টাকার আর্তনাদ



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১২ জুন ২০১৯, ১৩:০১

আমি টাকা। আমার জন্মের ইতিহাস পুরনো। আগে আমার জন্ম হতো উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন প্রেসে। সেখান থেকে আমাকে দেশে আনা হতো। এখন আমার জন্ম দেশেই হচ্ছে। গাজীপুরে বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনে। এ জন্য আমি গর্বিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের স্বাক্ষরসহ একটি নির্দিষ্ট দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে বাজারে ছাড়া (অবমুক্ত করা) হয়। ছাড়া মাত্রই আমি ছড়িয়ে পড়ি আমজনতার মাঝে। পার্থিব জগতে মানুষের সবচেয়ে প্রিয় আমি। সবাই আমার সঙ্গ চায়। আমাকে একান্তে নিজের মতো করে পেতে চায়। আমি প্রতিটি মানুষের কাছে মহামূল্যবান। টাকা তুমি কার? যখন যার হাতে থাকি তখন তার। আমি প্রতিদিন প্রতিরাতে বদলাই হাতে হাতে। নিমিষেই চলে যাই টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। আমি স্থির থাকতে পারি না। চলমানতাই আমার জীবন। এক হাত থেকে আরেক হাতে যাওয়া আমার ধর্ম। আমি ধনী-গরিব, সাদা-কালো জাতভেদ বর্ণবৈষম্য বুঝি না। তবে ধনীদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয় বেশি। সেখানে হূদ্যতা থাকে কি না সে প্রশ্ন অবান্তর। বাংলাদেশের প্রায় সব টাকা তো ধনীদের হাতেই। আমার ক্ষমতা থাকলে আমি সেই সব অসত্ ব্যক্তির সঙ্গ এড়িয়ে চলতাম। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যদি ডলার পাউন্ড নিদেনপক্ষে রিংগিত হতে পারতাম, তাহলে আমার জ্বালা যন্ত্রণা কিছুটা লাঘব হতো।

এক সময় কেউ কেউ কাগুজে নোটকে বন্ধুত্ব, প্রেম বা ভালোবাসার সহজ মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিল। টাকায় ঠিকানা বা ফোন নম্বর দিয়ে বন্ধুত্বের আহ্বান জানানো হতো। কেউ দিতেন প্রেমের প্রস্তাব। যাও চিঠি বলো তারে সে যেন ভুলে না মোরে ইত্যাদি লাইন লিখে। টাকায় প্রেম-ভালোবাসা বা বন্ধুত্বের আহ্বান সীমাবব্ধ থাকলেও একসময় সেখানে কুরুচিপূর্ণ ও রাজনৈতিক মন্তব্য স্থান পায়। অনেকেই থুথু আঙ্গুলে লাগিয়ে টাকা গুনে থাকেন। নোংরা পানি বা ঘাম দিয়েও টাকা গোনেন। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কাগুজে নোট ছিদ্র করে বাঁধাই করে। ব্যাংক কর্মীরা বান্ডেলের ওপর স্বাক্ষর, সিল, নোটের সংখ্যা এবং টাকার পরিমাণ লিখে থাকেন। এতে টাকা মলিন হয়, সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে আর তা চালানো যায় না। বিশ্বের অন্য কোনো দেশের কাগুজি নোটে কলমের দাগ, সিল বা পিনের কোনো চিহ্ন থাকে না। আমাদের দেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। পুরনো বা নষ্ট টাকা লেন-দেনে ক্রেতা-বিক্রেতা বাহাস চলছেই..।

হারিয়ে যাচ্ছে এক টাকা। ১৯৯৩ সালের পর আর কোনো এক টাকার কাগুজি নোট বাজারে ছাড়া হয়নি। এক টাকার বিড়ম্বনার শেষ নেই। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক এক পয়সা বা এক টাকা কোনোটাই বিলুপ্ত বা বাজেয়াপ্ত করেনি। এক টাকা যেমন পাওয়া যায় না। তেমনি এক টাকার কয়েনও সহজলভ্য নয়। বিক্রেতারা এক টাকার পরিবর্তে লজেন্স দিচ্ছেন। লজেন্স দেয়ার অধিকার শুধু তাদের। ক্রেতাদের সে অধিকার নেই। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা লাভের জন্য এক টাকার কয়েন রাখেন না (মোবাইলে টাকা লোড করার সময়ও গ্রাহকরা এক টাকা করে প্রতিবার লোকসান দিচ্ছে)। জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকে যথেষ্ট পরিমাণে এক টাকার কয়েন জমা আছে। কিন্তু এর ব্যবহার কম হচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে আমাদের মাঝে হয়তো এক টাকার গুরুত্ব থেকে যাবে। বিয়ের কাবিননামা, জমির দলিল বায়না করা, কোরবানির পশু কেনা বা ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতীকী হিসেবে লাখ লাখ টাকার সঙ্গে এক টাকাও উচ্চারিত হবে এবং এক সময় এক টাকা কিংবদন্তি হয়ে জাদুঘরে স্থান পাবে।

