নবান্নে কৃষকের মুখে মলিন হাসি



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১২ জুন ২০১৯, ১২:৫৯

সারাদেশে কৃষকের ঘরে ধান উঠেছে। ধান ওঠা মানে কৃষকের ঘরে ঈদের আনন্দ। নবান্নের আমেজ। তার ওপর ধানের এবার বাম্পার ফলন। ফলন দেখে খুশিতে ডগমগ কৃষক। কিন্তু সে আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বাজারদর দেখে কৃষকের মাথায় হাত। ধান কেটে ঝাড়াই-মাড়াই করার সামর্থ্য তার নেই। এক মণ ধান উৎপাদন করতে কৃষকের খরচ হয়েছে ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা। আর তা বিক্রি করতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকায়। সরকার অবশ্য ধানের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ১ হাজার ৪০ টাকা মণ। কিন্তু কৃষক সে দাম পাচ্ছেন না। এক চরম দুর্দশার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন তিনি। কৃষকের এ দুর্দশা নিয়ে দেখছি হাস্যরসাত্মক সব ঘটনা।

কাউকে দেখা যাচ্ছে ধানক্ষেতে পুলিশের পোশাকে ধান কাটতে। কেউ আবার বিজ্ঞাপনের মডেলের মতো দলীয় সিল-ছাপ্পর লাগিয়ে সাদালুঙ্গি-গেঞ্জি-গামছায় সজ্জিত হয়ে একগোছা ধান হাতে ফেসবুকে হাস্যোজ্জ্বল বদনে। দেখছি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তা স্ব স্ব কাজ ফেলে ধানক্ষেতে। এমনকি ইউএনও, ডিসি সাহেবদেরও দেখা যাচ্ছে ধান কাটতে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করি, ক’গোছা ধান কেটেছেন আপনারা? ০.০০১% ধানও কি আপনারা কাটতে পেরেছেন? তাহলে কেন এই পরিহাস? কৃষক কি কেবল পরিহাসের পাত্র? সারাবছর হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময়ে দেশের মানুষের মুখে ভাত জোগানো কি তার অপরাধ? একবার ভেবে দেখুন, এসবের মধ্য দিয়ে অন্নদাতা কৃষকের মুখে চপেটাঘাত করেননি না তো? কৃষকের প্রয়োজন ন্যায্যমূল্য, লাভজনক মূল্য। যেখান থেকে কৃষিশ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করতে তার কোনো অসুবিধা হবে না। কোনো ধরনের করুণা তাদের দরকার নেই।

যে কৃষক তার শতভাগ উজাড় করে দিয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় সাফল্য এনেছেন, তার নিরাপত্তায় আমরা কী ব্যবস্থা গ্রহণ কমরছি? বিগতকয়েক বছর ধরেই তো কৃষক ধান উত্পাদনে সাফল্য দেখাচ্ছেন। তাহলে তাদের নিরাপত্তায় আমরা কেন সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছি না বরং বারবারই তার স্বার্থ পরিপন্থী কাজ করে চলেছি। আমরা আমাদের আমদানিনীতি সহজীকরণ করেছি। যার দাপটে মজুদদার, আড়তদার যখন খুশি বিদেশ থেকে চাল আমদানি করছেন। গত বছর প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধান উত্পাদন হওয়ার পরও ৪০ লাখ টন ধান আমদানি করা হয়েছে। যা বিক্রি হয়নি। তাহলে বাজারে আড়তদারের কাছে চাল আছে, কৃষকের ঘরে আমন ধানের মজুদ আছে, বোরো ধান কাটা হচ্ছে। এই বোরো ধান কাটার সময় হওয়ার পরও ২ লাখ টন চাল আমদানি করা হলো। কেন?

