রাজনীতির লুপ কাট



বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটানা দশ বছর ক্ষমতায় আছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আছে দলটি। একটি দেশে গণতান্ত্রিক ধারার যে সুফল, সেটা আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ে পাচ্ছে বাংলাদেশের জনগণ।

ভোটে নির্বাচিত হয়ে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেয়ার যে দায়িত্ব থাকে, সেটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ গণতন্ত্রের মুনাফা। তার সঙ্গে বাঙালিকে পরিচয় করিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন করার মধ্য দিয়ে আর আজকের এই দিনে আত্ম-সামাজিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক মুনাফার ধারণাকে সত্য প্রমাণ করেছেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা।

অসম্ভবকে হার মানিয়ে, প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশে। রেললাইনসহ পদ্মা সেতু নির্মাণ, মেট্রোরেল, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চলছে তার নেতৃত্বে।

এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু-কন্যা বাংলাদেশের জনগণকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছেন যে সঠিক নেতৃত্ব, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব। বাঙালির মনস্তত্ত্বে এসেছে চিরস্থায়ী পরিবর্তন।

এখানেই বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার কৃতিত্ব। তিনিই নেতৃত্ব দেন, স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন দেখান এবং তা বাস্তবায়ন করেন বাংলাদেশের জন্য। শুধু তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সন্দেহাতীতভাবে এই উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ধারা অভূতপূর্ব।

তবে শত অর্জনের পরও আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে তার রাজনীতির জায়গায় প্রতিনিয়ত দুটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রথমত, বাংলাদেশে দুইটি রাজনৈতিক স্রোতধারা বিরাজমান। একটি হলো আওয়ামী রাজনৈতিক স্রোতধারা এবং অন্যটি আওয়ামী বিরোধী রাজনৈতিক স্রোতধারা। এমতাবস্থায়, আওয়ামীবিরোধী যে স্রোতধারা, তা বিশ্বাসের জায়গায় কতটা দুর্বল হয়েছে, সেটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। দ্বিতীয়ত, আপাতদৃষ্টিতে সবাই এখন ‘আওয়ামী লীগ’। এখানে আবার দু’টি ধারা।

প্রথম ধারায় আছেন যিনি, তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করেন মনেপ্রাণে, আওয়ামী লীগকে ধারণ করেন এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্য নিখাদ ভালোবাসা ও আনুগত্য রেখেই দল করে যান। দ্বিতীয় ধারায় আছেন তারা, যারা নীতিগতভাবে ও মাঠে-ময়দানে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করে এসেছেন কিন্তু বর্তমানে মুখোশ বদলে মৌলিকভাবে পরিবর্তিত না হয়েই এখন আওয়ামী লীগ করছেন। এই দ্বিতীয় ধারাটি বিশ্বাসের জায়গা থেকে না হলেও সুযোগের জায়গা থেকে চৌকস। প্রথম ধারার আওয়ামী লীগের ভালো কাজের জন্য যেমন দলটির প্রশংসিত হওয়ার কথা, ঠিক একইভাবে দ্বিতীয় ধারার সুবিধাভোগী মনোভাব ও বিতর্কিত অপকর্মের দায় আওয়ামী লীগকে অনেক সময় নিতে হয়েছে, হচ্ছে এবং হবেও।

রিয়েলিটি চেক (নিজেকে চিমটি দিয়ে দেখা দরকার) এখনো আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক স্রোতধারার মূল ব্যক্তিরা খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও জামায়াতের গোষ্ঠী হিসেবে টিকে আছে। ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের নায়ক-নায়িকাদের নাম এবং এই রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রাকৃতিক জনবান্ধব পন্থায় বিলীন করে বিকল্প স্রোতধারা তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু বোধকরি কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার কারণে আজও এই দেশবিরোধী, বিরোধী রাজনৈতিক স্রোতধারার বিকল্প আরেকটি ছায়া স্রোতধারা তৈরি হতে দেয়া হয়নি। দেশ, রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণে সবার চিন্তাভাবনা ও নীতিমালা একই হবে, তা হয়তোবা বাস্তববাদী চিন্তা নয়। এক্ষেত্রে আমাদের ইউটপিয়ান হওয়ার সুযোগ নেই। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে আর যাই হোক, এই সময়ে এই প্রজন্মের যদি কোনো রাজনৈতিক দল আসে, সে দলগুলোর প্রারম্ভিক ঘোষণাগুলোর মাঝে যা আসবে অবশ্যম্ভাবীভাবে, তা হলো বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা, ৩০ লাখ শহীদ এবং ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল।

বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে যদি কেউ রাজনৈতিক দল গঠন করে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চান, তবে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া অনাগত শত বছরের রাজনীতি ও দেশের জন্য সুন্দর ও মঙ্গলকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। আজকের বিএনপি দুর্বল, প্রশ্নবিদ্ধ, অনৈতিক নেতৃত্ব, জামায়াতে ইসলামীর স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান; এমনকি সংস্কারের নামে জামায়াতের যে অংশ রাজনীতি করার চেষ্টা করছে, তা নিয়ে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার মাঝেই আছে দ্বিমত।

সম্প্রতি নতুন যে রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে গণমাধ্যমে জানা গেছে, সেই দলের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের প্রতি সম্মান দেখালেও আদালতের রায়ে চিহ্নিত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ‘শহীদ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের এমন নতুন চেষ্টাকে নতুন বোতলে পুরনো মদ বলে মনে করছি।

কারণ, যারা বাংলাদেশের আদালতের রায়ে চিহ্নিত মানবতাবিরোধী অপরাধী (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস), তারা ও তাদের সমর্থক যারা তাদের শহীদ মনে করে তাদের বাংলাদেশের মাটিতে রাজনৈতিক কোনো অধিকার থাকতে পারে না। সবকিছু মিলিয়ে বিএনপি-জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও নীতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে অনেকেই। আর তাই সেই দ্বিমতকে পুঁজি করে বের হয়েও আসতে চায় এবং অযোগ্য নেতৃত্ব ও ধ্বংসের ধারা থেকে মুক্ত একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চায়।

কিন্তু বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তাদের সেই পথ রুদ্ধ হয়ে থাকায় তারা সেই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারছে না; যে প্ল্যাটফর্মটি হবে নিবন্ধনযোগ্য ও নির্বাচনমুখী। সেই প্রবাহ সৃষ্টিতে, দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে এখনো প্রতিবন্ধকতা আছে। এই ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে, নির্বাচন কমিশনের দেয়া নিবন্ধন-প্রক্রিয়ার বিধিমালাগুলোকে। আসুন একটু জেনে নিই, নির্বাচন কমিশনের রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালার ৬নং অংশে থাকা পয়েন্টগুলো, যা কোনও নতুন দলকে অবশ্যই দিতে হবে।

৬। দরখাস্তের সঙ্গে আবশ্যকীয় দলিল সংযুক্তিকরণ। বিধি-৪-এ উল্লিখিত দরখাস্তের সঙ্গে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে ওই দলের সাধারণ সম্পাদকের মাধ্যমে নিম্নলিখিত দলিল সংযুক্ত করতে হবে। যেমন: (ক) দলের গঠনতন্ত্র; (খ) দলের নির্বাচনি ইশতেহার, যদি থাকে; (গ) দলের বিধিমালা, যদি থাকে; (ঘ) দলের লোগো এবং পতাকার ছবি; (ঙ) দলের কেন্দ্রী নির্বাহী কমিটি বা সমমানের কমিটির সব সদস্যের পদবিসহ নামের তালিকা; (চ) দলের নামে রক্ষিত ব্যাংক-অ্যাকাউন্ট নম্বর ও ব্যাংকের নাম এবং উক্ত অ্যাকাউন্টের সর্বশেষ পরিস্থিতি; (ছ) দলের তহবিলের উৎসের বিবরণ; (জ) দলের নিবন্ধনের দরখাস্ত করিবার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুক‚লে প্রদত্ত ক্ষমতাপত্র; (ঝ) নিবন্ধন ফি বাবদ সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের বরাবরে জমাকৃত অফেরতযোগ্য টাকার ট্রেজারি চালানের কপি; (ঞ) (অ) বাংলাদেশ স্বাধীন হওবার পর হতে দরখাস্ত দাখিল করার তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের যেকোনো একটিতে দলীয় নির্বাচনী-প্রতীক নিয়ে কমপক্ষে একটি আসন লাভের সমর্থনে দলিল; অথবা (আ) বাংলাদেশ স্বাধীন হওবার পর হইতে দরখাস্ত দাখিল করিবার তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের যেকোনো একটিতে দরখাস্তকারী দল কর্তৃক নির্বাচনে অংশগ্রহণকৃত নির্বাচনী এলাকায় প্রদত্ত মোট ভোট সংখ্যার শতকরা পাঁচভাগ ভোট লাভের সমর্থনে কমিশন বা তদকর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক ইস্যুকৃত প্রত্যয়নপত্র; অথবা (ই) ‘দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ, উহা যে নামেই অভিহিত হউক না কেন, একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় দফতর, অন্যূন এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর জেলা দফতর এবং অন্যূওন একশতটি উপজেলা বা, ক্ষেত্রমতে, মেট্রোপলিটন থানায় কার্যকর দফতর এবং উক্তরূপ প্রতি উপজেলায় বা, ক্ষেত্রমতে, থানায় অন্যূন দুইশত ভোটার হিসেবে দলের তালিকাভুক্ত থাকিবার সমর্থনে প্রামাণিক দলিল।’ অর্থাৎ দলের নিবন্ধনের জন্য অন্যান্য শর্তের সঙ্গে এসব শর্ত ও পূরণ করতে হবে।

