দুর্নীতি কি বালিশ থেকে টয়লেট টিস্যু পর্যন্ত পৌঁছাবে?



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৩ জুন ২০১৯, ১৫:১৮

বালিশের দাম ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। ৩০টি চাদর আনতে একটা ট্রাক ভাড়া করা হয়েছে ৩০ হাজার টাকায়। কম্বল, লেপ আনার জন্যও ৩০ হাজার টাকায় ট্রাক ভাড়া করা হয়েছে। প্রতিটি চাদর নিচ থেকে খাটে তোলার জন্য খরচ দেখানো হয়েছে ৯৩১ টাকা।

এত সব করা হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আবাসিক ভবনের কেনাকাটায়। সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় এমনই সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র : কেনাকাটায় অভিনব দুর্নীতি’।

দুর্নীতি কিন্তু নতুন কোনো বিষয় নয় এদেশে। বরং দুর্নীতির কারুকাজময় রূপ আর শোভা প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান হয় দিন যতই সামনের দিকে এগোয়। দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার ও কার্যকারিতায় বিশ্বে শীর্ষস্থানে ঠাঁই নিয়েছে দেশটি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বহু গবেষণায় সেই তথ্যই উঠে এসেছে, যা বারবারই প্রত্যাখিত হয়েছে সরকার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কর্তৃক। কর্তৃপক্ষ মেনে নিতে চায়নি গবেষণার তথ্য প্রতিবেদন। উপরন্তু গবেষকদের সমালোচনা করেছে। মনোভাব পোষণ করেছে এমন যে, বন্ধু নয়, এই গবেষক গোষ্ঠী মূলত সরকারের শত্রু।

এই সংকীর্ণ মনোভাব দুর্নীতিকে সহজ করে দিয়েছে। ফলে বিভিন্ন কায়দা কৌশলে দুর্নীতি বেড়েছে।

জনগণকে এসব দুর্নীতি নীরবে দেখতে হয়, নির্মম শিকার হতে হয়। যারা দুর্নীতি করেন, তারা কিন্তু দুর্নীতির কুফল ভোগ করেন না। কুফল ভোগ করেন সাধারণ জনগণ। কারণ জনগণের টাকায় দেশ পরিচালিত হয়। সরকার টাকা পয়দা করেন না। বরং সরকারের টাকার আবাদ হয় জনগণের শ্রমের জমিনে। দেশ পরিপাটি হয়। যাই হোক এদেশে দুর্নীতি রোধে একটা কমিশন আছে। কমিশনের নাম দুদক। দুর্নীতি দমন করতেই এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম। বেশ যত্নে, মনোযোগে, সক্রিয়তায় বলা যায় দুদক যৌবনে পদার্পণ করেছে।

তাকে বেশ তৎপর দেখা যায়। দুদকের ভয়ে অনেকেই তটস্থ থাকেন, তেমনটাই শুনতে পাই, দেখিও। আমরা তা দেখতেও পাই প্রচারমাধ্যমের বদৌলতে। এমন একটি কমিশন থাকতে কোথাও দুর্নীতির ঘটনা ঘটবে, তেমনটা বিশ্বাস করতে মন মানতে চায় না। যাই হোক, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কেনাকাটায় অভিনব দুর্নীতির ঘটনায় নিঃসন্দেহে অভিনবত্ব আছে। হ্যান্ডসামও বটে। আকাশকে পাতালে টেনে আনার ক্ষমতা, বুদ্ধি তো আর সবার হয় না।

চৌকস নির্লজ্জতাও লাগে। স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে দুর্নীতি নিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্বস্তি রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন, সেখানে দুর্নীতি করতে কেউ ধৃষ্টতা দেখাবেন, ভাবতে পারি না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথায় পরিষ্কার হয় যে, তিনিও বিরক্ত, বিব্রত দুর্নীতি নিয়ে। মোটেও খুশি নন। তাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি প্রথম সভায় সেই কথা উল্লেখ করেছেন, হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন তাঁর সরকারযন্ত্রকে। আমরাও আশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা করেছি, যাক বাঁচা গেল - ভেবে। অন্তত সরকার প্রধানের হুঁশিয়ারিতে সবাই ভীত হবেন, তটস্থ হবেন, এটা তো আশা করতেই পারি, তাই না ?

