বাসযোগ্য ঢাকার জন্য প্রয়োজন পার্ক সংরক্ষণ



  • সাহাদাৎ রানা
  • ১০ জুন ২০১৯, ১৫:১৩

মূলত কয়েকটি মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে একটি শহর কতটা বাসযোগ্য তা নির্ধারিত হয়। নাগরিক সুবিধার সর্বোচ্চ প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে মানদণ্ডের মাপকাঠি। কোন কোন সুবিধা থাকলে তাকে বাসযোগ্য শহর হিসেবে বিবেচনা করা হয় তার মাপকাঠির সংজ্ঞাও নেহায়েত ছোট নয়। তবে সেই দীর্ঘ আলোচনায় না গিয়ে, আজকের ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে বরং চোখ রাখা যাক। বাসযোগ্য শহরের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই হলো: নাগরিকদের বিনোদন।

আর সেই বিনোদনের অন্যতম প্রধান হলো ‘পার্ক’। মূলত সুস্থ নাগরিক জীবন গড়ে ওঠে পার্ককে কেন্দ্র করে। পার্ক শুধু সবার জন্য নিখাদ বিনোদনের জায়গাই নয় বরং এগুলো আসলে শহরের যান্ত্রিক জীবনে হৃৎপিণ্ডের মতো। কারণ এই সবুজ যেমন নাগরিকদের চোখের এবং মনের আরাম দেয় তেমনি শহরকে বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। দুঃখের বিষয় দিন দিন ইটের তৈরি বাড়ির কারণে কমে যাচ্ছে গাছের সমারোহ। কমে যাচ্ছে সবুজের চিহ্ন। অথচ, এমন পার্কের মতো সবুজ সবার জন্যই প্রয়োজন। বিশেষ করে একটু বয়স্ক মানুষদের জন্য পার্ক যেন প্রধানতম প্রশান্তির আবাস। যানজটের কর্মব্যস্ত রাজধানীর মানুষের কাছে একটু স্বস্তির জায়গার নামও পার্ক।

সেখানে সবাই যায় মূলত একটু শীতল আশ্রয়ের খোঁজে। কিন্তু সেই পার্কে আজ মানুষ গেলে কতটা স্বস্তি পায় তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
কেননা, আমাদের প্রিয় রাজধানীতে যতগুলো ছোট-বড় পার্ক রয়েছে তার অধিকাংশই পার্কের চেহারায় নেই। বরং অধিকাংশই আছে বেহাল দশায়। পার্কের ভেতরে যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নোংরা আবর্জনার স্ত‚প। সর্বত্র হকার ও টোকাইদের দৌরাত্ম্য। আবার গোপনে চলছে অসামাজিক কার্যকলাপও। প্রবেশপথে নানা প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশসহ অপরাধীদের অভয়ারণ্য যেন হয়ে উঠেছে পার্কগুলো। স্কুল বা কলেজ পালিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদেরও অবাধ বিচরণ দেখা যায় প্রায় নিয়মিত।

এছাড়া প্রেমিক যুগলের আপত্তির অবস্থায় বসে থাকা যেন একটু দূরত্বের ব্যবধানে নিয়মিত চিত্র। পার্কের বিষয়ে এ বিষয়গুলো যে একেবারে নতুন তা কিন্তু নয়। বহুদিন ধরে এমনটা চলছে। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অবৈধ দখলের কারণে রাজধানী থেকে ছোট-বড় অনেক পার্ক হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আর এতে করে নগরবাসী যে একটু হাঁটাহাঁটি করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে সে সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের জন্য মাথাপিছু যে পরিমাণ খোলা জায়গা থাকা উচিত, তা ঢাকা শহরে নেই এটা সবাই এক বাক্যে মানতে বাধ্য। সাধারণ মানুষ যারা শুধুমাত্র একটু শান্তির খোঁজে যান তারাও পড়েন অস্বস্তিতে। এখন প্রচণ্ড গরম। তাই সাধারণ মানুষের উপস্থিতি পার্কে একটু বেশি। কিন্তু সেখানেও সেভাবে স্বস্তি নেই। আছে অস্বস্তি। আর এসব অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সবাই নীরব দর্শক হয়ে শুধুই দেখছেন!