এটা কি নতুন কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে সম্ভব? বিএনপির অনেক সাবেক মন্ত্রী, এমপি বা তাদের পরিবারের সদস্যরা, এখন আর দলটির দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্বের সঙ্গে থাকতে চান না। তারা ক্ষুদ্র, মাঝারি বা বৃহৎ কোনো নতুন রাজনৈতিক স্রোতধারা সৃষ্টি করতেও পারছেন না। কারণ, রাজনীতির চেয়ে আমলাতান্ত্রিক হওয়াটা অনেক বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার জন্য। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আছে।

আজ তাকে যদি বলা হয়, তৃণমূল কংগ্রেসের নিবন্ধনের জন্য দেশের ১০০টি স্থানে রাজনৈতিক দলীয় অফিস এবং দুইশত ভোটারের সমর্থন লাগবে। তখন মমতা কি পারবেন তামিল নাড়ুতে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য ২০০ ভোট জোগাড় করতে? দেব গৌড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে তার রাজনৈতিক দলের কোনো অস্তিত্ব নেই। আমাদের মতো নিয়ম যদি তাদের দেশে থাকত, তবে দেব গৌড়ার পক্ষে কি সম্ভব হতো ক্ষমতায় যাওয়া? দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হলেন আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল। যদি তাকে বলা হতো নির্বাচনে দলের নিবন্ধনের জন্য গুজরাটেও তার দলের ভোট থাকতে হবে, তবে কি সেটা সম্ভব হতো? কংগ্রেস দীর্ঘদিন ভারতের রাজনীতিতে ক্ষমতায় ছিল কিন্তু সেখানে অন্যান্য রাজনৈতিক দলও ধীরে ধীরে এগিয়েছে।

যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে দেখি তবে সেখানেও দেখা যাবে দুই ক্ষমতাশালী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি বাদেও ভিন্ন ভিন্ন নাগরিক দাবি নিয়ে বিভিন্ন দল আছে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে লিবার্টারিয়ান পার্টি, যারা চ‚ড়ান্ত রকম ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে অথবা গ্রিন পার্টি; যাদের মূলমন্ত্র হলো স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি ও সংরক্ষণ। ইয়ুথ গ্রিন ককাস নামে এর একটি যুব শাখাও আছে। এই দলগুলোর গঠনতন্ত্র ভিন্ন হতে পারে কিন্তু এরা সবাই দেশের ইতিহাস মেনে দেশের জন্যেই রাজনীতি করে। আমি জন্ম থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকেই জীবন চলার পথে পাথেয় মনে করি।

আমৃত্যু তা করে যাব ভালোবাসার স্থান থেকেই। সেই ভালোবাসার স্থান থেকেই মনে করি, বাংলার কামার, কুমার, চাষি, তাঁতি, জেলে তাদেরও তো কোনো বিশেষ পরিস্থিতি থেকে নিজেদের একটা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন হতে পারে। উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে, যমুনা নদীর পাড়ে যে তাঁতিগোষ্ঠী আজ বিলীন হওয়ার পথে, তারা যদি আজ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন দিতে চান, তবে তারা কি সেটা পারবে না? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মভিত্তিক দলগুলো নিবন্ধন পাচ্ছে। এই দলগুলোর রাষ্ট্র চালানোর বিশ্বাসনির্ভর জায়গাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

অর্থাৎ সে বাংলাদেশের সংসদীয় পদ্ধতি বা গণতান্ত্রিক রীতির বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র চালানোর কথা বলে ও প্রচার করে। সংসদীয় নীতিতে যারা বিশ্বাসই করে না তাদের আমরা নিবন্ধন দিয়ে দিচ্ছি অথচ যারা খালেদা জিয়াকে মানতে চায় না, তারেক জিয়াকে মানতে চায় না, তাদের নতুন কোনো স্থানে যাওয়ারও উপায় নেই। জটিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ার ভয়ে তারা এখনো বিএনপিতে পড়ে আছে। বিএনপির প্রবীণ যে নেতারা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির সমর্থন করেন না, তারাও আজ এই আইনের কারণে নিরুপায়। দুটি সমান্তরাল রেখাকে যদি আমরা বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে রূপক আকারে বিবেচনা করি যেখানে দুটি রাজনৈতিক ধারা আছে।