অন্তত দুর্নীতিবাজরা এবার ক্ষান্ত দেবেন, নতুন করে আর কেউ দুর্নীতি করবেন না, সাহস দেখাবেন না, এটাই ছিল সাফ হিসাব। ফলে ভেবেছি যে, এবার নিশ্চয়ই দুর্নীতির কপালে দুর্ভোগ থাকবে। দুর্নীতিগ্রস্তরা নিশ্চিত বদলে যাবেন, সংশোধন হবেন।

কিন্তু কী হলো ? কে কার কথা শোনেন, সেটাও তো কথা। আদৌ কী শোনেন, সেও প্রশ্ন। দীর্ঘদিনের অভ্যাস, অভ্যস্থতা, খাসলত এ তো সহজে কী বদলানোর উপায় আছে ? না দূর করার মানসিকতা আছে? সম্ভবত নয়। আর তাই তো মাদকের বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, ক্রসফায়ার থাকা সত্ত্বেও মাদকব্যবসা, মাদকব্যবহার বন্ধ হচ্ছে না। দিব্যি অব্যাহত আছে। বরং রাজনৈতিক দলের, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্যও আছেন এই অবৈধ কার্যকলাপে জড়িয়ে। আবার সরকারের ভেতর থেকে সরকার প্রধানের শাসন মনে রাখবেন না, তাও বা কী করে হয় ! হয়তো মানছেন ঠিকই এবং তা তোষামদে, অনুষ্ঠান-আয়োজনে, প্রদর্শনে।

অথচ কার্যত থাকছেন সরকার প্রধানের নির্দেশ ও আদর্শের বিপরীতে। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! অনেক অংক কষে সাধারণ মানুষ ভেবে নেন যে, সরকারের ভেতরেই মূলত সরকারবিরোধী শক্তি সজাগ, সক্রিয়। উঁইপোকার মতো খেয়ে ফেলছে সব। সরকারপ্রধান টের পাচ্ছেন না সম্ভবত। তাকে টের পেতে দিচ্ছে না একটা সংঘবদ্ধচক্র। যারা চাইছে না নিজেদেরকে স্বার্থের বাইরে রেখে দেশের কল্যাণ করতে। বরং এই গোষ্ঠীর কাছে দেশের স্বার্থ নগণ্য, ব্যক্তি-গোষ্ঠী স্বার্থ মুখ্য। তাই কী? নতুবা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সতর্কীকরণের পরও কেন অনিয়ম হয়, হচ্ছে? খুব সহজ একটা প্রশ্ন, কেন অনিয়ম করার সাহস পাচ্ছেন কেউ কেউ? জরুরিভিত্তিতে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে বৈকি। দেখবেন কে, সবচাইতে বড় প্রশ্ন সেটাও।

কেনাকাটায় দুর্নীতি বোধহয় সরকারের সব দফতরেই কমবেশি হয়। নতুন চর্চা নয়। সরকারের অভ্যন্তরে কমবেশি সবাই তা জানেন বলে আমার বিশ্বাস। প্রশাসন ও আমলাদের কথা বাদই দিলাম। সরকারের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সহায়-সম্পদ, ব্যাংক-ব্যালেন্স, জীবন-যাপন প্রণালি পর্যবেক্ষণ করলে দুর্নীতির মাত্রা, ধরন ও কৌশল আঁচ করা যায়। তারা বড় দুর্নীতিবাজদের কতটা অনুসারী, তাও পরিষ্কার বুঝা যায়। এই তো কিছুদিন আগে পত্রিকায় প্রকাশিত হলো
একজন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা কোটি টাকার দামের গাড়ি ব্যবহার করছেন এবং যার জ্বালানি বিল লাখ লাখ টাকা। কী করে সম্ভব, এমন প্রশ্ন কিন্তু অহেতুক। কারণ তিনি তো আর লোকচক্ষুর আড়ালে দফতরের কোটি টাকার গাড়ি ব্যবহার করেননি। বরং দিব্যি সবার সামনে গাড়ি হাঁকিয়ে বেরিয়েছেন। নিশ্চিত তার একটি রাজনৈতিক দাপট ছিল। এসব কিন্তু মামুলি ব্যাপার। তবে অভিনব বলতেই হয় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আবাসিক ভবনের বালিশ, চাদর, কম্বল নিয়ে দুর্নীতির বিষয়টি। পারমাণবিক চুল্লীর মতো জ্বলে উঠল যেন এই সংবাদ। সাধারণত যারা দুর্নীতিগ্রস্ত, তারা ভেবেই নেন যে, পেটেভাতে বেঁচে থাকার সাধারণ জনগণ নেহায়েত বোকা, অশিক্ষিত। জীবনযুদ্ধ এদের বেশি কিছু শেখাতে পড়াতে পারে না। অন্তত দুর্নীতিবাজদের অশিক্ষিত নির্লজ্জ আচরণ বুঝবার ন্যূনতম বোধ নিশ্চিত এদের নেই। আর তাই বালিশের দরদাম দেখে জনগণ নিশ্চয়ই ভেবে নেবেন যে, বালিশগুলো বিজ্ঞানসম্মতভাবে তৈরি। অনেকটা মহাকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে যে স্যাটেলাইট, তারই মতো। সাধারণ মানুষের দৃষ্টির সীমানার বাইরে ওসবের অবস্থান। আর তাই সাধারণ মানুষ ওসব দেখবার, স্পর্শ করবার ক্ষমতা রাখেন না। দরদামও জানেন না। তাদের মাথার নিচে ওসবের জায়গা হওয়াটাও দূরাশা। তাই কল্পনায় থাকে ওসব।

