প্রকৃতির শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা



আমরা সাধারণত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্য-পুস্তকের জ্ঞানকে শিক্ষা বলে থাকি। অর্থাৎ যে সব ব্যক্তির অক্ষর জ্ঞান আছে তাদের আমরা শিক্ষিত বলি এবং যারা স্কুল-কলেজে লেখা পড়া করে না তাদেরকে অশিক্ষিত বলে থাকি। এরূপ ধারণাকে শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কারণ এরূপ ধারণা শিক্ষার অর্থকে সীমিত করে। ব্যাপক অর্থে শিক্ষা বলতে আমরা বুঝি অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের ফলে ব্যক্তি আচরণে অপেক্ষাকৃত স্থায়ী পরিবর্তন। শিক্ষা একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি জন্ম থেকে মৃত্য পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করে। যেমন- পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন প্রতিদিনের ঘটনা প্রবাহ, সমাজ, পরিবেশ এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ব্যক্তি জ্ঞান লাভ করে। শিক্ষার ফলে ব্যক্তি আচরণে উন্নতি ঘটে, ব্যক্তি নির্ভুলভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে পারে। সমাজে বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন করে চলতে পারে।

বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে চলতে পারে। আমরা সবাই চাই আমাদের সন্তানরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পরিবার, সমাজ, দেশ তথা বিশ্বের সব মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করুক এবং সার্থক জীবন গঠন করুক। আমরা যারা আমাদের সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে অতিমাত্রায় উদ্বিগ্ন, এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আমরা আমাদের সন্তানদেরকে যে শিক্ষার পরিবেশ দেয়ার প্রয়োজন সে পরিবেশ দিতে পেরেছি কিংবা কতটুকু সম্ভব হচ্ছে? আমরা যারা শহরের পরিবেশে বসবাস করি প্রকৃতির শিক্ষা থেকে তাদেরকে অনেকটাই দূরে রেখেছি।

ইট পাথরে গড়া এই যান্ত্রিক পরিবেশে আমরা তাদের যান্ত্রিক মানবে পরিণত করছি। আমরা তাদের বন্দি খাঁচায় ডানা কাটা পাখির মতো বন্দি করে রেখেছি। বন্দি পাখির যেমন একটি আকুতি থাকে মুক্ত আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে আর মনের সুখে গান গাইতে। তেমনি প্রতিটি শিশুর ইচ্ছা থাকে তাকে বিশাল আকাশের নিচে মুক্ত পরিবেশে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে গান গাইতে, দৌড়া দৌড়ি করতে। এটা তার বয়সের চাহিদা। আমরা মা-বাবারা তা বুঝতে চেষ্টা করি না। বুঝলেও তাদের মতামতের কোনো গুরুত্ব দিই না। আমরা আমাদের আভিজাত্য, বংশ পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের কথা ভেবে আমরা এমন সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের সন্তাদেরকে কথিত ভালো স্কুলে পড়াতে হবে, এ প্লাস পাওয়াতে হবে, আমার সন্তানকে আমার পাশের বাসার আপা কিংবা ভাবির বাচ্চার থেকে ভালো রেজাল্ট করাতে হবে।

এ যেন বিশাল প্রতিযোগিতার সম্মুখীন আমরা। তার ইচ্ছা, আশা আকাক্সক্ষার কোনো গুরুত্বই আমাদের কাছে নেই। তাকে সারাক্ষণ শুধু পড়ালেখার মধ্যে আটকে রাখতে চাই। এদিকে স্কুলে শিক্ষকের হোম ওয়ার্ক, এ পরীক্ষা, সে পরীক্ষা, রাতে তারা ঠিকমতো ঘুমাতেও পারে না। সারাক্ষণ তারা অস্থিরতার মধ্যে দিন অতিবাহিত করে। একটি শিশু সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করার জন্য কমপক্ষে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। অনেক শিশু আছে যারা ৬ ঘণ্টাও ঘুমাতে পারে না। তাদের সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। নেই খেলাধুলার কোনো সুযোগ। তারা মানসিকভাবে সারাক্ষণ চাপের মধ্যে থাকে। বর্তমানে আমাদের দেশে শতকরা ৩৪ ভাগ মানুষ মানসিক রোগে ভোগে। তার মধ্যে ১৮% শিশু বিভিন্নভাবে মানসিক রোগে ভুগছে।

আমরা আমাদের সন্তানদের কোনো মানসিক রোগীতে পরিণত করছি কিনা? সত্যিই ভাবার বিষয়। আসুন আমরা আমাদের সন্তানদের পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার পাশাপাশি তাদের প্রকৃতির শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলি। প্রকৃতির কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে, অনেক কিছু জানার আছে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ রকম আরো অনেক মনীষী ব্যক্তি আছেন যাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তারা প্রকৃতির কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন। তারা দেশকে দেশের মানুষকে অনেক কিছু দিয়েছেন। আমরা আমাদের সন্তানকে প্রকৃতির মাঝে ছেড়ে দেই, প্রকৃতির সঙ্গে একাকার হওয়ার সুযোগ দেই।

প্রকৃতির শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা, বাস্তবধর্মী শিক্ষা, আদর্শ ও মৌলিক শিক্ষা । সে শিক্ষা আমাদের পথ চলতে পাথেয় হবে। কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার সৎ সাহস জোগাবে। দুঃখ কষ্টকে হাসি মুখে বরণ করে নিতে শিখবে। ভয়কে জয় করার উদ্যম সাহস নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। জীবনের প্রকৃত মানে বুঝতে পারবে, জীবনকে উপভোগ করতে পারবে, জীবন হয়ে উঠবে সার্থক, প্রাণবন্ত। - লেখক: এডুকেশনাল সাইকোলজি অ্যান্ড কাউন্সেলিং ( আই ই আর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 



Loading...


Loading...