বিষণ্ন-বেদনার জীবন বয়ে বেড়াই



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৫:১৯

আমরা কি খুব বিচ্ছিরি একটা সময় পার করছি কিংবা অসুস্থ সময়? নাকি আমাদের মানসিকতায় দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়েছে বা আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসুস্থ মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছি? আমাদের কথায়, আচরণে, প্রকাশভঙ্গিতে বারবার কী অসুস্থ চিন্তার প্রকাশ ঘটছে না? আমার তাই মনে হচ্ছে। সবাই একমত হবেন এমন নয়। তবে কিছুদিন ধরে ঘটে যাওয়া একের পর এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা আর এর জের ধরে সমাজের নানাজনের নানা মত ও দৃষ্টিভঙ্গি দেখে কেবলই মনে হচ্ছে এ জগৎ মানুষে গিজ গিজ করছে ঠিকই কিন্তু সবাই মানুষ নন।

ফেনীর সোনাগাজীর ঘটনাটি বর্তমানে সারাদেশে আলোচনার বিষয়। আধুনিকতা এবং প্রযুক্তিকে সঙ্গে নিয়ে যে সময়টা আমরা পার করছি এ রকম একটি সময়ে কোনো পুরুষের অন্যায় আচরণে প্রতিবাদ এবং আইনের আশ্রয় নেয়ার অপরাধে কোনো নারীর শরীরে প্রকাশ্য দিবালোকে আগুন লাগিয়ে দেয়ার কথা কল্পনাও কি করা যায়? কিন্তু বিষয়টি ঘটেছে। হতবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো, মাদরাসার যে অধ্যক্ষ তার ছাত্রীকে অন্যায় প্রস্তাব দিল ছাত্রীর করা মামলায় সে কিনা কারান্তরে রয়েছে এবং তার পক্ষে একদল মানুষ সমর্থন জানিয়েছে প্রকাশ্যে।

কুলাঙ্গার ওই অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে বোরকায় আবৃত কিছু নারী মিছিলে অংশ নিয়েছে। এর আগে একই দাবিতে মানববন্ধন হয়েছে, বিক্ষোভ হয়েছে। তাহলে এসব মিছিলে, বিক্ষোভে, মানববন্ধনে যারা অংশ নিয়েছে তারা কী ছাত্রীর সঙ্গে অধ্যক্ষের আচরণকে অসঙ্গত-অন্যায় মনে করেনি, করছে না? অভিযোগ উঠেছে, এসবের নেপথ্যে যারা সহায়ক হিসেবে কাজ করছেন বা করেছেন তারা আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা, প্রশাসনের কর্মকর্তা। যাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব ছিল, অন্যায়ের শিকার মেয়েটির পাশে দাঁড়ানো। তা তারা করেনি।

তারা মূল ঘটনার মোড় ঘোরাতে সাজানো ঘটনার অবতারণা করার চেষ্টা করেছে। অবশ্য কে দাঁড়াল, কে দাঁড়ায়নি এসবের তোয়াক্কা না করে অবশেষে প্রতিবাদী মেয়েটি শেষ নিঃশ্বাসটি পর্যন্ত লড়ে মারা গেছে। সে মরে যায়নি, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে মেয়েটি। তাহলে কী এরপর আর কোনো নারী অন্যায়ের শিকার হলে প্রতিবাদ করবে না? আইনের সহায়তা নেবে না? নিলে এভাবে আগুনে ঝলসে প্রাণ হারাতে হবে? তাহলে ন্যায়-অন্যায়ের দেয়াল টানা কেন? সমাজ-রাষ্ট্র, আইন-প্রশাসন কেন? সব অবাধ, উন্মুক্ত করে দেয়া হোক।
এই সমাজ, এই সমাজের মানুষ নুসরাতের পক্ষে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার আগেই অভিযুক্ত অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে ফেনীর সোনাগাজীতে বোরকা পরিহিতা কিছু নারী সরব পদভারে অপরাধীর পক্ষে তাদের অবস্থান জানিয়ে দিতে রাস্তায় নেমে এসেছে।

