বড় বিপদের কারণ হতে পারে রোহিঙ্গা



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১১ জুন ২০১৯, ১৪:৪২

এক সময় রোহিঙ্গারা সবার কাছেই করুণার পাত্র ছিল। এদেশের মানুষ তাদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করত। আশ্রয় দিত। নানা কারণে সেই ‘রোহিঙ্গা’ই এখন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। মাদক ব্যবসা থেকে খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি- হেন অপরাধ নেই; যা তারা করছে না। তাদের জন্য কক্সবাজার অঞ্চল এখন অস্থিতিশীল অবস্থায় পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয়রা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। জগদ্দল পাথরের মতো আমাদের ঘাড়ে চেপে বসা এই লোকগুলো আগামিতে বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

মিয়ানমারে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে সেনাবাহিনী মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন, হত্যা, ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করছিল- তখন বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের হৃদয়ে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। রক্ত ঝরছিল মানবতাবাদী সব মানুষের হৃদয়েও। রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধে ভূমিকা না রাখায় দেশটির নেত্রী অং সাং সুচি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।

গৃহবন্দি থাকা কালে তাকে যারা মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, তারাই তার কড়া সমালোচনা শুরু করেন। কেড়ে নেয়া হয় তাকে দেয়া অনেক খেতাব। পক্ষান্তরে প্রশংসিত হয় বাংলাদেশ, প্রশংসিত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগেই দলে দলে রোহিঙ্গারা নাফ নদ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে আসতে থাকে। আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি তাদের চিকিৎসা ও খাবার দিয়ে ফেরত পাঠায়।

এক পর্যায়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্তে জড়ো হয় বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য। কিন্তু সীমান্ত খুলে দেয়া হয়নি। একদিকে বন্দুক হাতে বিজিবি, অন্যদিকে মিয়ানমারের বিজিপি। মাঝখানে রোহিঙ্গারা। এই মানবিক বিপর্যয় দৃষ্টি কাড়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের। নানা মানবতাবাদী সংগঠনগুলো সীমান্ত খুলে দেয়ার আহ্বান জানাতে থাকে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, হেফাজত নেতা আল্লামা শফী আহমদ এবং ইসলামপন্থি বিভিন্ন দল সীমান্ত খুলে দেয়ার দাবি জানাতে থাকে। বিক্ষোভও করা হয়।

এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দেয়ার অনুমতি দেন। প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকে। তাদের স্বাগত জানায় কক্সবাজারের বাসিন্দারা। বাড়িতে তাদের আশ্রয় দেন, খাবারও দেন তারা। রোহিঙ্গারা বন, জঙ্গল ও পাহাড়ে বসতি স্থাপন শুরু করে। এতে হুমকির মুখে পড়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রায় সঙ্কট তৈরি হয়। হু-হু করে বেড়ে যায় পণ্যের দাম ও গাড়ি-বাড়ি ভাড়া। স্থানীয় লোকজনের কাজের সুযোগ কমে যায়। কারণ রোহিঙ্গারা কম টাকায় কাজ করতে থাকে। এ সমস্যার চেয়েও বড় সমস্যা- রোহিঙ্গারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে রোহিঙ্গা আটকের খবর আসছে। অর্থাৎ তারা এখানে স্থায়ী বসতি গড়ার চেষ্টায় রত।

শুধু তাই নয়, চেষ্টা করছে এদেশের নাগরিক হওয়ার। অনেকে আবার এ দেশের নাগরিকদের সঙ্গে ছেলেমেয়ে বিয়ে দিয়ে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। অনেকে টাকা-পয়সা খরচ করে ভোটার তালিকায় নাম উঠিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গেছেন। সেখানে তারা নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন। এতে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। রোহিঙ্গারা যখন এ দেশে আসে, তখন একটা খবরে আঁতকে উঠি।