এ ব্যাপারে দায়িত্ব নিতে কেউ রাজি নয়। সরকার চাহিদা ও উপযোগিতা ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের কাজ করছে না। কৃষি মন্ত্রণালয়ে কী ঘটছে সে বিষয়ে কোনো খবরাখবর না রেখে বা তার সঙ্গে যোগাযোগ না করেই চাল আমদানি করে ফেলছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। বিষয়টা দাঁড়িয়েছে এমন, কৃষি মন্ত্রণালয় উৎপাদন করেই তার দায়িত্ব শেষ, খাদ্য মন্ত্রণালয় সংগ্রহ এবং শিল্প মন্ত্রণালয় শিল্প করবে বলেই যে যার দায়িত্ব শেষ করে দিচ্ছে। কোথাও কোনো সমন্বয় নেই। যে কারণে আমদানি-রফতানি হচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। এরপর যদি ধান ক্রয়ের কথা বলি, তাহলে-সরকার কৃষকের নিকট থেকে কতটুকু ধান ক্রয় করে? মোট উৎপাদিত ধানের পাঁচ শতাংশ।

যেখানে পাশের দেশ ভারত কৃষকের উৎপাদিত ধানের ২০ শতাংশেরও বেশি ধান সরকারিভাবে ক্রয় করে নেয়। তাহলে এই ৫ শতাংশ ধান ক্রয়ধানের বাজারে কি প্রভাব বিস্তার করতে পারে তা নিশ্চয় অংক কষে বের করার প্রয়োজন হবে না। এখানেই শেষ নয়। কৃষকের ধান ওঠা শুরু হয়েছে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে। আর সরকারি পাথর নড়াচড়া শুরু করল মে মাসে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ধান বিক্রি শেষ। তাহলে সরকার যে ধান ক্রয় করে তা কার স্বার্থে?

সত্যি বলতে কি, সরকারের সংবেদনশীলতার কোনো প্রমাণ আমরা এখনো পাইনি। কারণ খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে আরো বেশি ধান কিনে রাখার মতো পর্যাপ্ত গুদাম নেই। কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে মিল মালিকদের কাছ থেকেও গুদাম ভাড়া নেয়া যেত। এমনকি কৃষকের ঘরেও ধানমজুদ রাখতে পারে। তাকে সুদবিহীন ঋণ দিতে পারে। যখন ধানের দাম বাড়বে তখন সে বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করবে বা সে সময়ের বাজার দর অনুযায়ী মূল্য পরিশোধ করে সরকার কৃষকের ঘর থেকে ধান নিয়ে আসবে। কিন্তু কোনো উদ্যোগ সেখানে নেই।

খুব তো গর্ব করে বলছি আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছি, উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে কাজ করছি। যদি বলি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার ভিত্তিটা কী? একটা পরগাছা অর্থনীতি? কেন আমরা শিকড়ের যে অর্থনীতি, সেটাকে সম্বল করতে পারছি না। এখনো কৃষিতে ৪২ শতাংশ শ্রমশক্তি নিয়োজিত এবং এই শ্রমশক্তি উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন করতে পারছে। সে উদ্বৃত্ত নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই কেন? আমরা তো ইতোমধ্যেই সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শেষ করে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার দোরগোড়ায়। প্রতিবছর বাজেটের আকার বাড়ছে তো বাড়ছেই। তারপরও কেন আমের মৌসুমে আম রাস্তায় পড়ে থাকে, টমেটোর সময় টমেটো, আলুর সময় আলু? কৃষক কেন রাস্তায় দুধ ঢেলে দিতে বাধ্য হয়।
আমরা তো থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম থেকে ফেরার পথে আমের চিপস্, কাঁঠালের চিপস্ ব্যাগে ভরে এনে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনের হাতে তুলে দিয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে পড়ি। তাহলে আমার আম কেন রাস্তায় পড়ে থাকে, কাঁঠাল কেন দাম পায় না, কেন আমাদের উদ্বৃত্ত ফসল নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারছি না? আমরা কেন কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার দিকে মনোযোগী হতে পারছি না। যেটা আমাদের শিকড়ের অর্থনীতি, সেটাকে কেন বারবার পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি? আমরা কৃষকের হাতে একটা কৃষিকার্ড ধরিয়ে দিয়ে তাকে কৃষকের সার্টিফিকেট দিয়ে নিজেদের ধন্য মনে করছি। সে কার্ডের মধ্য দিয়ে তাকে স্বপ্ন দেখাচ্ছি। তারপর তাকে দশ টাকা দিয়ে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ করে দিয়েছি। বলছি সব সুযোগ-সুবিধা এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রদান করা হবে। যদি প্রশ্ন করি, ক’টাকা জমা পড়েছে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে? উত্তর মিলবে না। কার্ড পড়ে আছে কৃষকের বাক্সে।

