চলো বদলে যাই...



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১০ জুন ২০১৯, ১৩:৪৬

আজকালকার ছেলেমেয়েরা ভাইরাল আর ট্রল এই দুটো কথা খুব বলছে। আমরা সেকালের মানুষ, বয়স ও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তো বাড়ছেই। আমার কাছে শব্দ দুটো নতুন। কিন্তু লজ্জায় কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারছিলাম না এ দুটো শব্দের মানে কি? আমার ছেলে-মেয়ে দুটো ছোট ছোট। কি অদ্ভুত ওরাও ভাইরাল আর ট্রল কথাটা জানে। আমার গিন্নিও জানেন। ভাবীদের আলোচনার দু’একটা শব্দ আমার কানেও ইথারের মতো ভেসে আসে। আমার গিন্নিসহ তারা ভাইরাল আর ট্রল কথাটা নিয়ে খুব হাসাহাসি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সূত্রে আমার ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের আলোচনাতেও ভাইরাল ও ট্রল কথাটা কানে এসেছে। কিন্তু শুনেও না শোনার ভান করেছি। ভেবেছি তারা যদি আমাকে ভাইরাল আর ট্রল শব্দের বিষয়ে প্রশ্ন করে। তাহলে নাস্তানাবুদ হতে হয় কিনা? আড্ডার সময় সহকর্মীরাও ভাইরাল আর ট্রল কথাটা নিয়ে আলাপচারিতা শুরু করলে আমি কাজ আছে বলে সটকে পড়ি। দুটো ঘটনায় আমি একটু একটু বুঝতে পেরেছি ভাইরাল আর ট্রল জিনিসটা কি।

রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত যেখানেই যায় সেখানেই শুনি একটা গান। ‘একটা সময় তরে আমার সবই ভাবিতাম, তরে মন পিঞ্জিরায় যতন করে আগলাইয়া রাখিতাম। মাইয়া ও মাইয়ারে তুই অপরাধীরে, আমার যত্নে গড়া ভালোবাসা দে ফিরায়া দে।’ ভাবলাম কি ব্যাপার, কি এমন ঘটল যে সারাদেশের মানুষ এই গানটার জন্য পাগল হয়ে গেছে। বুড়ো, বাচ্চা, ছেলে, মেয়ে সবার মুখেই এই একটাই গান, না লজ্জা না শরম।

পরে বুঝলাম এটা ভাইরাল হয়েছে। ফেসবুকে একজন গেয়েছে এরপর থেকে এটা শেয়ার এর পর শেয়ার হয়েছে। ফলে শহর ছেড়ে গ্রামগঞ্জেও এটা বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো যে ছেলেটা এই গানটার প্রকৃত গায়ক, সবার আগে গানটা গেয়েছে। তার গানটা নাকি ভাইরাল হয়নি। কিন্তু একটা মেয়ে যখন এটা গাইল তখন সারাদেশে, দেশ ছেড়ে বিদেশে এটা ভাইরাল হলো। তার মানে ভাইরাল হতে ভাগ্য লাগে!

সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশের সিনেমাটার কথা মনে পড়ল। রাজা কি মন্ত্র যে পড়ালেন তা রাজ্যের সব প্রজাদের মুখে মুখে। মনে পড়ল সিনেমার কয়েকটা ডায়ালগের কথা ‘বাকি রাখা খাজনা, মোটে ভাল কাজ না, ভর পেট নাও খাই, রাজ কর দেওয়া চাই, যায় যদি যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান, যে কয় পেটে খেলে পিঠে সয়, তার কথা ঠিক নয়, যে করে খনিতে শ্রম, যেন তারে ডরে যম, অনাহারে নাহি ক্ষেদ, বেশি খেলে বাড়ে মেদ, ধন্য শ্রমিকের দান, হীরকের রাজা ভগবান, লেখাপডা করে যে, অনাহারে মরে সে, জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই’। আরেকটা মজার কথা ছিল তা ছবির শিক্ষক বলেছিলেন ‘দড়ি ধরে মার টান, রাজা হবে খানখান’। ১৯৮০ সালে ছবিটি মুক্তি পায় কিন্তু এই কথাগুলো উপমহাদেশের সবার মুখে মুখে ছিল। তাহলে ভাইরাল বিষয়টা ফেসবুক আবিষ্কারের অনেক আগেই ঘটেছিল কিন্তু তখন আমাদের প্রজন্ম তা বুঝতে পারেনি। এটা আমার ধারণা ফেসবুক হওয়ার পর আমরা ভাইরাল বললেও ভাইরাল বিষয়টা কোনো না কোনো ভাবে আমাদের সমাজে ছিল। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারছি ফেসবুক ছাড়াও অনেক মাধ্যম আছে যার মাধ্যমে যে কোনো বিষয় ভাইরাল হতে পারে।

