বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার মান



অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বজোড়া খ্যাতি বহুকাল আগে থেকে। কোনো দেশের কোনো শিক্ষার্থী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন শেষে দেশে ফিরলে তাকে এখনো মূল্যায়ন করা হয় আলাদাভাবে। এখনো ক্যামব্রিজ বা অক্সফোর্ড থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের শুধু যে সমীহর চোখে দেখা হয় তা নয়, কর্মক্ষেত্রেও অন্যরকম মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা হয়। একমাত্র শিক্ষার মানের কারণেই ওই প্রতিষ্ঠান দুটি বিশ্বের সব জাতির কাছে উচ্চ সম্মানে আসীন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এক সময় সম্মান করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে অভিহিত করা হতো। শিক্ষার মান ও পরিবেশের কারণে এ সম্মান অর্জন করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই সময়গুলোতে রাতের নীরবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মানুষ ভয়শূন্য চিত্তে পথ চলত। আর এখন সেই জায়গাতে নির্ভয়ে পথচলা প্রায় দুরূহ। যাক সে কথা, দেশের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন নতুন কোনো বিষয় নয়। এর আগেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিয়ে নেতিবাচক প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থার মান এখনো নিষ্প্রশ্ন নয়।

উচ্চশিক্ষা নিয়ে গবেষণা করে যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক এমন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা এশিয়া মহাদেশের উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকা তৈরি করেছে। এবার ওই তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আসেনি। প্রতি বছরই প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা চালিয়ে এই তালিকা তৈরি করে। টাইমস হায়ার এডুকেশন নামে এই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালের যে তালিকা তৈরি করেছে তাতে এশিয়ার ৪০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রয়েছে। গত বছর সেই তালিকায় ৩৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের ৪২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটিরও নাম ওই তালিকায় নেই।
আধুনিক সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র লন্ডন শিক্ষা নগরী হিসেবেও বিশ্বে পরিচয় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। উচ্চ শিক্ষায় বিশেষ গবেষণা ডিগ্রি হিসেবে পিএইচডি অর্জন, আইন শিক্ষায় ব্যারিস্টার এট ল’ ডিগ্রি, চিকিৎসা বিজ্ঞানে এফআরসিএস ডিগ্রি অর্জন অধিক মানসম্পন্ন হিসেবে বিশ্বব্যাপী বেশি গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এই নগরীর প্রতিষ্ঠানগুলোর দেয়া সনদের।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্রমবিন্যাস করা লন্ডনভিত্তিক ওই সাপ্তাহিকটির কাজই হচ্ছে শিক্ষার মান নিয়ে গবেষণা করা। বিশ্বে বিভিন্ন দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা প্রদানের কৌশল, গবেষণাকর্ম, অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, সার্বিক শৃঙ্খলা প্রভৃতি নিয়ে পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদন তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। এসব পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে তথ্য-উপাত্ত তৈরি করে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্রমবিন্যাস প্রকাশ করে। এই গবেষণা সহজ কোনো কাজ নয়, সে সঙ্গে একেবারে অবহেলা করে উড়িয়ে দেয়ার মতো কোনো বিষয়ও নয়। ১৩টি দিক বিবেচনা করে সংস্থাটি এই তালিকা তৈরি করে আসছে।
সংস্থাটি গতবার যে তালিকা তৈরি করেছিল তাতে প্রথম স্থানে ছিল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর। এবার প্রথম স্থানে এসেছে চীনের সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি। তিন ও চার নম্বরে রয়েছে হংকংয়ের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়। এভাবে তালিকায় যে ৪০০ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, এর মধ্যে কোনোটি আগের তালিকা থেকে কিছুটা ওপরে উঠেছে, আবার কোনোটি নিচে নেমে গেছে। কোনো কোনো দেশের কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আবার নতুন করে তালিকায় যুক্ত হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এই তালিকায় স্থান করে নিতে পারেনি।

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়োগ পরিচালনা থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। শুধু তাই নয়, ছাত্র ভর্তির কোনো কোনো ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ছায়াকে দায়ী করা হয়। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন সে সরকারের মদদপুষ্ট শিক্ষকরা বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান, প্রভোস্ট, ডিনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের দায়িত্ব পেয়ে থাকেন- এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ক্ষমতাসীনদের ওপর মহলের আশীর্বাদে নিয়োগ দেয়া হয়। ধরে নিতে হবে, এসব কারণে প্রকৃত মেধাবীরা পরিচালনা ব্যবস্থার সঠিক জায়গাতে স্থান করে নিতে পারেন না। যার ফলে শিক্ষার মান দিনে দিনে নিচে নেমে গেছে।

