রাজধানীতে ভবন নির্মাণে বিস্তর অনিয়ম



বনানীর এফ আর টাওয়ার রাজধানীবাসীর জন্য নতুন এক ট্র্যাজেডি, নতুন এক নির্মমতার আখ্যান। অষ্টম তলার আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য তলায়। হাতে দীর্ঘ সময়, তবুও নিরাপদে বেরিয়ে আসার পথ নেই। ফায়ার সার্ভিস, সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর যৌথ অভিযান।

বাকিটা অজানা নয় কারোই, ততক্ষণে পুড়ে ছাই অনেক স্বপ্ন। আর এতেই টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। হাঁকডাক দিয়ে পনেরো দিনের আল্টিমেটামে বহুতল ভবনের তথ্য সংগ্রহ শুরু করে রাজউক। একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে নানা অনিয়মও।

দেশে নিরাপদ ভবন বা ঝুঁকিমুক্ত অট্টালিকা নির্মাণের জন্য আইন রয়েছে। আইনের আওতায় তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা। বিল্ডিং কোডে সব ধরনের ভবনের জন্যই আলো-বাতাস চলাচল করার ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ভার-বহন ক্ষমতা, নির্মাণ প্রক্রিয়ার সকল বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত নীতিমালা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়াও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে ভবন তৈরি করার ক্ষেত্রে কী কী সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে সে বিষয়েও বিল্ডিং কোডে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ভবন নির্মাণেই তা মানছেন না বাড়ির মালিক ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। স্বয়ং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জরিপ প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে এমন অনিয়মের খবর, ২৪টি টিমের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখানো হয় ঢাকার ৬৬ শতাংশ ভবনই

নিয়মবহিভর্‚তভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। নকশা ত্রুটি ছাড়াও ভবনে রাখা হচ্ছে না পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। সুউচ্চ কোন ভবনে নিরাপদ বহির্গমনের কোনো ব্যবস্থায় নেই। আইন ও বিধিবিধান বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত কোনো ব্যবস্থা যেমন নেই, তেমন এখন পর্যন্ত বিধি মানানোর জন্য কোনো নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষও পর্যন্ত গঠিত হয়নি। এসব কারণেই অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধসের মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বহু হতাহতের পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, ভবন নির্মাণ সম্পর্কিত আইন, কোড ও বিধিবিধানসমূহ অনতিবিলম্বে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা না হলে ভবিষ্যতে এই ধরনের ভয়াবহ দুর্ঘটনা আরো বেশি ঘটতে পারে। তাই নতুন-পুরনো সব ভবনের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, জরুরি পথসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিতে কঠোরভাবে তদারকি করার পাশাপাশি ভবন নির্মাণ সম্পর্কিত আইন, কোড ও বিধিবিধানসমূহ যথাযথভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন তারা। সর্বশেষ বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এখানে প্রাথমিক কারণ নির্মাণ ত্রুটির বিষয়টি উঠে এসেছে। ভবনটি ১৮ তলা নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হলেও ২৩ তলা পর্যন্ত করা হয়। শুধু ভবনের তলা বাড়ানোই নয়, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল, নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ দুর্ঘটনা বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বনের অবহেলার বিষয়গুলো প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত হয়েছে।

এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার আগেও বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বিল্ডিং কোড না মানাসহ ভবনের অব্যবস্থাপনা বিষয় উঠে আসে। কিন্তু প্রতিটি দুর্ঘটনার পর পরই এসব বিষয়ে তোড়জোড় দেখা গেলেও পরবর্তীতে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশমালা বাস্তবায়নে কোনো ব্যবস্থা নিতেও দেখা যায়নি। বিল্ডিং কোড না মেনে করা বহুতল ভবনের বিরুদ্ধে সরকার শিগগিরই মাঠে নামার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি সপ্তাহে প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশের কথা জানিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, বেশকিছু ভবনেই একেবারেই অনুমোদিত নকশা নেই। অনুমোদিত নকশার বাইরেও ঊর্ধ্বমুখী বিভিন্ন স্তর তৈরি করা হয়েছে। কোনো কোনো ভবনে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার জন্য সিড়ির ব্যবস্থা নাই। কোনো ভবনে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নাই। এতসব অনিয়মের দায় রাজউকও এড়াতে পারে না বলে মনে করেন মন্ত্রী।

গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, আমরা কাউকে ছাড় দেব না। তিনি রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারী হোন, মালিক হোন আর ডেভেলপার হোন। সকলকে আইনের আওতায় আনা হবে। শ ম রেজাউল করিম বলেন, অনিয়মের জন্য শুধু ভবন মালিক বা ডেভলপারই নন, অপরাধ বিবেচনায় ফৌজদারি আইনে মামলা হবে সংশ্লিষ্ট রাজউক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও।

জানা গেছে, ষাটের দশকে রাজধানী ঢাকার পরিধি বাড়তে শুরু করে। ১৯৬০ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজধানীর গুলশান বনানীকে আধুনিক নগরায়ণের জন্য অন্তর্ভুক্ত হয়। এ এলাকার স্থাপনাগুলোর নির্মাণেও অগ্নিকাণ্ডসহ নানা দুর্ঘটনা মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রস্তুতি অন্তর্ভুক্তির কঠোর নির্দেশনা দেয় রাজউক। কিন্তু ২০১৫ সালে রাজউকের জরিপে উঠে আসে গুলশান বনানীর ৬৪ শতাংশ স্থাপনা নির্মাণে বিল্ডিং কোড ও আইন মানা হয়নি।