আমাদের পাটের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। এক সময় কী রমরমা অবস্থা! পাট বাংলাদেশের সব মানুষের কাছে সোনালি আঁশ হিসেবে খ্যাত ছিল। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ, সরকারের অদূরদর্শিতা এবং মন্ত্রী-আমলাদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের মনোবৃত্তির ফলে বাংলাদেশে পাটের পোস্টমর্টেম ঘটেছে। বাজার চলে গেছে ভারতে। ধান নিয়েও আজ একই রকম ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, অদূর ভবিষ্যতে ভাতের জন্যেও হাহাকার পড়বে। ইতোমধ্যে স্লোগান উঠেছে- ‘করবো না আর ধান চাষ, দেখি তোরা কী খাস?’ টাঙ্গাইলের এক কৃষককে ক্ষেতে আগুন লাগাতে দেখেছি। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, তরুণরা এখন আর কৃষিকাজে আগ্রহী হচ্ছে না। কৃষি খাতে কর্মরত কৃষকের বয়স বেড়ে গেছে।

তাহলে কৃষির ভবিষ্যৎ কী, তা কি একবার ভেবে দেখেছি? কারো কারো মনে হতেই পারে, দেশ যেহেতু অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সমস্যা কোথায়? ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হবে না। বিদেশ থেকে আমদানি করব। তাদের শুধু একবার পেছন ফিরে তাকাতে বলব। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের আগে খাদ্য আমদানি করার জন্য সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেও শেষ পর্যন্ত পিএল ৪৮০র অধীনে সে খাবার পায়নি। আবার ২০০৮ সালে যখন খাদ্য সঙ্কট দেখা দিল তখনো সরকার টাকার থলি নিয়ে প্রতিবেশীর দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, খাবার মেলেনি। তাই এখনো সময় আছে নতুন করে ভাববার।

২০১৩ সালে প্রণীত কৃষি নীতিমালায় ভ্যালুচেইন ডেভেলপমেন্ট এবং এগ্রো প্রসেসিংয়ের বিষয়টিকে সংযুক্ত করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে এসে বলা হলো এগ্রো-ভ্যালুচেইন কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। এটা শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিষয়।

বিষয়টা যারই হোক, পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। মাননীয় অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশ করবেন। বাজেট শুধু টাকা-পয়সার খতিয়ান নয়। এর মধ্য দিয়ে একটা রাজনৈতিক দর্শনেরও প্রতিফলন ঘটে। সরকার নিজেকে কৃষকবান্ধব সরকার হিসেবে দাবি করে থাকে এবং বাংলাদেশ যে বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তা গর্বসহকারে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করছেন। এ সরকারকেই বলতে চাই, সত্যিই যদি আপনি কৃষকবান্ধব হয়ে থাকেন তাহলে আজকে যে ধানের পোস্টমর্টেম হতে যাচ্ছে তার আগেই কিছু একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। মূল্য সহায়তা, কৃষি প্রণোদনার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখুন। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয় কীভাবে হবে, তার জন্য একটি নীতিগত ভিত্তি স্থাপন করুন। ফসল ফলানোর মৌসুমের পাশাপাশি শস্য কাটার সময়ের জন্য কৃষকের জন্য জামানতবিহীন ও সুদবিহীন শস্যভিত্তিক ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা রাখুন। সবশেষে বলতে চাই শিল্পায়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে মনোযোগী হোন। কৃষকের হাতে লাভ তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করুন। তাহলে হয়তো আগামী দিনের কৃষি কিছুটা হলেও প্রাণ ফিরে পাবে।
- লেখক: সংস্কৃতিকর্মী ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এসএস




Loading...
ads




Loading...