আগে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ডিপার্টমেন্টে যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী বছরের পর বছর ভালো ফল করে শিক্ষকদের সুনজরে এসেছেন, তাদেরই মধ্যে যারা প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছেন তারা পরবর্তী সময়ে একই বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে অগ্রাধিকার পেয়েছেন। কিন্তু এখন সেটা অনেকাংশে ব্যতিক্রম হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাবে অপেক্ষাকৃত কম মেধাক্রমের প্রার্থীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে- এমন নজির কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে। এসব কারণে লেখাপড়া, গবেষণা, প্রবন্ধ রচনা, নিবন্ধ প্রকাশ করাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা।

ছাত্র রাজনীতি আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ বিনষ্টের আরেকটি কারণ। বিভিন্ন দলীয় আদর্শে বিভক্ত শিক্ষার্র্থীরা প্রায়ই একে অপরের ওপর মারমুখী হয়ে থাকে। কোনো কোনো সময় সহপাঠীদের ক্যাম্পাসে কিংবা হলে আটকে মারধরের ঘটনাও ঘটে। ছাত্রদের বিবদমান গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি ও সংঘর্ষও হয়। কখনো কখনো নিজেরা উপদলে বিভক্ত হয়ে সন্ত্রাসী কায়দায় জীবনঘাতী অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এসব ঘটনায় অনেক ছাত্র মারাও গেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পবিত্র প্রাঙ্গণে।

অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন আদর্শের শিক্ষার্থীদের ধরে নিয়ে রাতভর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে নির্যাতন করার নজিরও আছে; যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে। এতে সহাবস্থানের পরিবেশ বিনষ্ট হয়। এখন পরিবেশ এতটাই কলুষিত হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো ছাত্রের মাদক গ্রহণ ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার সংবাদও গণমাধ্যমে চলে আসে।
এসব বিরূপ চিত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সবার মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে আসছে। এমনই অনেক কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত চিন্তা, শিক্ষা ও চেতনার জায়গা। যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্ররা জ্ঞান আহরণ করতে আসেন, ভবিষ্যতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অবদান রাখার জন্য, সে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যদি বিপরীত আদর্শের মানুষের নির্যাতনের শঙ্কা তাড়া করে কিংবা কাউকে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়, তাহলে অবশিষ্ট ছাত্রদের ভয়ভীতিতে বিকশিত হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। গবেষণার ক্রমবিন্যাসে স্থান পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এই ধরনের পরিবেশ নেই- অন্তত এটা জোর দিয়ে বলা যায়।

আমাদের দেশের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে শিক্ষা অর্জন করে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে আছেন। তারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ভিন দেশেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। এটা সম্ভব হয়েছে সঠিকভাবে মেধা বিকাশের সুযোগ পাওয়ার কারণে। আর এর পেছনের যে কারণ, তা হচ্ছে ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ। ওখানে কর্তৃপক্ষ ওপর মহলের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কোনো অবৈধ হস্তক্ষেপ করে না। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ, নিয়োগ, ভর্তি, গবেষণা- সবই চলে নিয়মের গতিধারা মেনে।

যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণাকর্ম মেধা বিকাশের একটা প্রধান দিক। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি উপযুক্ত পরিবেশে গবেষণার সুযোগ না থাকে তাহলে মেধাবীরা অবিকশিত থেকে যায়। আমাদের দেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাকর্মের অভাবে গবেষণার অর্থ ব্যয় হয়নি এমন সংবাদও পত্রপত্রিকায় দেখা গেছে।

এসব ক্ষেত্রে মূলত গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থী ও প্রেরণার অভাবের কারণে বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় না হওয়াই অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে যাওয়ার এটাও একটা কারণ হতে পারে।

মানের বিচারে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন পিছিয়ে যাচ্ছে, শিক্ষায় কেন আমরা এশিয়ার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নি¤œতম পর্যায়ে, তা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। আমাদের দুর্বলতাগুলো পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে লন্ডনভিত্তিক পত্রিকাটির বিচারে আমাদের ঘাটতিগুলো কী কী এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে বিশ্ব সমাজে এগিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায়ে।

আমাদের দেশ শিল্প-বাণিজ্যসহ বহু ক্ষেত্রে বিশ্বে অগ্রসর দেশের তালিকায়। এ দেশের মানসম্পন্ন বহু পণ্য উন্নত দেশের বাজারে আমাদের দক্ষতাকে উজ্জ্বলতা দিয়ে দূতি ছড়াচ্ছে। তাহলে আমরা কেন শিক্ষার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পিছিয়ে থাকছি। কোনো জাতি শিক্ষা ও গবেষণায় পিছিয়ে থাকলে সে জাতি অন্যান্য যে কোনো খাতে পিছিয়ে যাবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। সরকারকে অচীরেই শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে-যেন আমরা বিশ্ব দরবারে আপন পরিচয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি।- লেখক: সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এএম



Loading...
ads


Loading...