প্রতি বছর জুন মাসে বাজেটের সময় আশায় বুক বাঁধি। এবার আমার কালিমা মোচন হবে। কালো টাকা আর সাদা করার সুযোগ দেয়া হবে না। সে আশায় গুড়ে বালি। তাসের ঘরের মতো সে আশা প্রতিবারই ভেঙে যায়। সব সরকারই প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা যা করার তাই করে। এখন আমি আর আশার ছলনে ভুলি না। ৪৮টি বছর কেটে গেল কেউ কথা রাখল না। কালো টাকা সাদা করা বন্ধ হলো না। আমার কষ্ট আরো বেড়ে যায় বহুগুণ যখন শুনি নকল টাকাতে বাজার সয়লাব। শত শত কোটি টাকার নকল নোট বাজারে। আমার দিকে মানুষ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। আমার দেহে কোমল স্পর্শ করে বোঝার চেষ্টা করে আমি আসল না, নকল। এতে আমার মাথা হেঁট হয়ে যায়। এ যেন ডাক্তারের কাছে নারীর সতীত্ব পরীক্ষা করার মতো বিড়ম্বনা। গণ-মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে সে কষ্ট অপমানও আমি মেনে নিয়েছি। জাল টাকা হাতে পেয়ে বিপদে পড়ছে সাধারণ মানুষ। অর্থিক ক্ষতি হচ্ছে তাদের। ব্যাংক থেকে টাকা উঠালে সেখানেও জাল নোট পাওয়া গেছে। হাতে গোনা কয়েকটি চক্রই বারবার টাকা জাল করছে। ধর্মীয় বা সামাজিক কোনো উৎসব সমাগত হলেই জাল টাকার বিস্তার ঘটে। কেন তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। তারাও কি শেয়ার ধস সৃষ্টিকারীদের মতো শক্তিশালী। কেউ তাদের নাম মুখে আনছেন না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আমাকে চুরি করা হলো বিদেশিদের সহযোগিতায়। আমি সেখানেও নিরাপদ না। চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে গেল। ব্যাংকের টাকা চুরির সঠিক তথ্য পাওয়া গেল না। জনগণ চিনে রাখতে পারল না চোরদের। দেশ থেকে অস্বাভাবিক হারে টাকা পাচার বেড়েছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে চার প্রক্রিয়ায় ৫৯০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। যার পরিমাণ দেশীয় মুদ্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। ১০ বছরে (২০০৬-২০১৫) বাংলাদেশ থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যা দেশের ২০১৮-২০১৯ বছরের জাতীয় বাজেটের চেয়ে বেশি। ব্যাংকবিমুখ হচ্ছে আমানতকারীরা। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলছে। সুযোগ থাকলে তারা হয়তো মাটির ব্যাংকের দিকে ফিরে যেত।

ব্যাংকগুলোতে দিন দিন বাড়ছে অলস টাকা। এখন অলস টাকা পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। কথায় আছে না অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাস। আমার দিনের পর দিন আর অলস বসে থাকতে ভালো লাগে না। এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরে বেড়ানোই আমার কাজ। এভাবে অলস আর কতদিন যে পড়ে থাকতে হবে তা কেউ জানে না। মানুষ এখন ব্যাংকে জমা রাখা টাকা উঠিয়ে ফেলাকেই নিরাপদ মনে করছে। বিনিয়োগের কথা তেমন একটা ভাবছে না। বিনিয়োগ হচ্ছে ঠিকই। সেটা দেশে নয়, বিদেশে। মালয়েশিয়া কানাডার বেগমপল্লীতে চলে যাচ্ছে। শেয়ার মার্কেট থেকে ৯৬ হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে গেল। সেই সব টাকা ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ নেই। পুঁজিবাজারে তুঘলকি কাণ্ড চলছে।

বিচিত্র অভিজ্ঞতায় আমার জীবন ভরপুর। স্বাধীনতার পর থেকে কত কিছু দেখতে হলো। এ দেশের প্রায় সবাই সবাইকে ঠকাতে চায়। সবচেয়ে বেশি ঠকে সাধারণ ক্রেতারা। ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে একেবারেই সচেতন না দেশের মানুষ। আমি আমার দীর্ঘ জীবনে দেখেছি কত উত্থান-পতন। আজ যে রাজা কাল সে ফকির। রাষ্ট্রের অর্থ কিভাবে মানুষের হাতে চলে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে কি মধ্যবিত্ত? সরকার বলছে দিন দিন মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোথায় সে প্রকৃত মধ্যবিত্ত? যারা ন্যায়ের পক্ষে কথা বলবেন। মধ্যবিত্ত তার চরিত্র হারাতে বসেছে। মধ্যবিত্তের এই বদলে যাওয়া দেখতে আমার কষ্ট লাগে। তারাও এখন খুব বেশি ভোগ বিলাসে গা ভাসাচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে চলছে লাগামছাড়া অনিয়ম । আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরে না এলে এভাবে তো একটা দেশ দীর্ঘদিন চলতে পারে না।
- লেখক: সাংবাদিক ও রম্যলেখক

মানবকণ্ঠ/এসএস



Loading...
ads


Loading...