১৯৯০ সালে বহুব্রীহি উপন্যাসটি লিখেন জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদ। পরে বিটিভিতে এটাকে নাট্যরূপ দেয়া হয়। সেখানে একটা ডায়লগ ছিল ‘তুই রাজাকার’। যা সে সময় সারাদেশে ভাইরাল হয়েছিল।

আধুনিক যুগেও অবাস্তব ভাইরালের বিপজ্জনক প্রচার ঘটতে পারে। হায় হায়, এমনটাও হয় এই প্রযুক্তির যুগে। বলা নেই কওয়া নেই, একটা গোষ্ঠী বলে বেড়াতে লাগলো সাইদীকে চাঁদে দেখা গেছে। হায়রে গুজব সিনেমাকেও হার মানায়। বড় বড় বিজ্ঞানীরা এই কথা শুনে তো আক্কেল গুড়ুম। চাপাবাজির তো একটা লিমিট থাকে। এই ধরনের ভাইরাল আমাদের মানসিকতা এগিয়ে দেয় না, পিছিয়ে দেয়। এখান থেকে ধারণা হলো মানুষের আজগুবি ধারণাগুলো গুজবের ওপর ভর করে ভাইরাল হতে পারে। অনেক ভিত্তিহীণ বিষয় সারা পৃথিবীতে ভাইরাল হয়েছে যা আমাদের মানব সভ্যতার ধ্বংসের কারণ হবে কিনা তা যাচাই করে দেখবেন অপরাধ, সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা।

এবার আসি ট্রল নিয়ে। হঠাৎ করেই ফেসবুক খুলতেই চোখে পড়ল একটা কথা। কথাটা এমন ‘এই মনে করেন ভালো লাগে, খুশিতে, ঠ্যালায়, ঘোরতে।’ এরপর দেখি সারাদেশের মানুষ যে যেভাবে পারছে সে সেভাবে কথাটার ব্যাখ্যা প্রদান করছে। ভালো ভালো ব্যাখ্যা দিতে দিতে সারাদেশের মানুষ যদি মহাপণ্ডিত হয়ে যায় তাহলে দোষের কিছু নাই। তবে ব্যাখ্যাটা যাতে শুভচিন্তার হয়, অশুভশক্তি যাতে এর ওপর ভর করে ফায়দা লুটতে না পারে সেটাও ভেবে দেখতে হবে বৈকি। ঠিক নির্বাচনের পর পরই কয়েকটি মিউজিক্যাল ডাবিং অ্যাপ বিষয়টিকে নজরে আনে। আমি দেখেছি তিনজন আধুনিক তরুণী কথাটাকে অভিনয় করে দেখাচ্ছে।

আমি প্রথমে বিষয়টা বুঝে উঠতে পারেনি। তবে যেটা জেনেছি ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের লাইভ সম্প্রচারের এক পর্যায়ে একজন সাংবাদিক কয়েকজন নারীর কাছে জানতে চান, তাদের হাতে ভোট দেয়ার অমোচনীয় কালি দেয়া আছে। তাহলে ভোট দেয়ার পর আবারও তারা লাইনে দাঁড়িয়েছেন কেন? সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে এক নারী তখন বলেছিলেন, এই মনে করেন, খুশিতে, ঠ্যালায়, ঘোরতে। সে সময় এই ভিডিওটি ফেসবুকে কম-বেশি শেয়ার হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সে সময় এটা ভাইরাল হয়নি। ২০১৮ নির্বাচনের সময় এটা অভিনয় করে দেখাল তিন নারী, এছাড়াও আরও কেউ থাকতে পারে আমার জানা নেই।