এরা আসলে কারা? এরা কী সত্যি অধ্যক্ষের মুক্তি চায়? নাকি নেপথ্য থেকে এদের কেউ বাধ্য করেছে এ কাজে অংশ নিতে? যে বা যারা অধ্যক্ষের পক্ষে দাঁড়াতে চাইছে বা দাঁড়িয়েছে তাদের নেপথ্য শক্তিই বা কী? কারা এদের শক্তি জোগাচ্ছে? অধ্যক্ষকে কারাজীবন থেকে মুক্ত করে এদের কার কী স্বার্থই বা হাসিল হবে-এসব প্রশ্ন জনমনে উঠেছে এবং ইতোমধ্যে এর জবাবও মিলে গেছে। অধ্যক্ষ যে ধোয়া তুলসী পাতা নয় তা ধীরে ধীরে বের হতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে অধ্যক্ষের অতীত নিয়ে অনেক কুকীর্তি প্রকাশ হতে শুরু করেছে। আরো এক শিক্ষার্থী তার সঙ্গে অধ্যক্ষের অন্যায়, অশালীন আচরণের বিষয়ে মুখ খুলেছেন। অধ্যক্ষ পদ হাতিয়ে নিতে সিরাজ উদ দৌলা সনদ জালিয়াতি করেছে এমন তথ্যও গণমাধ্যমে এসেছে। তার রাজনৈতিক পরিচয়ও এখন আর কারো অজানা নয়।

বলা যেতে পারে, নুসরাত আমাদের সমাজের নষ্ট রাজনীতি এবং ক্ষমতার সংঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার। যারা এতদিন সুযোগ পেলেই নারীর পোশাক আর চলাফেরাকে পুরুষের মতিভ্রম বা পদস্খলনের জন্য দায়ী করে আসছিলেন সোনাগাজীর ঘটনায় তারা রহস্যজনকভাবে চুপ! কারণ এখানে যে নারীটি আক্রান্ত হয়েছে সে মাদরাসার ছাত্রী, বোরকা পরা নারী। সে কোনো পরপুরুষের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে অপদস্থ হয়নি, সে কোনো ভিড়ের মধ্যেও উপস্থিত হয়নি। তাদের ভাষায় উত্তেজক কোনো পোশাকও তার পরনে ছিল না।

সে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিটি দ্বারা বারবার শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিল। বিষয়টি আয়ত্তের বাইরে চলে যাওয়ার পরই সে আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। যে কারণে কুলাঙ্গার অধ্যক্ষের মুক্তি চাইলেও মেয়েটির পোশাক বা চালচলনের কোনো দোষ কেউ দিতে পারছে না।
সম্প্রতি ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ এমন একটি স্লোগান ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। এ স্লোগানটি মূলত যারা গণপরিবহনে লক্ষ স্থির করে নারীর গা ঘেঁষে দাঁড়ায় এবং ভিড়ের মধ্যে হাত-পা ও বিশেষ অঙ্গের সাময়িক বিশেষ সুখ ভোগ করার চেষ্টা করে তাদের জন্যই বলা। এই স্লোগানে আবার তাদেরই আঁতে ঘা দিয়েছে যারা গণপরিবহনে এ রকম সুযোগ নিয়ে থাকে বা নেয়ার চেষ্টা করে। তারা এই স্লোগানটিকে ট্রল করে অশ্লীল ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে এই সমাজে বিকৃত, নোংরা, কুরুচির মানুষের আকাল নেই। তারা কীভাবে এই সমাজে আমাদেরই পাশাপাশি একইসঙ্গে বসবাস করে এটিও এক বিস্ময়! যেহেতু এরা মানুষের মতোই দেখতে এবং চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া, ওঠা-বসা সব মানুষের মতোই তাই এদের আলাদা করে চিহ্নিত করা কিছুটা কঠিন। তবে সব সময় লেজ লুকানো সম্ভব হয় না বলে অসতর্ক মুহূর্তে এরা ঠিক ধরা খেয়ে যায়।

