বীমায় অবিশ্বাস ও দেশের উন্নয়ন



পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনাধীন বাংলাদেশে প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় পাটের গুদামে আগুন লাগার সংবাদ প্রকাশ হতো। তখন ব্যবসা-বাণিজ্য বলতে বিশেষ কিছু ছিল না। এদেশের ব্যবসায়ীদের মূল ব্যবসা ছিল পাট। না, একটু ভুল বললাম, বলা উচিত তখন দীর্ঘদিনের প্রধান পাটের ব্যবসা পতনোন্মুখ। যে পাটকে ব্রিটিশরা শিল্প হিসেবে গড়ে তুলেছিল তা পাকিস্তান পর্বে এসে লোকসানের সম্মুখে পড়ে।

যে সব ব্যবসায়ী লোকসান গুনতে বাধ্য হন তারা হতাশ হয়ে এক অভিনব পন্থা আবিষ্কার করেন তাদের ব্যবসার লোকসান এড়াতে। তখন পাটের গুদামের অথবা রক্ষিত পাটের বীমা করতে হতো। ধারণা করা হয় সেই বীমাকৃত পাট গুদামে মাত্র কয়েক মণ পাট রেখে আগুন ধরিয়ে দিতেন। অতঃপর বীমা কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ১০ হাজার বেল পাট রক্ষিত ছিল বলে ক্লেইম করে কোম্পানি থেকে অর্থ আদায় করা হতো।

এই ধারা যখন ব্যাপকভাবে চলতে শুরু করল তখন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো বুঝতে পারল ডাল মে কুচ কালা হ্যায় এবং তারা বীমাকৃত অর্থের পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়ার প্রক্রিয়া কঠিন করে তুলল। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর জীবন বীমা এবং সাধারণ বীমাকে জাতীয়করণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে বিশেষ নজর ছিল। তিনি নিজে আলফা ইন্স্যুরেন্সে চাকরি করেছেন। সুতরাং ইন্স্যুরেন্সের দিকে তিনি যতœ নিতে চেয়েছিলেন কিন্তু ওই যে স্বভাব নষ্ট হয়েছে আমাদের, ওই যে সহজ পথে অসদুপায় অবলম্বন করে বীমার টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে নেয়ার অনৈতিক অভ্যাস তৈরি হয়েছিল সেটা তো আর সহসা যাওয়ার নয়। বাংলাদেশের সময়েও সমানে পাটের গুদামে আগুন লাগতে থাকল। এটি যেন একটি কালচারে পরিণত হয়েছিল। বীমা কোম্পানিগুলো প্রথম প্রথম টাকা পরিশোধ করলেও পরবর্তীতে গড়িমসি শুরু করে এবং তা কিছুটা যৌক্তিক কারণেই।

এরপর বাংলাদেশে শুরু হয় শিল্পোন্নয়ন। সেই সঙ্গে নানা ধরনের বীমারও বিস্তার ঘটে কিন্তু বীমা কোম্পানি আর মক্কেলের মধ্যে বিশ্বস্ততার সম্পর্ক আর তৈরি হয়নি।

এখন কী চলছে? আমরা যানবাহনের একটি বীমা করে থাকি। এই বীমা বাধ্যতামূলক কিন্তু এটি শতকরা ৯৯ জনের ক্ষেত্রে একটি হাস্যকর বীমা। একটি ২০ লাখ টাকা দামের গাড়ির বীমা করা হয় তিন শ’ থেকে ৫ টাকায়। এক বছর থাকে এই বীমার মেয়াদ। গাড়ি সম্পূর্ণ পুড়ে গেলেও কারো কাছে বীমার টাকার দাবি করা যায় না। এটা করা হয় কেবল রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে দেখানোর প্রয়োজনে। ট্রাফিক পুলিশও জানেন যে এই বীমা একটি অকার্যকর কাগজ ছাড়া আর কিছুই নয় কিন্তু ‘কাগজ আছে’ তাই তারা মেনে নন।

এটি শুধু গাড়ির ক্ষেত্রে নয়, নানা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা নানা প্রয়োজনে এমন বীমার কাগজ করছেন। কোনো একজন ব্যক্তি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ গ্রহণ করবেন। তাকে একটি বীমার কাগজ দেখাতে হবে। দিব্যি তিনি এ ধরনের বীমা করে ফেলছেন আবার সত্যিকার বীমা যারা করছেন (যদিও অতি অল্পসংখ্যক), তারা ক্লেইম করে বীমার টাকা পেতে ঘাম ঝরে যাচ্ছে আবার পুরোপুরি বীমা কোম্পানিকেও দায়ী করা যায় না। কারণ ওই পাটের গুদামের কিছু কেস অন্যান্য ক্ষেত্রেও ঘটে থাকে।

একটি ঘটনার পুনরোল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। এ নিয়ে কোনো একটি পত্রিকায় লিখেছিলাম মনে নেই। ২০১৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আমি ঢাকায় ফেরার পথে গোয়ালন্দ ঘাটের কাছাকাছি সড়ক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হই। আমার ব্যক্তিগত গাড়িটি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শারীরিকভাবে আঘাত পাই। ঢাকায় না এসে আমি ফরিদপুরের বাড়িতে ফিরতে বাধ্য হই এবং সেখানেই বিশ্রাম নিতে থাকি। দুর্ঘটনার পরদিন দু’জন অপরিচিত মানুষ আসেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। স্বাভাবিক ভদ্রতায় তাদের আপ্যায়ন করি। তারা জানতে চান দুর্ঘটনার কথা, কী করে হলো ইত্যাদি। তারপর তারা আসল কথায় আসেন। জানান যে তারা বীমা নিয়ে কাজ করে থাকেন। নিচু স্বরে আমাকে পরামর্শ দেন আমি যাতে তাদের কথামতো একটি বীমা করি এবং সেটা হবে পেছনের, অর্থাৎ দুর্ঘটনার দু-চারমাস আগের যে কোনো একটি তারিখে।