যারা বাস্তবে কথাটা বলল তাদেরটা ভাইরাল হলো না আর যারা ট্রল মানে অভিনয় করে দেখালো তাদেরটা ভাইরাল হলো। কার ক্রেডিট কে নিয়ে গেলো, একেবারে অদ্ভুত একটা ব্যাপার। আবার ঘটনাটা ঘটেছিল ২০১৪ সালে তখন এটা নিয়ে চায়ের কাপে কোনো ঝড় নেই কিন্তু ২০১৮ সালে এটা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড। এখন তো ২০১৪ সালকেও সন্দেহ লাগছে এটা আসলে কখন কোন নির্বাচনে হয়েছিল কে জানে? নির্বাচন বিশ্লেষকরা বিষয়টা ভেবে দেখবেন, কারণ আমি এতো চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে পারি না।

কিছুতেই কিছু মিলাতে পারি না। তবে লিখতে বসে একটা বিষয় মগজে ধরেছে তা হলো ট্রল ভাইরাল হয় কিন্তু ভাইরাল ট্রল হয় কিনা জানি না। ফেসবুক গবেষকরা বিষয়টা নিয়ে গবেষণা করলে মন্দ হয় না! ফেসবুক থাকবে কি থাকবে না। এটা ভালো না মন্দ। এটা সময় ও সম্পর্ক নষ্ট করছে কি করছে না। এ নিয়ে নানা মতভেদ আছে, থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমি ফেসবুকের আগামী দিনের ইতিবাচক ব্যবহার নিয়ে খুব আশাবাদী হওয়ার চেষ্টা করি। হয়তো আমার ধারণা ভ্রান্ত কিংবা সঠিক।

প্রতিদিন ফেসবুকে মানুষ অন্তত একটি করে শুভ সংবাদ দিতে পারে। সবার হাত ধরেই ফেসবুক হয়ে উঠুক শুভ চিন্তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ফেসবুকের মাধ্যমে অনেক তরুণ-তরুণী জ্যাকমার আলী বাবা ডটকম, জেফবেজোসের আমাজন ডটকমের মতো অনলাইন ব্যবসা শুরু করেছে। এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে তরুণরাই ফেসবুক বেশি ব্যবহার করছে। সমীক্ষাটি বলছে, তাদের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ফেসবুকের মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটাতে চায়, তাদের সুপ্ত প্রতিভা প্রকাশ করতে চায়।

একজন মানুষের রুচি ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় মিলছে ফেসবুকে তার পোস্টগুলোর মাধ্যমে। মানুষকে যাচাই করার খুব ভালো একটা মাধ্যম হচ্ছে এই ফেসবুক; এটা কি কখনো আমরা ভেবে দেখেছি? ফেসবুকের একটি নেতিবাচক বিষয় হলো এর প্রতি আসক্তি।

একজন আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী এটিকে ফেসবুক অ্যাডিকশন ডিস-অর্ডার বলে অভিহিত করেছেন। কোনো কোনো গবেষক ফেসবুক আসক্তিকে কোকেনের আসক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন। লক্ষ্য রাখতে হবে যে ফেসবুকের সময় যাতে আমাদের খেয়ে ফেলতে না পারে, বরং ফেসবুকে খুব কম ও প্রডাক্টিভ সময় দিয়ে এখান থেকে কত ইতিবাচকভাবে বেশি সুবিধা আদায় করে নিতে পারি, এ বিষয়ে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।

সম্প্রতি আমাদের দেশে ফেসবুকের ইতিবাচক ব্যবহার চোখে পড়ছে। রূপপুরের বালিশ চুরির ঘটনায় মানুষ প্রতিবাদী হয়েছে। ঘটনাটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।