অতএব উল্টাপাল্টা দাম লিখে অর্থ আত্মসাতের সমূহ সুযোগ যথেষ্ট এখানে। সুযোগ হাতছাড়াই বা করবেন কেন পরামাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লোকজন। পারমাণবিক বললেই তো বিশাল ব্যাপার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাই তার আবাসিক ভবনের বালিশও তো বিশালই হবে। আবার ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে কথা। মানুষের মুখে মুখে উঠতে-বসতে ডিজিটাল উচ্চারিত হয়। কজনই বা বুঝেন ডিজিটাল আদতে কী।

কাজেই মন যা চেয়েছে, তাই করা হয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আবাসিক ভবনে। কিন্তু এই বালিশের কথা শুনে সাধারণ মানুষের বিস্ময় তো আর কাটে না, কথা তো আর থামে না। যারা পথেঘাটে, ফুটপাতে ইটের উপর মাথা রেখে ঘুমান কিংবা তুলা ও ফোমের বালিশে মাথা রেখে রাত্রি পার করেন, তাদের কাছে রীতিমত বিস্ময় এই পারমাণবিক বালিশ। বালিশ, চাদর, কম্বল কেলেঙ্কারি তদন্তে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় দুটো কমিটি গঠন করেছে বলে জানা গেছে। একজন প্রকৌশলীকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে। বেশ ভালো কথা।

তদন্ত তো হতেই হবে। হওয়া উচিৎ। জনগণের টাকা দিয়ে তো বালিশ কেলেঙ্কারি হতে পারে না। এতদিন নানাবিধ বিষয়, বস্তু নিয়ে কেলেঙ্কারি হয়েছে, বালিশ, চাদর নিয়ে তো নয়। কাজেই উদ্ভট, আজব ঘটনা দিয়ে কর্তৃপক্ষের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে দিলে ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার আর উপায় থাকে কী, তাই না ? আর দেশে তো আইন ও তদন্ত কার্যক্রমের কোনো ঘাটতি নেই। ধর্ষণের তদন্ত হয়, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত হয়, চুরি-ডাকাতির তদন্ত হয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্ত হয়, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, স্বার্থ লঙ্ঘিত হলে তদন্ত হয়। কটা তদন্তে বিচারিক কাজ ত্বরান্বিত ও শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে কিংবা কটা তদন্ত কাজ নির্বিঘ্নে, অরাজনৈতিকভাবে সম্পন্ন হতে পেরেছে, এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর সম্ভবত অনেকেই দিতে পারবেন না।

সেটা না দিতে পারাটাও কিন্তু চরম ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার দায় সততার সঙ্গে কে নেবেন, নেয়া উচিত, যদি এই প্রশ্নের একটা সঠিক জবাব প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তাহলে বালিশ নিয়ে কেলেঙ্কারির সুযোগ হবে না। নতুবা আগামীতে টয়লেট টিস্যু নিয়েও কেলেঙ্কারির সুযোগ থেকে যাবে। কারণ, দুর্নীতিবাজরা সর্বভুক প্রাণী, মনে রাখতে হবে।

পরিশেষে বলি, অপরাধীর বিচার তৎক্ষণাৎ হওয়া বাঞ্ছনীয় অপরাধ প্রক্রিয়াকে নির্মূল করার স্বার্থে। দীর্ঘসূত্রিতা একটা ছাড় দেবার কৌশল মাত্র। অনেক স্বার্থান্বেষী মহল এই কৌশল অবলম্বন করে গোটা সমাজকে গ্রাস করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দুর্নীতিবাজদের দেশদ্রোহী বলে একটা ঘোষণা দিন তো! - লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...