অনেক রোহিঙ্গা এ দেশে মরণ নেশা ইয়াবা ট্যাবলেট নিয়ে আসে। এর অর্থ পরিষ্কার। তারা এদেশে শুধু আশ্রয় নিতে আসেননি, এসেছেন যুবসমাজকে ধ্বংস করতে। তারা যে শুধু ইয়াবা নিয়ে এসেছেন, তা নয়। তারা এখানে থেকে ওপারের (মিয়ানমার) আত্মীয়দের কাছ থেকে ইয়াবা আনছেন, করছেন মাদক ব্যবসা। এরই মধ্যে তারা জড়িয়েছেন খুন-খারাবিতেও। চট্টগ্রামের চন্দনাইশে এক শিশুকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে রহিম উল্ল্যাহ নামে এক রোহিঙ্গা।

তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার দেয়া তথ্যমতে উদ্ধার করা হয়েছে শিশুটির মরদেহ। চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি চুরির ঘটনায় কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে মোবাইল ফোন, টাকাসহ বিভিন্ন জিনিস। অনেক রোহিঙ্গা নারী আবার পতিতাবৃত্তিতে নেমে পড়েছেন। তারা কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হোটেলে পতিতাবৃত্তি করছেন। অনেকে আবার ভাসমান পতিতাবৃত্তি করছেন। এতেই বোঝা যায়, তাদের অপকর্মের জাল দিন-দিন বিস্তৃত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন মাদক বিশেষ করে ইয়াবা মুক্ত করতে ‘যুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে, তখন এদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা ইয়াবা ব্যবসার জাল বিস্তৃত করছে।

তাদের কার্যক্রমে মনে হচ্ছে- আমরা খাল কেটে কুমির এনেছি! ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ইয়াবা, মানব পাচার ও হাটবাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে অন্তত ১৪টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী রয়েছে। তাদের মধ্যে হামলা, সংঘর্ষও বাড়ছে। চলছে অস্ত্রের মহড়াও। গত সাড়ে চার মাসে খুন হয়েছে ৩২ রোহিঙ্গা। অপহরণ, ধর্ষণসহ নানা অপরাধও বাড়ছে।

মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত ও ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পিতভাবে শিবিরগুলোকে অস্থিতিশীল করে তোলা হচ্ছে। পুলিশের তথ্যমতে, টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে রোহিঙ্গাদের ১৪টি দল রয়েছে। তারা শিবিরের অভ্যন্তরে অপরিকল্পিতভাবে দোকানপাট ও মাদক বিক্রির আখড়া তৈরি, মানব পাচার, অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়, ডাকাতি ও মাদকের টাকায় আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহসহ নানা অপরাধকর্ম করছে। টেকনাফ ও উখিয়ার শিবিরে সাতটি করে সন্ত্রাসী বাহিনী আছে। এর মধ্যে টেকনাফের আবদুল হাকিম বাহিনী বেশি তৎপর। এই বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিপণ আদায়ের জন্য যখন-তখন লোকজনকে অপহরণ করে।

মুক্তিপণ না পেলে হত্যা করে লাশ গুম করে। ইয়াবা, মানব পাচারে যুক্ত থাকার পাশাপাশি এ বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গা নারীদের তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। ২০১৬ সালের ১৩ মে টেকনাফের মুছনী রোহিঙ্গা শিবিরের পাশে শালবন আনসার ক্যাম্পে হামলা চালায় হাকিম বাহিনী। এ সময় আনসার কমান্ডার আলী হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে। নিয়ে যায় ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র। হাকিমের বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরের দক্ষিণ বড়ছড়ায়। ২০১৪ সালে রোহিঙ্গাদের পক্ষে ‘স্বাধিকার’ আন্দোলনের ডাক দিয়ে ‘হারাকান আল ইয়াকিন’ বাহিনী গঠন করে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন তিনি।

