প্রসঙ্গ: মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স প্রমার্জনের সুবিধা বাতিল



লালমুক্তিবার্তা এবং ভারতীয় তালিকায় নাম থাকায় বয়স প্রমার্জন করে যাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল, সেই স্বীকৃতি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাভাতাও স্থগিত করা হবে। মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে শতাধিক আবেদনকারীকে এমন সুযোগ দিয়েছিল জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা), যাদের বয়স ১২ বছর ৬ মাসের কম ছিল। এছাড়া শতাধিক ব্যক্তি সনদ পেতে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন যাদের বয়স ১২ বছর ৬ মাসের কম, কিন্তু তারা নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধাভাতা পাচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিপত্র (১৭-০১-২০১৮) অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর বা তার আগে যে সব মুক্তিযোদ্ধার বয়স ন্যূনতম ১২ বছর ৬ মাস ছিল, তারাই শুধু গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন। ফলে ১২ বছর ৬ মাসের নিচে যাদের বয়স ছিল, তাদের সনদ বাতিল বলে গণ্য হবে এবং ভাতা স্থগিত করা হবে। জামুকার পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। (সূত্র প্রথম আলো ২৭-০৪-২০১৯)।

এটা তো গেল লালমুক্তিবার্তা/ভারতীয় তালিকায় নাম থেকেও ১২ বছর ৬ মাসের কম বয়সের মুক্তিযোদ্ধা, যারা গেজেটভুক্ত হয়ে বয়স প্রমার্জনের সুবিধা গ্রহণ করে, সনদপ্রাপ্ত হয়ে ভাতা অর্জন করেছেন তাদের দুর্ভাগ্যের কথা। কিন্তু আমরা হতভাগ্য দেশবাসী ইতোপূর্বে মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে জেনেছি যে, সরকারি- বেসরকারি- স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শ্রেণির অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এমনকি সচিব, যুগ্মসচিব, উপ-সচিব প্রভৃতি পদের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপালনকারী কর্মকর্তার সনদও জাল প্রমাণিত হয়েছে। জাল সনদধারী প্রজাতন্ত্রের এসব কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা নামক ‘লোগো’ থাকার সুবাদে বিশেষ ইনক্রিমেন্ট, বিশেষ পদোন্নতি, অনেকে সরকারি আবাসিক প্লট বরাদ্দ নিয়ে গৃহ নির্মাণ ঋণ সুবিধাও পেয়েছেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। আবার মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ কোটায় সন্তানদের ভর্তি করাতে পেরেছেন এবং লেখাপড়া শেষে ওই একই বিশেষ কোটায় সন্তানদের সরকারি চাকরি বাগিয়ে নেয়াসহ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক প্রবর্তিত সব সুযোগ-সুবিধাই আকণ্ঠ পান করেছেন।

লালমুক্তিবার্তা/ভারতীয় তালিকায় নাম থেকেও জামুকা কর্তৃক বয়স প্রমার্জনের সুবিধা বাতিল করায় ভুক্তভোগীদের প্রতি সহানুভ‚তি প্রকাশ করা ছাড়া আপাতত কিছুই করার নেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের মতো হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জাল সনদ দাখিলকারী প্রজাতন্ত্রের ওইসব রাজাকার কর্মকর্তার ভাগ্যে কি ঘটছে আজও তা জানতে পারা গেল না। ব্যাপারটা আমাদের মতো আমজনতার কাছে ‘অন্ধকারে সারা ঘরে সাপ’ এর মতো। মনে হচ্ছে এদের জাল সনদটাই শুধু কি বাতিল হবে/হয়েছে? নাকি এদের ভাতা বন্ধ করা হবে/হয়েছে? বা প্রদত্ত ভাতা বকেয়াসহ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়েছে/হবে? বা এতো বড় জালিয়াতির কারণে এদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে/ হয়েছে? কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না!

যদি বিচার করা হয় তবে দেশের প্রচলিত আদালতে সাধারণ অপরাধীর মতো বিচার না করে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে এদের বিচার করার জন্য জনবান্ধব সদাশয় সরকারের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

কেননা মুক্তিযোদ্ধা সনদ জাল করে মুক্তিযুদ্ধকে এরা গ্লানিময় করে তোলার ষড়যন্ত্র করেছে এবং বছরের পর বছর রাজাকার হয়েও মুক্তিযোদ্ধাদের সব সুবিধা ভোগ করে এরা জাতিকে বিভ্রান্ত করেছে, ঠকিয়েছে এবং অসম্মানিত করেছে।
সেদিন বোধহয় খুব বেশি দূরে নয় যেদিন কোনো কিছুতেই আমরা আর অবাক হতে পারব না। কেননা যতরকম অবিশ্বাস্য ব্যাপার ঘটেই চলেছে একের পর এক তাতে করে অবাক হওয়ার মতো অভিব্যক্তি বোধকরি আমাদের আর তৈরি হবে না।

সম্প্রতি পত্রিকার আর একটি খবর দেখলাম ‘অবসরের পরেও সরকারি টাকায় বিদেশ সফর’ (প্রথম আলো ০৩ মে ২১৯)। সেতু বিভাগের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহম্মেদ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ তে অবসরে গেছেন। কিন্তু এর পরেও তিনি বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে দু’বারে তিনটি দেশ ভ্রমণ করেছেন। সেতু ভবনের ষষ্ঠ তলায় একটি কক্ষে নিয়মিত অফিস করেছেন। কখনো কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের, কখনো পদ্মা সেতু প্রকল্পের দামি গাড়ি ব্যবহার করেছেন। এর কোনো ব্যাখ্যা তিনি বা সেতু কর্তৃপক্ষ দিতে পারেননি। অবসরের পর তাকে চুক্তিতে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে রেখে দেয়ার চেষ্টা করা হয়, সেতু বিভাগের অধীনে পাতালরেল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইবিষয়ক প্রকল্পের পরিচালক করার চেষ্টা করা হয়... কোনোটাতেই সফল না হওয়ায় সেতু বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ সচিবের নিকটাত্মীয়- দেশের এই বরেণ্য কৃতি সন্তানকে যার অবসরের কারণে যোগ্য প্রধান প্রকৌশলীর অভাবে লাইফ সাপোর্টে রাখা সেতু বিভাগের প্রাণ সঞ্চারের আশায় তাকে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্পে ২৩ এপ্রিল ২০১৯ থেকে তিন বছরের জন্য শেষ পর্যন্ত ‘পরামর্শক’ নিয়োগ করতেই হয়েছে। অথচ গত ৩১ ডিসেম্বরে অবসরে গেলেও কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের আগ পর্যন্ত তিনি সব সরকারি সুযোগ-সুবিধা যথারীতি ভোগ করেছেন।

উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের কারিশমা দেখে শুনে মহাকবি ইকবালের সেই বিখ্যাত উচ্চারণ মনে পড়ে যায়, ‘ছিরফ এক হি নেগাহ্! কে, বাস হাম খাক হো গ্যায়ে।’ শুধু এক দৃষ্টিতেই! আমি পুড়ে ছারখার হয়ে গেলাম। অথবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, ‘তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী, আমি অবাক হয়ে শুনি।’ - লেখক: সাবেক ব্যাংকার



Loading...


Loading...