানুষ কেন এসব বরদাশ্ত করবে?

সে কারণেই হয়তো আজকাল কেউ আর প্রতিবাদ করে না। প্রতিবাদে কি আসলে কোনো লাভ আছে? কে শোনে কার কথা? তারচেয়ে সবাই মিলে কোনোরকমে সার্ভাইভ করাটাই কাজের কাজ। ফলে যা যা জায়েজ হওয়ার হয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি প্রভাবশালী হন তো সাত খুন মাফ। আপনি ইয়াবা বেচেন আর ধর্ষণ করেন থাকবেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই যে দেখুন এত বড় ঘটনা মেয়েটি বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয়ার পরও কিছু হয়েছে? উল্টো সোনাগাজীর ওসি এখন পলাতক। এমন পলায়ন যে কীভাবে হয় আর কারা পালিয়ে যেতে দেয় সে খবর সবার জানা। সবাই এও জানেন ওসি সাহেব সালাউদ্দিন কিংবা ইলিয়াস আলীর মতো কোথায় আছে কেউ জানবে না। আর জানার পরও আসবে না। তার মতলব বা ইশারা এখনই দেখা যাচ্ছে।

দেশের বাইরে থাকি আমরা। কিন্তু খুব টের পাই কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে। দেশের মানুষ মূলত অসহায়। তারা বুঝে গেছে কথা বলে লাভ নাই। আমি এ কথা বলছি না আওয়ামী লীগ মানুষকে খুব খারাপ রেখেছে বরং মানুষ আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে। আর আছে বলেই গা করে না। তারা জেনেছে উন্নয়ন মানে দৃশ্যমান উড়ালপুল, সেতু, অবকাঠামো। কাঠামো এসব নিয়েই থাকতে হবে। সামাজিক যে শান্তি বা নিরাপত্তা তা উন্নয়নের ধারায় পড়ে কিনা সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নয়। সে কারণে তাদের মুখ বন্ধ। আর ওই যে বলছিলাম সাহস শক্তি কিংবা ভাষা জোগানোর রাজনীতি এখন মৃতপ্রায়।

খেয়াল করবেন সমাজের পচন কতটা গভীর। আচরণধর্মী বিশ্বাস আর সংস্কার মানুষকে অন্ধ করে ছেড়েছে। খাবার, পোশাক, কথা-কিছুতে শান্তি নাই। মতবাদের এত চাপ আগে কখনো দেখেনি বাংলাদেশ। পাপ-পুণ্যের এত আধিক্য, এত বিশ্লেষণ শোনেনি কেউ। স্বাভাবিক সহজ বাঙালি জীবন আজ প্রায় উধাও। মানুষকে পথ দেখানোর রাজনীতি নিজেই কনফিউজড। তাই নেতাদের পোশাকও বদলে যায় সময়মতো। আমরা আসলে কি চাই, কেন চাই সেটাই এখন ভাবার বিষয়। একাত্তরের দোহাই দিয়ে আর কতদিন চলবে জানি না কারণ চেতনাও মূলত শেষের পথে।

এই দেশ, এই সমাজ একাত্তরে কারো চাওয়া ছিল না অথচ সেটাই আজ বাস্তবতা। কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি সমাজ মূলত পঙ্গু হওয়ার পথে। কেউ তার ধার ধারে না। কাজেই পচে যাওয়া রাজনীতি কী করে আমাদের বাঁচাবে? আদর্শ, নীতি, ভালোবাসার জায়গাগুলো শেষ। মমতাবিহীন মানুষের বাংলাদেশ আমাদের দেশ এটা ভাবতেই বুক কেঁপে ওঠে।

আওয়ামী লীগ বিএনপি বা যে কোনো দল এখন আদর্শের চাইতে শক্তি আর জোরের ওপর চলছে। কারো শক্তি কারো অপশক্তি এসব মিলে কঠিন এক বৈরী আবহ ঘিরে ধরছে ক্রমশ। হাজার উন্নয়নেও কি কোনোদিন আমরা ফিরতে পারব মুক্তিযুদ্ধের দেশে? যে দেশ আমাদের রাজনৈতিক দল বা মতভেদের বাইরে এমন এক সমাজ উপহার দেবে যাতে বাঙালির বাইরে আর কোনো পরিচয় থাকবে না। কেবল সেদিনই এসব পচা রাজনীতি পালিয়ে যেতে বাধ্য হবে। তার আগে মুক্তি সুদূর পরাহত।- লেখক: সিডনি প্রবাসী

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...