ঢাকার পার্কগুলোর প্রধানতম সমস্যা হলো- পার্কগুলোতে নিরাপদে বা নির্ঝঞ্ঝাটে ঘুরে বেড়ানোর কোনো উপায় নেই। যেখানে সাধারণ মানুষের চেয়ে ভবঘুরে, মাদকসেবী, মাস্তান, ছিনতাইকারী ও ভাসমান যৌনকর্মীর উপস্থিত ব্যাপক হারে লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ মানুষের উপস্থিতি এর জন্য কম। আবার তাদের আনাগোনা কম হওয়ায় অন্যদের উপস্থিতি অধিক। তবে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি কম হওয়ার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো পুলিশের অত্যাচার আর হয়রানির শিকার হওয়ার ভয়। কোনো ঝামেলায় পড়লে পুলিশের কাছে প্রতিকারের আশায় গেলে উল্টো নাজেহাল হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। বিশেষ করে কেউ কোনো ছিনতাইয়ের শিকার হলে, সেখানে সঙ্গবদ্ধ চক্র এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যাতে করে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া ব্যক্তিকে পড়তে হয় ঝামেলায়। এখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী না থাকাও হয়রানির অন্যতম কারণ। উপরন্তু নিরাপত্তাকর্মীরাও যে নিরপত্তা নিশ্চিত করবে তাও হলফ করে বলা যাচ্ছে না।

বাস্তবতা হলো- রাজধানীর পার্র্কগুলোর এই বেহাল দশা একদিন বা দু’দিনে হয়নি। এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে লেগেছে দীর্ঘ সময়। আর এর জন্য যারা দায়ী তাদের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। সিটি কর্পোরেশনের তথ্য মতে, কাগজপত্রে ঢাকা শহরে এখন মোট পার্ক রয়েছে ৪৯টি। এর মধ্যে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অধীনে রয়েছে ২৩টি। আর দক্ষিণ সিটির আওতায় রয়েছে ২৬টি পার্ক। তবে দুঃখের বিষয় এসব পার্কের অধিকাংশই এখন বিলুপ্তির পথে। নাগরিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে নগরায়ণের কারণে যেখানে পার্কের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাওয়ার কথা সেখানে পার্কের সংখ্যা কমছে। যা নাগরিকদের জন্য সত্যিই হতাশার। আর সিটি কর্পোরেশনের কাগজপত্রের হিসেবের খাতায় যেসব পার্ক রয়েছে সেগুলোর প্রতিও নেই কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি।

আর ছোটখাটো যে কয়েকটি পার্ক রয়েছে তাও রয়েছে অসাধু চক্রের দখলে। যেখানে তারা গড়ে তুলেছে নিরাপদ মাদকস্পট, ব্যক্তিগত গাড়ির গ্যারেজ (যা প্রভাবশালীরা ভাড়া দিয়ে থাকেন)। এছাড়া চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠনের ক্লাবও রয়েছে এসব পার্কে। আর এসবই করা হচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায়। অনেকটা প্রশাসনের নাকের ডগায়। অভিযোগ রয়েছে, এসব রক্ষা করতে মোটা অংকের টাকাও খরচ করেন প্রভাবশালীরা। যাতে নিশ্চিন্তে তারা চালিয়ে যেতে পারেন তাদের লাভজনক কর্মকাণ্ড।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিটি মানুষের জন্য অন্তত ৯ বর্গমিটার সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের এই ছোট্ট কিন্তু জনসংখ্যায় ভরপুর এই শহরে কতটা সবুজ রয়েছে তা আমাদের চারপাশে চোখ বুলালেই বেশ আন্দাজ করা যাবে। কিছু পার্ক রয়েছে যেখানে নেই পর্যাপ্ত বৃক্ষ। ঘূর্ণিঝড়ে বৃক্ষ পড়ে বা ভেঙে গেলে নতুন করে উদ্যোগ নেয়া হয় না বৃক্ষরোপণে। পার্কে ফুল বাগানের উপস্থিতিও অনেক কম। পাতা জমে ভরপুর হয়ে থাকলেও তা সরানোর কাজে মনোযোগ নেই কর্তৃপক্ষের। এসব কারণে সবুজ হওয়ার পরিবর্তে পার্কগুলো বিরান রূপ নিচ্ছে; যা নাগরিক হিসেবে সবার জন্যই হতাশার।

এছাড়া পার্ককে ঘিরে নেই আরো অনেক কিছুর উদ্যোগ। কিন্তু এখন সময় হয়েছে আর পেছনে ফিরে না তাকিয়ে এই বিষয়ে মনোযোগ বাড়িয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার। কারণ রাজধানীতে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে তাতে জনস্বার্থে পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গা বাড়ানো প্রয়োজন। এখন পার্কের সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব না হলেও, দখল হয়ে যাওয়া পার্ক ও উদ্যানগুলো দ্রুত উদ্ধার এবং সম্প্রসারণ করা জরুরি। নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ যাতে পার্কগুলোতে হয়রানির শিকার না হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে।

বিশেষ করে এ বিষয়ে দুই সিটি কর্পোরেশনকে কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে এ কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ এগুলো রক্ষার মূল দায়িত্ব তাদের। এছাড়া দায়িত্ব রয়েছে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও। নিয়মিত যদি পার্কগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় তবে অনেকাংশে পার্কের পরিবেশ সুন্দর হবে। সাধারণ মানুষও নিশ্চিন্তে পার্কে প্রবেশের সাহস করবে। - লেখক : সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এএম



Loading...
ads


Loading...