প্রথমটি হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির ধারা, যা সৃষ্টির পর থেকেই নানা বাধাবিপত্তি পার করলেও এখনো আগের মতোই আছে। তার নিচে যেটি আছে, সেটি আওয়ামীবিরোধী রাজনৈতিক ধারা, যেখানে একটি লুপ কাটিংয়ের সাহায্য নিয়েছি। নদীর গতিপথ পরিবর্তন করার জন্য কিছু কিছু স্থানে লুপ কাটিংয়ের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও সেভাবে একটি লুপ কাটিং সৃষ্টি করে প্রগতিশীল ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের তরুণদের রাজনীতিতে নিয়ে আসা যেতে পারে। আর সেটা করতে পারলেই খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর মতো দেশবিরোধী শক্তিগুলো প্রাকৃতিকভাবেই হারিয়ে যাবে।

উল্লিখিত আলোচনা যদি আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা যায়, তবে দেখা যাবে নিভৃতে, অনানুষ্ঠানিকভাবে, বিনা আয়োজনে ইসলামী শাসনতন্ত্র নামে একটি দল এগিয়ে আসছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা ২৯৭টি আসনে প্রার্থীও দিয়েছিল। তাহলে কি ব্যাপারটা এমন দাঁড়াচ্ছে যে, বাংলাদেশে নির্বাচন হতেই থাকবে যেখানে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করবে কিন্তু বিএনপি কখনো করবে আবার কখনো করবে না। এই ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিবারই অংশগ্রহণ করবে? ধ্বংসাত্মক রাজনীতিতে বিশ্বাস করা বিএনপি নির্বাচনে না আসার কারণে ভোটের রাজনীতির ভ্যাকুয়ামে যে শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে সেখানে কি আমরা ইসলামী শাসনতন্ত্রকে সুযোগ করে দিচ্ছি? এই অবস্থাতে প্রগতিশীল কোনো শক্তি না থাকার কারণে আওয়ামী লীগবিরোধী যে স্রোতধারা তাদের ভোটগুলোও চলে যাচ্ছে সেই ইসলামী শাসনতন্ত্রের মতো বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন না বিশ্বাস করা দলগুলোর কাছে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে ইরানের ঘটনাবলি। ইরানের শেষ সম্রাট মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী পৃথিবীর অন্যতম পুরনো ঐতিহ্যবাহী আর প্রভাবশালী শাহী বংশের ছিলেন। তারই বংশ দীর্ঘ আড়াই হাজার বছর ধরে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শাসক হিসেবে ইরানের অর্থনীতি আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এছাড়া তার সময় পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও কাজ করার অধিকার দেয়া হয়। দেশজুড়ে গড়ে ওঠে একাধিক শিল্প-কারখানা।

একজন অসাম্প্রদায়িক মুসলিম শাসক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর ধীরে ধীরে মৌলবাদী গোষ্ঠীর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কমতে থাকে। আধুনিক ইরান গড়ে তোলার মনোবাসনাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। মৌলবাদপুষ্ট যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল তা কিন্তু খুব নিভৃতে, নীরবে গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় যদি রেজা শাহ পাহলভী নিজের অনুসারীদের বাইরে তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারীদের একটা প্ল্যাটফর্ম করার সুযোগ করে দিতেন, তবে আর যাই হোক মৌলবাদী শক্তির উত্থান কোনোভাবেই মাথাচাড়া দিতে পারতো না।

সময়ের প্রয়োজনকে বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যতে যেন কখনো বলতে না পারে সুফি সাধকদের যে বাংলাদেশ, যেখানে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্যরে কথা বলা হয়েছে, যেখানে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে, যেখানে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলা হয়েছে, যেখানে প্রাকৃতিক সংহতির কথা বারবার বলা হয়, যে দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, যে দেশের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মতো নেতা, সেই দেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রবাহধারায় যেন কোনো বাধার কারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়। সময়ের বিচারে আমরা যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হই।  (কৃতজ্ঞতা স্বীকার-বাংলা ট্রিবিউন)।
-লেখক: রাজনীতিবিদ

 

 



Loading...


Loading...