সরকার এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এখন দেখার অপেক্ষা এর বিচার জনগণ পাবে কিনা? ফেসবুকের মাধ্যমে মানুষ সততার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। সৎ মানুষরা আগে নিজেদের একাকী মনে করলেও জনগণের শক্তি যে তাদের সঙ্গে আছে এটা এবার প্রমাণ হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ করতে গিয়ে জনগণ মনে করেছে একজন সরকারি কর্মচারী পুরস্কৃত হওয়ার পরিবর্তে তিরস্কৃত হতে যাচ্ছে। তখন জনগণ এটা ফেসবুকে ভাইরাল করে প্রতিবাদ করেছে। কেউ কেউ বলেছে নিয়ম অনুযায়ী বদলির আদেশ হয়েছে। কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক এর থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মানুষ সৎ মানুষদের পক্ষ নিয়েছে। এখন মনে হচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার শক্তির সঙ্গে আজ যুক্ত হয়েছে জনগণের শক্তি। জয় আসবেই।

বিভিন্ন জনের টাইমলাইনে কয়েকটা লাইন চোখে পড়ছে: ‘দুদকের চেয়ারম্যান মুনীর চৌধুরী গেল।/বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যানও গেল।/স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীও গেল।/ এয়ারপোর্ট ম্যাজিস্ট্রেট বানসুরী ইউসুফ ভাইও গেল। এবার গেল শাহরিয়ার ভাই...’

বিষয়গুলো ভাবিয়েছে। সত্য মিথ্যা জানি না তবে এটা বুঝেছি মানুষ আর দুর্নীতি চায় না। মানুষ এখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। কারণ সবার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।

অনেকেই এখন ফেসবুকে দুর্নীতিবিরোধী পেজ খুলতে চাচ্ছে। তবে এতে সতর্কতা অবলম্বনের বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। দুদক এই বিষয়ে জনগণকে একটা ধারণা বা নীতিমালা তৈরি করে দিতে পারে।

দুদকের ফেসবুকে নিজেস্ব পেজ আছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের চেষ্টারও ত্রুটি নেই। দীর্ঘদিনের আবর্জনা। তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে একদিনে তা হয়তো দূর করা যাবে না। কারণ শর্ষের ভেতরেও ভূত আছে। সৎ মানুষরা দুদকে দুর্নীতির অনেক বিষয় ডকুমেন্টসহ জানাতে চায়। কিন্তু ভয় একটাই। সেখানেও দুর্নীতিবাজরা অদৃশ্য শক্তি গড়ে তুলেছে কিনা?

আমার সোজা-সাপ্টা কথা দুদকের পেজে সাধারণ জনগণ যাতে সহজেই দুর্নীতির বিষয়গুলো ডকুমেন্টসহ প্রকাশ করতে পারে। কারো নাম থাকবে না, দুদকের পেজে এর এডমিন্সট্রেটরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে এটা প্রকাশ ও প্রচার করবে।

মনোবিজ্ঞান বলছে, লোক লজ্জার ভয়ে দুর্নীতিবাজদের মনে ভীতি তৈরি হবে আর এভাবে করেই দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে দেশ মুক্ত হবে। বড় বড় দুর্নীতিবাজদের ভাইরাল ফোবিয়া ধরিয়ে দমন করতে হবে যতই ক্ষমতাবান হন না তারা। তাদের অবৈধ ক্ষমতার শেকড় টেনে বের করে আনতে হবে।

জনগণ আজ জেগেছে। সঙ্গে আছেন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের স্বাধীনতা দিবসের এক ভাষণে এই বলে যে একাত্তরের মতো প্রতিটি ঘরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। ভয় নেই, বিশ্বাস আর স্বপ্ন আমাদের আছে। সবশেষে একটা কথাই বলব দুদক যদি জনগণের এই ইতিবাচক শক্তিকে ব্যবহার করতে পারে, তবে এদেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল হবেই হবে।

- লেখক: শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট ও লেখক ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

মানবকণ্ঠ/এএম

 



Loading...
ads


Loading...