পিতার যোগ্য উত্তরসূরি বঙ্গবন্ধু কন্যা



বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবেন বলে যিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। সোনার বাংলা গড়বেন বলে যিনি হাজার বছরের শোষণ ও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙেছেন। যিনি বাঙালি জাতিকে বীরের জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে অধিষ্ঠিত করেছেন। যার ডাকে পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগণ জীবন বাজি রেখে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, প্রতিষ্ঠা করেছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তিনি আর কেউ নন মধুমতি আর বাঘিয়ার নদীর তীরে বাংলার হাওড়-বাঁওড়ের অবারিত প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিশোর, বাঙালি জাতির প্রাণভোমরা, মহাকালের মহাপুরুষ, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, মহান স্বাধীনতার স্থপতি, বিশ্ব নন্দিত নেতা, বাংলার রাখাল রাজা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জাতির পিতা যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই পাক হায়েনাদের প্রেতাত্মারা স্বাধীনতা সংগ্রামের এই মহানায়কের রক্তে বাংলার মাটিকে রঞ্জিত করে বাঙালি জাতির ললাটে চিরদিনের জন্য কলঙ্কের টিকা এঁকে দেয়। ’৭৫-এর পরবর্তী জাতির পিতাকে হারিয়ে পুরো বাঙালি জাতি যখন দিশেহারা ঠিক তখনই বাঙালি জাতির হাল ধরেন বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা।

বিদেশের মাটি থেকে দেশে ফিরে বিমানবন্দরে লাখো জনতার উদ্দেশে স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর বঙ্গবন্ধুকন্যা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, ‘বাংলার দুঃখী মানুষের সেবায় আমি আমার এ জীবন দান করতে চাই। আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ছোটভাই রাসেলসহ সবাইকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আপনাদের মাঝেই তাদের ফিরে পেতে চাই।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো অপশক্তির কাছে কখনো আত্মসমর্পণ করেননি; মাথানত করেননি। তাঁর সুযোগ্যকন্যা শেখ হাসিনা হাজারো প্রতিবন্ধকতায় কোনো অপশক্তির কাছেই আত্মসমর্পণ করেননি; মাথানত করেননি। জাতির পিতার মতোই বাংলা সাধারণ দুঃখী মানুষের অগাধ ভালোবাসায় সিক্ত শেখ হাসিনা এখন এশিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেত্রী। শত বাধা-বিপত্তি এবং হত্যার হুমকিসহ নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে এক সময়ের ভঙ্গুর অর্থনীতির বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নে অপ্রতিরোধ্য। শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ পেয়েছে নিম্ন আয়ের অর্থনীতি থেকে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা।

পিতা-মাতা ও পরিবার-পরিজন হারিয়ে নিঃস্ব গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার অতি সাধারণ মেয়েটি আজ সারা বিশ্বের কাছে হয়ে উঠেছে অন্যন্য অসাধারণ। প্রিয় নেত্রীর সুদীর্ঘ এই পথচলা মোটেই মসৃণ ছিল না, ছিল কণ্টকাকীর্ণ। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৯ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি পর্যায়ে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছে আরো অন্তত পাঁচ দফায়। শুধু ঢাকাতেই প্রিয় নেত্রীর ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয় সাতবার। এর মধ্যে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর সচিবালয়ের সামনে তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। তখন গুলির আঘাতে প্রাণ হারায় যুবলীগ কর্মী নূর হোসেন। ’৮৯ সালের ১১ আগস্ট ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে হামলা করা হয়।

আমার প্রিয় নেত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে ’৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উপ-নির্বাচন চলাকালে রাজধানীর গ্রিন রোডে ও ’৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর ধানমণ্ডির রাসেল স্কোয়ারে জনসমাবেশে গুলিবর্ষণ করা হয়। এরপর ’৯৬ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বক্তৃতা দেয়ার সময় মাইক্রোবাস থেকে সভামঞ্চ লক্ষ্য করে গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়। ২০১৫ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভায় যাওয়ার পথে কাওরান বাজারে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। আর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালানো হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে। যুদ্ধক্ষেত্রে যে আর্জেস গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়, সেই গ্রেনেড দিয়ে সেদিন হামলা চালানো হয় আমার প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর। ইতিহাসের বর্বরোচিত ওই গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ নিহত হন আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী। দলীয় নেতারা সেদিন মানবঢাল রচনা করে রক্ষা করেন আমার প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে। এর আগেও চট্টগ্রামে লালদীঘির ময়দান ও গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়। জীবনের মায়া ত্যাগ করে আমার প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা বাংলার দুঃখী মানুষের সেবায় আত্মোৎসর্গ করেছেন।

শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ আজ একটি সম্মানজনক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা আর কূটনৈতিক দক্ষতার কারণে বিশ্ব মিডিয়া ও বিশ্বের প্রভাবশালী সাময়িকীগুলোতে নানাভাবে আলোচিত আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার চিন্তাশীল ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চিন্তাশীলতায় অনন্য বঙ্গবন্ধু তনয়া। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দ্য ফরেন পলিসি’ বিশ্বের সেরা চিন্তাবিদদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত শেখ হাসিনাকে ‘প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা’ ক্যাটাগরিতে সেরা ১০ চিন্তাবিদের তালিকায় রেখেছে তারা।

মার্কিন প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বসের বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ১০০ নারীর তালিকায় ২৬তম স্থানে রয়েছেন আমার প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৮ সালে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের করা বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনাকে ‘নারী অধিকারের স্তম্ভ’ বলেছেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নমন্ত্রী মেরি ক্লড বিবেউ। ‘মানবিক বিশ্বের প্রধান নেতা’ বলেছে অক্সফোর্ড নেটওয়ার্ক অব পিস নামক একটি সংস্থা। শ্রীলঙ্কার গার্ডিয়ান পত্রিকা তুলনা করেছে ‘জোয়ান অব আর্ক’-এর সঙ্গে। লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশে আশ্রয় দিয়ে বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা এখন সারা বিশ্বের কাছে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবতার জননী’।

নাইজেরিয়ার প্রভাবশালী দৈনিক ডেইলি লিডারশিপ বলছে, বিশ্বের সেরা পাঁচ নীতিমান নেতার একজন হলেন প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি বাংলাদেশের চার বারের প্রধানমন্ত্রীকে এমন বিশেষণে অভিহিত করেছে নাইজেরিয়ার প্রভাবশালী দৈনিক ডেইলি লিডারশিপ। ডেইলি লিডারশিপের ওই প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার সাদামাটা জীবনযাপনের কথা বলা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর মাসিক বেতন আনুমানিক ৮০০ মার্কিন ডলার। পত্রিকাটি বলছে, শেখ হাসিনার সবচেয়ে অসামান্য দুটি অর্জন রয়েছে। যার একটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূমিকা এবং অন্যটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারী ও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধকারীদের বিচারের সাফল্য।

বর্তমান বিশ্বে এশিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেত্রী হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এশিয়ার চীন, হংকং, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের পাঁচ রাজনৈতিক নারী-নেত্রীর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে স্বনামধন্য ও আন্তর্জাতিক টিভি চ্যানেল ডিসকভারি ডিকোড একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘এশিয়ান ফাইভ মোস্ট পাওয়ার ফুল উইমেন ইন পলিটিক্স’ শীর্ষক সচিত্র প্রতিবেদনটিতে এশিয়ার নারী-নেত্রীদের মধ্যে শেখ হাসিনাকে তালিকার প্রথমেই স্থান দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা এখন বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি নারী সরকারপ্রধান। এতদিন নারী সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের বর্তমান তালিকায় শীর্ষে ছিলেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। জার্মান চ্যান্সেলরকে টপকে বর্তমান তালিকায় শীর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৫ সালের ২২ নভেম্বর দায়িত্ব নিয়ে, প্রায় ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একইভাবে টপকে গেলেন ব্রিটিশ লৌহমানবী মার্গারেট থ্যাচারকে। থ্যাচার ৪ মে ১৯৭৯ থেকে ২৮ নভেম্বর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ১১ বছর ২০৮ দিন দায়িত্বে ছিলেন।

জাতির জনকের সুযোগ্য তনয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সারাবিশ্বের কাছে অপার এক বিস্ময়ের নাম। দেশে নারীদের ক্ষমতায়নে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছেন শেখ হাসিনা। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য বিষয়ক ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে চারটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের সবার ওপরে স্থান পেয়েছে। আর নারী-পুরুষের সমতার দিক দিয়ে বাংলাদেশের স্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সব দেশের ওপরে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানরা।

লেবার পার্টির সিনিয়র এমপি জিম ফিটজপ্যাট্রিকস বলেন, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য আদর্শ। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নকে ‘সোনালি অগ্রগতি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্য দেশগুলো বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এছাড়াও ২০১৮ সালে শেখ হাসিনার অপ্রতিরোধ্য নেতৃত্বের নতুন অর্জন ‘গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’। বাংলাদেশ এবং এশিয়া ও এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাঁর নেতৃত্বে নারী শিক্ষা ও নারী উদ্যোক্তার বিকাশমানতার জন্য তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার লাভ করেন। জাতির পিতার স্নেহ ধন্য, গণতন্ত্রের মানসকন্যা, বাংলার আঁধারতাড়িনী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশ আজ গর্বিত। নারী উন্নয়ন-ক্ষমতায়ানের প্রতিকৃতি, বিশ্বের সফল রাষ্ট্রনায়কের অগ্রগণ্য নেত্রী, বিশ্বনেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি জানাই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। জয় হোক মেহনতি মানুষের, জয় হোক জননেত্রী শেখ হাসিনার।
- লেখক: সাবেক সদস্য, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/এফএইচ



Loading...


Loading...