লেজ যে লুকানো যায় না তার আরেকটি প্রমাণ হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন এই বলে প্রশ্ন তুলেছেন যে, গণপরিবহনে চলাচল করার সময় যখন কোনো নারীর চুল বাতাসে উড়ে এসে কোনো পুরুষের মুখমণ্ডল স্পর্শ করে তখন যদি পুরুষটির মনে কোনো ধরনের কুচিন্তার উদ্রেক হয় তবে সে দোষ কার? এমন প্রশ্নের জবাব দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। প্রয়োজন ঠাস করে দুই গালে দুই চড় মেরে কুচিন্তার কবর বানিয়ে দেয়া কিন্তু সেটাও সম্ভব নয়। কারণ প্রশ্নটি সে ভার্চুয়াল জগতে তুলেছে। তবে বিস্মিত হওয়ার বিষয়, এই বক্তব্যের পক্ষেও একই চিন্তার ধারকরা তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে এবং যারা যুক্তি দিয়ে এর বিপক্ষে মত দেয়ার চেষ্টা করেছেন তাদের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে দিতেও এদের কোনো ধরনের কার্পণ্য দেখা যায়নি। এর মানে ধর্ষণের মতো অপরাধ এবং অপরাধীর পক্ষাবলম্বনেও একটি সক্রিয় গোষ্ঠী রয়েছে। যাদের কাজই হলো যেভাবেই হোক পুরুষের সব অপরাধে নারীকে দায়ী করা। মূলত এরাও এক একজন ধর্ষক। সুযোগের অভাবে এরা এখনো ভালো মানুষ।

কতটা নির্লজ্জ হলে, কতটা নগ্ন চিন্তা মস্তিষ্কে ধারণ করলে একজন ধর্ষকের পক্ষে দাঁড়ানো যায় তা ফেনীর সোনাগাজী প্রমাণ করে দিয়েছে। নুসরাতের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি অবশ্য পাল্টে যাওয়ার কথা! এখন অনেকেই ভোল পাল্টাবে। যারা এর আগে অধ্যক্ষের মুক্তি চেয়ে মিছিলে-

বিক্ষোভের অগ্রভাগে ছিল তারাই আবার নুসরাতের জন্য এখন মরাকান্না জুড়বে। বিচারের দাবিতে আকাশ কাঁপাবে। যারা নারীর পোশাক নিয়ে কথা বলে, যারা নারীর পোশাককে পুরুষের কুচিন্তার উদ্রেকের জন্য দায়ী করে তারা জানে না বা জেনেও স্বীকার করে না গণপরিবহনে বোরকায় আবৃত নারীরাও পুরুষের লোলুপ স্পর্শ থেকে রক্ষা পায় না। মাদরাসার মত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকও নারী শরীর খাবলে খেতে উদগ্রীব হয়ে থাকে। এমন বাস্তবতা মানে না বলেই কিংবা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলেই সর্বত্র গণ্ডিবদ্ধ চিন্তার বহিঃপ্রকাশ বেড়েই চলেছে। আগোছালো, অসংলগ্ন এবং অবিবেচক কর্মকাণ্ডই বারবার চোখের সামনে ঘটেই যাচ্ছে। যে কারণে অগ্নিকাণ্ডে যখন মানুষ পোড়ে, ভবন পোড়ে, মানুষের স্বপ্ন পোড়ে, ভবিষ্যৎ পোড়ে তখন দেখি সমানতালে মানবতাও পোড়ে। স্বাভাবিক বুদ্ধি, বোধ, বিবেকও পোড়ে! যে কারণে তখনো কেউ কেউ দলসমেত সেলফি তুলতে ভিড় ঠেলে উপস্থিত হয়। মানুষের কান্না, আর্তচিৎকার, প্রাণে বেঁচে থাকার আকুতি এদের স্পর্শ করে না আবার সড়কে যখন কারো সন্তান বাসের চাকায় পিষ্ট হয়, যখন তার সুহৃদরা শোক জানাতে রাস্তায় নেমে আসে, প্রতিবাদকে শোক প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয় তখনো সেখানে ক্ষমতার সিঁড়ির খোঁজে কেউ এসে উপস্থিত হয়! মসজিদে কোরান শিক্ষা নিতে গিয়ে মসজিদের ইমাম ও মোয়াজ্জিনের অর্থলোভের বলি হয় সাত বছরের শিশু।

চারদিকের এত অসামঞ্জস্যতা, বিবেকের এত অভাব, মনুষ্যত্বের এত পতন দেখে বিষণ্নতা চেপে ধরে! দেশের সব উন্নয়ন, সব অগ্রগতি অর্থহীন মনে হয়! যদি দেশের মানুষের মানসিক উন্নয়নই না ঘটে, যদি দেশের জনগণ মানবিক না হয় তবে নারী কী করে নিজেকে নিরাপদ মনে করবে? নুুসরাতরা কীভাবে আত্মশক্তি প্রকাশের সাহস করবে? নাকি তারা এভাবেই হারিয়ে যেতে থাকবে? লেখক: সাংবাদিক, গল্পকার



Loading...


Loading...