মানসিক রোগ ক্রমশ বাড়ছে



ডিপ্রেশন বা মানসিক অবসাদ এমন একটি রোগ, যা দিনের পর দিন মানুষের মনকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলে। শেষমেশ মানুষটির মধ্যে দেখা দেয় আত্মহত্যার মতো ভয়ঙ্কর প্রবণতা। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় সতর্কবার্তা হলো নতুন শতাব্দীতে চারটি রোগ সারাবিশ্বের মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলবে। এ রোগগুলো হলো- কার্ডিয়াক ডিজিজ, ক্যান্সার, রিউমেটিক এবং ডিপ্রেশন। চার নম্বরে থাকা এ ডিপ্রেশন নামক মনোরোগটি অন্য রোগগুলোকে পেছনে ফেলে আগামী কুড়ি বছরের মধ্যে পয়লা নম্বরে উঠে আসবে বলে অনুমান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার।

ডিপ্রেশন বা মানসিক অবসাদ কখনো একাকিত্বের সঙ্গে সমার্থক নয়। একাকিত্ব একটি মানসিক অবস্থান, ভাবনা বা চিন্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটা আবেগ তবে সব সময় সেটা বিমর্ষতার আবেগ হবে এমন কোনো কথা নয়। অন্তর্মুখী এমন অনেক সৃষ্টিশীল মানুষ আছেন যারা একাকিত্ব ভালোবাসেন আবার এমন অনেক মহিলা-পুরুষ আছেন যারা নিজের কাজ নিয়েই সদাব্যস্ত, অপরের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপনে অনিচ্ছুক। তাদের কাছে একাকিত্ব চরম উপভোগের। অন্যদিকে বহির্মুখী মানুষ যারা হৈ চৈ করতে ভালোবাসেন তাদের মনে একাকিত্ব বিমর্ষতা ডেকে আনে। কোনো বন্ধু বিচ্ছেদ বা প্রিয়জনের মৃত্যু তাদের এতটাই বিমর্ষ করে তুলতে পারে যে, সে জাল কেটে তারা আর বেরিয়ে আসতে পারে না। ডিপ্রেশনের শিকার হয়ে পড়েন তারা।

বিমর্ষতা কাটানোর জন্য পাঁচজনের সঙ্গে সময় কাটাতে চাইলে এতে অনেক সময় দেখা যায় তাদের বিমর্ষতা যা ক্রমশ বেড়ে যায়, কমে না। নির্দিষ্ট কতগুলো উপসর্গ দেখে বোঝা যায়, কোনো মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগছে কিনা। যেমন তারা এতটা নিজের খেয়ালে ডুবে যায় যে, কেউ কোনো কথা জিজ্ঞেস করলে অন্য কথা বলে কিংবা মনে মনে হাসে ইত্যাদি। ডিপ্রেশনে মানুষ নিজেকে নিজের কাছে গুটিয়ে নেয় এবং নিজস্ব একটা পরিমণ্ডল রচনা করে। যদি সাধারণ মানুষের বাইরে থাকাটা ডিপ্রেশনের একমাত্র মাপকাঠি নয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, পুরুষদের চেয়ে মহিলারা ডিপ্রেশনে ভোগেন বেশি। বিশেষ করে চল্লিশের পর থেকে এ মহিলাদের মেনোপোজ হয় ফলে হারমোনাল কিছু পরিবর্তন দেখা যায়।

কিছু ক্ষেত্রে মহিলারা যারা বয়সকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেন না, খিটখিটে হয়ে যান, সব বিষয় সম্পর্কে অনাগ্রহ দেখিয়ে থাকেন কিংবা আগের বিনোদনগুলোকে উপভোগ করতে পারেন না, তারা বেশিরভাগ এ ডিপ্রেশনের শিকার বলে ধরা হয়। অনেক সময় এ বয়সের মহিলাদের স্বামীরা কর্মসূত্রে অত্যধিক ব্যস্ত থাকায় এবং সন্তান বড় হয়ে যাওয়াতে সন্তানকে আঁকড়ে ধরার ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবে তা সম্ভব হয় না বলে ডিপ্রেশন দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে মহিলাটির প্রতি বিশেষ সহানুভ‚তিশীল হয়ে স্বামী, সন্তান এবং পরিবারের অন্যান্য লোকজনের মহিলার পাশে দাঁড়ানো উচিত এবং তাকে যথাযথ সঙ্গ দেয়া জরুরি।