মাঝেমধ্যে ফেসবুকে ভিডিও বার্তায় রোহিঙ্গাদের সংগঠিত করার ডাক দেন। তিনি জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে ওই এলাকাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে। হাকিমের পাঁচ ভাই- জাফর আলম, রফিক, নুরুল আলম, আনোয়ার ও ফরিদের নেতৃত্বে অনেকে রোহিঙ্গা শিবিরের বিভিন্ন আস্তানা থেকে ইয়াবা, মুক্তিপণ, মানব পাচারের টাকা সংগ্রহ করে হাকিমের কাছে পৌঁছে দেন। আবদুল হাকিমকে ধরার চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইতোমধ্যে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এ বাহিনীর দুই সদস্য নিহত হয়েছেন। হাকিমের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় খুন, অপহরণ ও ধর্ষণের আটটি মামলা রয়েছে। ইয়াবা বিক্রি ও মানব পাচারের টাকায় হাকিম বাহিনী আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করছে। পুলিশের তথ্যমতে, টেকনাফের বিভিন্ন শিবিরে আরো ছয়টি বাহিনী তৎপর রয়েছে। এগুলো হচ্ছে ছাদেক, হাসান, নুরুল আলম, হামিদ, নূর মোহাম্মদ ও গিয়াস বাহিনী।

প্রতিটি দলে সদস্য রয়েছে ১২-২০ জন। এরই মধ্যে এসব বাহিনীর ছয়জন খুন হয়েছেন। অন্য সদস্যরা আত্মগোপন করায় বাহিনীর তৎপরতা এখন শিবিরে নেই। উখিয়ার বিভিন্ন শিবিরে রোহিঙ্গাদের সাতটি বাহিনীর তৎপরতা থাকলেও এখন আর নেই। বাহিনীর সদস্যরা ইয়াবা ব্যবসা ও মানব পাচারে জড়িত। দুঃখজনক হলো, রোহিঙ্গাদের একাধিক গোষ্ঠী বা বাহিনীর মধ্যে খুনখারাবি, অপহরণের ঘটনা ঘটলেও পুলিশের খাতায় কোনো বাহিনীর তালিকা নেই। পুলিশের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৭ মে পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ৩২ রোহিঙ্গা। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৬, মার্চে ১০, এপ্রিলে ৪ ও মে মাসে ৪ জন। টেকনাফ পুলিশের ভাষ্য, ৩২ রোহিঙ্গার মধ্যে পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ১৫ জন। নিহত ব্যক্তিদের অধিকাংশ ইয়াবা ব্যবসায়ী। দুজন মানব পাচারকারী। তাদের লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে নারীর প্রতি। ২৬ মার্চ বালুখালী শিবিরের ই-ব্লক থেকে পুলিশ আয়েশা বেগম (১৯) নামে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে। ধর্ষণের পর তাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। এর আগে ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মুখোশধারী একদল রোহিঙ্গা উখিয়ার কুতুপালং শিবির থেকে খতিজা বেগম নামে এক কিশোরীকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে।

এরপর হত্যা করে লাশ জঙ্গলে ফেলে যায়। সম্প্রতি এক রাতে মুখোশধারী তিন যুবক ঘরে ঢুকে এক কিশোরী মেয়েকে অপহরণের চেষ্টা চালায়। বর্তমানে উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৯১৩ জন। যেসব রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধ বেড়েছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল বাড়ানো হয়েছে।

বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও। এসব ঘটনা থেকেই প্রমাণ হয় রোহিঙ্গারা এদেশের জন্য কত বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে। তারা আমাদের অর্থনীতির জন্যও বড় সমস্যা। ইতোমধ্যে আমাদের বাজেটেও স্থান করে নিয়েছে তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বারবারই আন্তর্জাতিক মহলে রোহিঙ্গা সঙ্কট তুলে ধরেছেন, ধরছেন।

বিশ্ব নেতৃবৃন্দ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের যতদিন ফেরত পাঠানো যাচ্ছে না, ততদিন তাদের ওপর কড়া নজরদারি রাখা দরকার। তারা যেন ক্যাম্প থেকে বের হতে না পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় ঝুঁকি বাড়তে থাকবে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা এনজিও এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মতামত গুরুত্ব না দিয়ে তাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আর এটা করতে হবে দেশের স্বার্থেই। - লেখক: সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এএম



Loading...
ads


Loading...