বর্জ্য বিপাকে ডিসিসি বাড়ছে পরিবেশ দূষণ



  • হাসান মাহমুদ রিপন
  • ০৮ আগস্ট ২০১৯, ১৫:১০

কোনোভাবেই সামলানো যাচ্ছে রাজধানীর বর্জ্য। গত ২০ বছরে দ্বিগুণ হারে বেড়েছে বর্জ্যরে পরিমাণ। এর ওপর আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে রয়েছে বর্জ্যরে বাড়তি চাপ। দুই সিটিতে বছরে ২২ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্যরে পাহাড় হচ্ছে। সংস্থা দুটির বর্জ্য ফেলার নিজস্ব জায়গা আমিনবাজার ও মাতুয়াইল প্রায় ভরে গেছে। এ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। অপরদিকে ঢাকা এ দুই সিটির ল্যান্ডফিলই পরিবেশ দূষণ বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ খোদ পরিবেশ অধিদফতরের।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকার বর্জ্য অপসারণের নির্ধারিত স্থান মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল। ঢাকা শহরে গড়ে প্রতিদিন সাড়ে পাঁচ হাজার টনেরও বেশি বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্যরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে (ডিএনসিসি) প্রতিদিন ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (ডিএসসিসি) ২৫০০ থেকে ৩ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও কোরবানির সময় গত বছরের হিসেবে ২৪ ঘণ্টায় ১৯ হাজার ২০০ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। এ বছর দক্ষিণে বর্জ্য ফেলতে ১২০০-১৫০০টি জায়গা চিহ্নিত করে দেয়া হবে। ওই চিহ্নিত স্থানে কোরবানি করার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হবে ডিএসসিসির পক্ষ থেকে। নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে বর্জ্যবাহী গাড়ি এসব ল্যান্ডফিলে নিয়ে আবর্জনা ফেলছে। প্রতিবছরের কোরবানি ঈদের বর্জ্যরে হিসাব অনুযায়ী এবার ঈদে মহানগর এলাকায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য হতে পারে বলে ধারণা করছে দুই সিটি করপোরেশন। তবে গত ঈদের পর ৩৬ ঘণ্টায় ৩৩ হাজার ৪৮৩ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করেছে এ দুই সংস্থা।

অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের ল্যান্ডফিল স্থাপনের জন্য পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক হলেও ডিএনসিসি তা মানেনি। তাদের পরিচালিত আমিনবাজারের ল্যান্ডফিল স্টেশন পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার টনেরও বেশি বর্জ্য ফেলার কারণে ওই এলাকার লাখ লাখ মানুষ ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছেন। পরিবেশ অধিদফতর থেকে দূষণের ব্যাপারে দুই দফায় লিখিত নোটিশ দেয়া হলেও কর্ণপাত করছে না ডিএসসিসি।

বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) রুবিনা ফেরদৌসি জানান, ছাড়পত্র ছাড়াই ডিএনসিসি নির্মিত করেছে আমিনবাজারের ল্যান্ডফিল স্টেশন আর দুই দফায় লিখিত নোটিশ দেয়া হলেও কর্ণপাত করছে না ডিএসসিসি। যার ফলে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ।

আমিনবাজারে জনবসতির কাছেই ল্যান্ডফিল করা হয়েছে। আর বর্জ্য থেকে নির্গত পানি মাটির নিচে চলে যাচ্ছে যা বুড়িগঙ্গা নদীতে যাওয়ার সম্ভবনা আছে। ল্যান্ডফিল করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দেখা যায় না।

বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক এ কে এম রফিক আহাম্মদ বলেন, চলতি বর্ষা মৌসুমে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের বর্জ্য পানিতে মিশে নদী দূষণ করবে। এ ব্যাপারে ডিএনসিসিকে বলার পরও তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না। পরিবেশ অধিদফতরের একক প্রচেষ্টায় পরিবেশের উন্নয়ন সম্ভব হয়। রাজধানীসহ সারাদেশের পরিবেশের উন্নয়নে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে গণসচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীরা ভূমিকা পালন করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণে বছরে প্রায় ১ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে ঢাকায় ১৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ১৩৪ বর্গমাইল আয়তনের এই শহরে প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস। জনপ্রতি ৫৬০ গ্রাম বর্জ্য উৎপাদন করে। এ ছাড়া বিশ্বের মধ্যে বসবাসের অনুপযোগী শহরের তালিকায় ঢাকার অন্তর্ভুক্তি পিছিয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। কারণ রাজধানীতে উৎপাদিত বর্জ্যরে ৮০ শতাংশ সংগ্রহ করতে পারে পরিচ্ছন্নকর্মীরা। বাকি বর্জ্য নানাভাবে বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকে।

জানা যায়, ১৯৯০ সালে তৎকালীন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) থাকায় মাতুয়াইলে ৫০ একর জমির ওপর ল্যান্ডফিল গড়ে ওঠে। ২০০৫-৬ অর্থবছরে আরো ৫০ একর জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে ১০০ একরে সম্প্রসারণ করা হয়। পরবর্তীতে রাজধানীতে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) বিভক্ত হয়। জাতীয় সংসদে আইন করে আগের সিটি কর্পোরেশন বিলুপ্ত করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) করা হয়।

সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ল্যান্ডফিল ভরাটের পথে এ নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করার চিন্তা রয়েছে। ইতোমধ্যে মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল নতুন করে বর্জ্য ডাম্পিংয়ের জন্য আরো ১৬২ একর জমি অধিগ্রহণ করার পরিকল্পনা চলছে। ডিএসসিসির ৮১ একর জমির মধ্যে ৫০ একর ল্যান্ডফিল ও ৩১ একর জায়গা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবহার করা হবে। অপরদিকে উত্তর সিটির জন্য আমিনবাজারে আরো ৫১.৪৮ একর জমিতে ল্যান্ডফিলের জায়গা অধিগ্রহণ করে সরকার। দেশে প্রথম নির্মিত রাজধানীর মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের পরে এটি নির্মিত হয় অত্যাধুনিক উপায়ে। ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. মঞ্জুর হোসেন বলেন, আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে এখনো কিছু জায়গা ফাঁকা আছে। সেখানেই ময়লা ফেলা হচ্ছে। তবে এই ল্যান্ডফিলের আশপাশে ৮১ একর জমি ও অন্যত্র ১০০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে আরো আধুনিক ল্যান্ডফিল করা হবে।

ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে ময়লা-আবর্জনা ফেলার জায়গা থাকবে না। এ জন্য নতুন করে ৮১ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা চলছে।

জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হকও জীবিত থাকা কালে নিজেদের উদ্যোগে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছিলেন। এ কারণে চীন ও থাইল্যান্ডের দুটি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শনও করেছিলেন তিনি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের একটি সূত্রে জানা গেছে, ‘প্রায় ৭২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। ২০২০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে এরই মধ্যে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে।’

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘শহর পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য এই ধরনের উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উচিত দ্রæত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। বারবার সভা না করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারার কারণগুলো চিহ্নিত করা জরুরি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে প্রায় ৩০ ফিট পাহাড়সম বর্জ্যরে স্ত‚প। নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা বর্জ্যবাহী গাড়িতে এনে ল্যান্ডফিল স্টেশনে ফেলা হয়। এরপর ৫০-৬০ জন নারী-শিশু ল্যান্ডফিলে আনা বর্জ্যে প্লাস্টিকের বোতলসহ নানা জিনিসপত্র সংগ্রহ করছে। পরে স্কেভেটর ও বুলডোজার দিয়ে বর্জ্য লণ্ডভণ্ড করে দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু যারা ময়লার ভেতর কাজ করছেন তাদের জন্য নেই গ্লাভস, মাস্ক, বুট-জুতা বা হেলমেটের ব্যবস্থা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ময়লা-আবর্জনা থেকে মারাত্মক সব রোগ হয়। তারা হেপাটাইটিস বি ভাইরাস, টিটেনাস এবং এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। হতে পারে তাদের পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ। এ ছাড়া নাক-মুখ সুরক্ষিত না থাকায় নিঃশ্বাসের সঙ্গে দেহের ভেতরে ঢুকছে মারাত্মক সব জীবাণু।
মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ১২ বছর ধরে ময়লার ভেতরে থাকা জিনিসপত্র খুঁজছেন আব্দুর রাজ্জাক। এখন তার ময়লার দুর্গন্ধ সহ্য হয়ে গেছে। তবে তার ১৭ বছরের ছেলে মতলুব ৩ বছর কাজ করে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টে ভুগছে।

শুধু মতলুব নয় তার মতো অনেক ছেলেমেয়ে ল্যান্ডফিলে ময়লার ভেতর নানা জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে এসে মারাত্মক রোগে ভুগছেন। আর যারা এখনো কাজ করছেন তারাও রয়েছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। বর্জ্যরে গন্ধে নিজেদের মানিয়ে নিতে তারা ড্যান্ডিসহ নানা রকম নেশায় জড়িয়ে পড়ে।

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকা ডিএসসিসির এমএ শাহেদ বলেন, এখানে যারা ময়লা-আবর্জনার ভেতরে প্লাস্টিক খুঁজে তারা সিটি কর্পোরেশনের কোনো লোকজন নয়। বাইরে থেকে এসব টোকাই আসে। আর ডিএসসিসির ল্যান্ডফিলে স্কেভেটর ৬টি, বুলডোজার ২টি এবং ড্রেজার ৫টি আছে। এসব যন্ত্রপাতি দিয়েই বর্জ্যবাহী গাড়ির ময়লা স্ত‚প করা হয়।

ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক উপদেষ্টা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। গ্লাভস, মাস্ক, বুট ও হেলমেটসহ অন্যান্য জিনিসপত্র দেয়া হয়। কিন্তু তারা এসব পরিধান করে কাজে স্বস্তিবোধ করে না। এ নিয়ে শত চেষ্টা করেও পরিচ্ছন্নকর্মীদের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাওয়া নিয়ে কারো সন্দেহ নেই। ২০৪১ সালে উন্নত বিশ্বের কাতারেও পৌঁছার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু কিভাবে এগোচ্ছে সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। কারণ একটি দেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী। সেই রাজধানী ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হতে যাচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/এএম

 




Loading...
ads




Loading...