বাঁচাবার উপায় হলো মহিলাটি আগে যেসব বিষয় ভালোবাসতেন, সেসবে ন্যাক ছিল গানবাজনা ও লেখালেখি এসবে নতুন করে আগ্রহ জন্মাতে সাহায্য করা, পুরনো হবি বা শখগুলোকে ফিরিয়ে আনা ইত্যাদি। বিশেষত সৃজনশীল কোনো কাজকর্মে জুড়ে দিতে পারলে মহিলাটির ডিপ্রেশন দূর হতে পারে। অন্তর্মুখী যেসব মহিলা ডিপ্রেশনে ভোগেন বেশি সুষম খাবার-দাবার, হালকা ব্যায়াম, টেনশন কমানো বাস্তববাদী হওয়া অর্থাৎ উচ্চাকাক্সক্ষী না হওয়া, ঘুম ভালো হওয়া, শাকসবজি ও পানি বেশি খাওয়া, নিজেকে কোনো ভালো কাজে ব্যস্ত রাখা এসব করলে ডিপ্রেশন এড়ানো যায়।

যারা ইতিমধ্যে ডিপ্রেশনের শিকার তাদের ক্ষেত্রেও এগুলো কার্যকরী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। পুরুষদের ক্ষেত্রে হঠাৎ চাকুরী চলে গেলে, অপমানিত হলে, পজিশন বা পদের অবনতিতে ডিপ্রেশন আসতে পারে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ডিপ্রেশনের শিকার হয়ে পড়েন প্রিয়জনের মৃত্যু, টার্মিনাল ইলনেস বা ক্যান্সার জাতীয় দুরারোগ্যে। রোগ-কষ্টের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য শেষমেশ এ ডিপ্রেশন থেকে সুইসাইড করতেও দেখা যায়। কিশোর-কিশোরীরা আবার ডিপ্রেশনের শিকার হয় ভিন্ন কারণে। পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়া, প্রেমে আঘাত পাওয়া প্রিয়জনের কাছ থেকে ব্যথা, ক্যারিয়ার গড়তে না পারা, পরিবারের একাকিত্ব, সিঙ্গেল পেরেন্ট বা বাবা-মা যে কোনো একজনের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হওয়া ইত্যাদি।

এসব ক্ষেত্রে প্রথমে দেখা দেয়, ডিপ্রেশন এবং পরে চ‚ড়ান্ত পরিণতি হিসেবে সুইসাইড। বিশেষত এ মানসিক অস্থিরতার বয়সে কিশোর-কিশোরীরা স্বভাবতই অত্যন্ত প্রবণ হয়। ফলে তাদের আবেগ সেক্ষেত্রে আঘাত পেলে তারা ডিপ্রেশনের শিকার হয়ে পড়ে এবং আত্মহত্যার দিকে পা বাড়ায়। বর্তমানে ‘সুইসাইডলজি’ নিয়ে প্রচণ্ড গবেষণা চলছে। মানসিক কারণ ছাড়া শারীরিক কারণও থাকে এর পেছনে। মস্তিষ্কে সেরোটিন নামক একটি পদার্থের অভাব সুইসাইডের কারণ। তবে পরিবেশগত কারণ আত্মহত্যার ক্ষেত্রে বিশেষ ভ‚মিকা পালন করে। বেশ কিছু উপসর্গ থেকে বোঝা যায়, কোন মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগছেন। যেমন ঘুম কমে যাওয়া, কাজের উদ্যম কমে যাওয়া, জৈবিক চাহিদা কমে যাওয়া, যৌন চাহিদা কমে যাওয়া ইত্যাদি। এ সময় বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়স্বজনদের কথামতো ‘মন শক্ত কর সব ঠিক হয়ে যাবে’ উপদেশ উপেক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় সিভিয়র ডিপ্রেশন বা আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