সেই বীমা থেকে অর্থ পাওয়া যাবে গাড়ির ক্ষতিপূরণ হিসেবে এবং যা পাওয়া যাবে সেটা আধাআধি ভাগ হবে। বিস্ময়ের সঙ্গে তাদের কথা শুনলাম। এও কি সম্ভব! বীমা করতে এবং বীমার ক্লেইম করা অর্থ পেতে অনেক স্তর পার হতে হয়। মাঠপর্যায় থেকে রাজধানীর ভবনে ঢুকে পিলিপিলি পায়ে টপ ফ্লোরে উঠতে অসংখ্য সাইন-সিগনেচার প্রয়োজন হয়। মাথার ভেতর প্রশ্ন ভেসে উঠল, ক্যামনে কী! তাহলে কী সবার মধ্যে ওই অর্থ বাটোয়ারা হয়!

তার মানে দাঁড়াল এই যে, এদেশের মানুষ বীমার টাকা ক্লেইম করার জটিলতার ভয়ে বীমা করেন না, বীমাঅলারা ভুয়া টাকা দিতে চান না তাই জটিলতা দেখা দেয়, সেই সঙ্গে বীমা অফিসগুলোতে ভ‚ত হিশপিশ করে বেড়ায়! আর ভ‚তের সংখ্যা ব্যাপক। এই সবকিছু মিলে এদেশের বীমাকে অপরিহার্য করা যাচ্ছে না।

অথচ বীমা পলিসি কতটা সুবিধাজনক এবং মানুষের জান-মালের জন্য প্রয়োজনীয় তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমি নিশ্চিত বাংলাদেশ থেকে যেসব মানুষ উন্নত বিশ্বে বসবাস করেন, তাদের একটি বড় অংশই বুড়োকালে সেখানে থেকে যান বাংলাদেশের স্মৃতি বুকে নিয়ে। এর প্রধান কারণ স্বাস্থ্যবীমা এবং চিকিৎসা সুবিধা। একটি পয়সাও লাগে না, জ্বর থেকে শুরু করে ক্যান্সার পর্যন্ত যে বীমাই হোক, শুধু তিন ডিজিটের একটি টেলিফোন কল। হু হু শব্দ করতে করতে একাধিক অ্যাম্বুলেন্স এসে বাড়ির সামনে হাজির। পকেটে একটি টাকাও না রেখে উঠে যান অ্যাম্বুলেন্সে। কেউ একটি পয়সা চাইবে না। যত লাখ টাকা বিলই হোক, স্বাস্থ্যবীমা কর্তৃপক্ষ বুঝবে। আপনার গাড়িটি রাস্তায় ল্যামপোস্টের সঙ্গে ঠুকে দিয়েছেন, গাড়ির বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে। আপনি হাসছেন। কারণ গাড়িবীমা কর্তৃপক্ষ নতুন গাড়ি নিয়ে হাজির।

এ পর্যন্ত যেতে আমাদের ঢের বাকি। কিন্তু ন্যূনতম নাগরিক সুবিধাটি তো আমরা চাইতে পারি! বাংলাদেশে সব বীমা কর্তৃপক্ষই যে বীমার টাকা দিতে অস্বীকার করছে তা নয়। আবার বীমা পলিসির আইন-কানুনে যে বিশেষ ঘাটতি আছে তাও না কিন্তু যদি বীমাঅলারা ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করে, তাহলে আপনার কিছু করার নাই। আপনি একটি মামলা করতে পারেন বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে। সেই মামলা চালাবে আপনার নাতি বড় হয়ে। ততদিন আপনার কবরে বা সমাধিতে বিশাল বিশাল আম-কাঁঠাল গাছ হয়ে যাবে। এমন অবস্থায় কে চায় নগদ টাকা দিয়ে বীমা করে বাকির খাতা বানাতে?

তাই বলছি, আধুনিক দেশে একজন নাগরিকের বীমা ছাড়া জীবন কল্পনাই করা যায় না। আজ বাংলাদেশের খেটেখাওয়া মানুষের প্রকৃত চিত্রটা দেখলে শিউরে উঠতে হয়। এক সময় ডাক্তার ছিল না, হাসপাতাল ছিল না। মানুষের রোগ-বালাইয়ের জন্য ফকির বদ্যির ওপর নির্ভর করতে হতো। ঝাড়-ফুঁক অথবা গাছগাছালির নির্যাস। তখন আবার এত আধুনিক রোগও ছিল না। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় তার কৌতুকে যে রোগগুলোকে বলেছেন শ্রুতিমধুর, তা তো আধুনিক রোগ। দ্বিতীয়ত যখন চিকিৎসা ছিল না তখন রাজার জন্য যে ব্যবস্থা কৃষকের জন্যও প্রায় একই ব্যবস্থা ছিল। ফলে রোগী মারা গেলে আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে শোক থাকত, আক্ষেপ থাকত না। এখন মৃত আত্মীয়দের মধ্যে শোকের চেয়ে আক্ষেপটা বড় করে সামনে আসে, ‘ভালো মতো চিকিৎসা করাইতে পারি নাই!’ সুতরাং সবার কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হলে বীমার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে সরকারেরও স্বাস্থ্য খাতে ভর্তুকি অনেকাংশে কমবে।

বীমাবিষয়ক আইন ঘেঁটে দেখেছি, সুপরিকল্পিতভাবে অসত্য দাবি করে বীমার টাকা পাওয়ার চেষ্টা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ কোনো কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেই। এটির ব্যাপারেও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এএম

 



Loading...


Loading...