ডিপ্রেশন বংশগত। সাধারণত একই পরিবারের অনেক সদস্যের মধ্যে ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছয়ের বেশি হলে শিশুদের মধ্যে ডিপ্রেশন বেশি দেখা যায়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে, মানসিকভাবে সুস্থ শিশু হঠাৎ যদি জেদ করতে শুরু করে অযথা বায়না করে, মাকে আঁকড়ে ধরতে চায় বারেবারে, স্কুলে যেতে না চায়, বারে বারে পেট ব্যথা বা মাথা ব্যথার কথা বলে, এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি। সবসময় মনে রাখতে হবে ডিপ্রেশনের জন্য দায়ী বিশেষ করে পরিবেশ। সুস্থ পরিবেশে মানসিকভাবে সুস্থ শিশু এবং অসুস্থ পরিবেশে মানসিকভাবে অসুস্থ শিশু তৈরি হয়। পুরনো আমলে যৌথ পরিবারে দেখা যায়, বাবা হয়তো কর্মরত, প্রায়ই বিদেশে চলে যান, সন্তানের জন্য ব্যয় করার মতো সময় নেই, মাও হয়তো কর্মরত সন্তানকে তেমন সময় দিতে পারেন না। এক্ষেত্রে বাচ্চাটিকে সময় দিতে না পারার কারণ না বুঝিয়ে চকোলেট ঘুষ দেয়ার প্রবণতা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও হানিকারক বরং এক্ষেত্রে ঠাণ্ডা মাথায় শিশুটিকে বোঝাতে হবে কেন তারা বাচ্চাটিকে সময় দিতে পারছেন না এবং কড়া নজর রাখতে হবে তাদের সময় না দেয়ার কারণে বাচ্চার কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা।

অর্থাৎ পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে বুঝতে হবে কোথায় ছাড়তে হবে আর কোথায় ধরতে হবে। কোথায় চলতে হবে আর কোথায় থামতে হবে। নতুবা এ সমস্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলবে। ডিপ্রেশনের জন্য কিছুটা দায়ী ‘আল্ট্রা নিউক্লিয়ার ফ্যামেলি’ অথবা বাবা ও মা কোনো একজনের অনুপস্থিতি কিংবা বাবা-মার কারোর মানসিক অসুস্থতা। টেনশন থেকে কখনো কখনো ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে। উপসর্গ হলো বুক ধড়ফড় করা, বার বার টয়লেটে যাওয়া, মাথা ধরা ইত্যাদি।

ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে প্রথমে যেটা দরকার সেটা হলো যেহেতু ডিপ্রেশন জেনেটিক কারণে হয়, তাই পূর্বপুরুষ কারোর ডিপ্রেশন ছিল কিনা জানা থাকলে পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতি সচেতন হওয়া। দ্বিতীয়ত, জীবনযাত্রা বা লাইফস্টাইল পরিবর্তন করা, তাজা শাকসবজি ও প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা দরকার। ডিপ্রেশন কাটানোর যে রাসায়নিক পদার্থগুলো মস্তিষ্কে উৎপন্ন হয় সেগুলো উৎপাদনে সাহায্য করে তাজা শাকসবজি। সর্বোপরি ড্রাগ বা মাদক দ্রব্য সেবনের অভ্যাস থাকলে তা অবশ্যই ত্যাগ করা উচিত। নতুবা দীর্ঘদিন এ বদ অভ্যাসের ফলে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। কখনো কখনো মাদক দ্রব্যের কারণে ডিপ্রেশন আসতে পারে, কখনো বা থেকেও দেখা দেয় মাদকদ্রব্য সেবনের অভ্যাস। চতুর্থত, অল্পেতে খুশি হতে হবে। চাহিদা অত্যধিক হলেই ডিপ্রেশন অনিবার্য।সুতরাং যোগাসন বা মেডিটেশন যাই করা হোক না কেন মনকে শান্ত করে সমর্পণ করতে হবে নিজের কাছে। নিজেকে সৎ কাজে ব্যস্ত রাখতে পারলে ডিপ্রেশনের মতো মানসিক রোগের হাত থেকে অব্যাহতি সহজেই পাওয়া যায়। - লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এএম



Loading...
ads


Loading...