রাজধানীর ভবন নির্মাণের অনিয়মের বিষয়ে সম্প্রতি (৩ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম একটি জরিপ রিপোর্টের তথ্য তুলে ধরে জানান, রাজউকের (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) ৬৬ শতাংশ ভবনই নিয়মবহিভর্‚তভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজউকের আওতাধীন এক হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় দুই লাখ ৪ হাজার ১০৬টি ভবনের ওপরে জরিপ করা হয়েছে। এতে পূর্ব নির্মিত ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৭৬টি ভবনের মধ্যে এক লাখ ৩১ হাজার ৫৮৩টি (৬৭.৩৫%) ভবনের বিভিন্ন ধরনের ব্যত্যয় পাওয়া গেছে এবং নির্মাণাধীন আট হাজার ৭৩০টি ভবনের মধ্যে তিন হাজার ৩৪২টি (৩৮%) ভবনের অনুমোদিত নকশায় ব্যত্যয় পাওয়া গেছে। মন্ত্রীর তথ্য মতে, জরিপ করা ভবনের মধ্যে মোট ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯২৫টিতে (৬৬%) অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে।

দেশে ভবন বা অট্টালিকা নির্মাণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৫২ সালে প্রণয়ন করা হয় ‘বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন আইন ১৯৫২।’ কিন্তু শুরু থেকেই আইনটির সঠিক বাস্তবায়নের দিকে নজর দেয়া হয়নি। আইনটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালে গৃহায়ন ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘বিল্ডিং সেল’ নামে একটি পৃথক সেল খোলা হয়। কিন্তু আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তেমন ফল পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) প্রতিষ্ঠিত হলে সংস্থাটির চেয়ারম্যানকে অথরাইজড অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে কার্যত বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন আইন কেবলমাত্র রাজধানীতে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা হয়। বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন আইন ১৯৫২ প্রণয়নের প্রায় ৪১ বছর পর ১৯৯৩ সালে প্রথমবারের মতো তৈরি করা হয় বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)।

যে কোনো অট্টালিকা নির্মাণের ক্ষেত্রে এর নির্মাণ উপকরণসমূহের যথার্থতা দিকনির্দেশ করার পাশাপাশি নির্মিত ভবনের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এই বিল্ডিং কোডে। পরে ২০০৬ সালে এটি পার্লামেন্ট থেকে গেজেট আকারে প্রকাশ পায়, পরিণত হয় আইনে। আইন হওয়ার এক দশক পার হলেও বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এমনকি সরকারের কোনো কর্তৃপক্ষ এই বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন করবে এবং ভবন নির্মাণকারীরা কোড অনুসরণ না করলে সেটার প্রতিকারের বিষয়টিও এখন পর্যন্ত অনির্ধারিত। যে কারণে ভবন নির্মাণকারীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো নির্মাণ করে থাকে অধিকাংশ অট্টালিকা। মূলত সে কারণেই প্রতিনিয়ত ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আনসারী বলেন, এফ আর টাওয়ারের মতো প্রত্যেকটা ভবনেরই কিন্তু কম-বেশি ব্যত্যয় থাকবে। সেগুলোর সবই সমাধান আছে। ভবনগুলোকে সরাসরি পরিত্যাক্ত ঘোষণা না করে সমস্যাগুলো সমাধান করে, সংস্কার করে সেটিকে আমরা চালু রাখতে পারব।

অন্যদিকে, ভবিষ্যতে যে কোনো অনিয়ম প্রতিরোধে প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে রাজউকের সংস্কার জরুরি বলে মনে করেন সংস্থাটির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন পর্যন্ত ভবন নির্মাণ বিধি মানানোর জন্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ না থাকলেও এ বিষয়ে রাজউকের কাজ করার দায় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা করা হয় না। চোখের সামনেই এই বিধি অনুসরণ না করে বাড়ি নির্মাণ হচ্ছে। এ ছাড়া বর্তমানে যেসব ভবনের নকশা অনুমোদিত হয়, তাতে জাতীয় নির্মাণবিধি অনুসরণ করার শর্ত থাকে। কিন্তু আসলেই তা করা হচ্ছে কি না, মাঠপর্যায়ে দেখা হয় না। এর পাশাপাশি যিনি ভবন তৈরি করবেন, তাকেই নির্মাণ বিধি পালন বিষয়ে বেশি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হয়। ভ‚মি মালিকদের সঙ্গে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তি থাকে যে ভবন নির্মাণের যাবতীয় বিষয়ে জাতীয় নির্মাণ বিধি অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।

লালপুর-বাগাতীপাড়া আসনের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমার দুই উপজেলাতে(লালপুর-বাগাতীপাড়া) অনেক নেতা আছে যারা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। অথচ নব্য নেতাদের কাছে তারা নির্যাতিত হচ্ছে। এটা খুব দুঃখজনক। তিনি বলেন, নেত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মীই একত্রে তার পক্ষে ভোটের মাঠে কাজ করেছে। অথচ ওই এমপি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রকাশ্যে নৌকার বিরোধিতার করেছে।

তিনি আরো বলেন, যে ভাবে প্রকাশ্যে পক্ষ পাতিত্ব চলছে। তাতে আগামীতে উপজেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে ত্যাগী ও কঠোর পরিশ্রমী নেতারা কমিটি থেকে বাদ পড়তে পারে। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় ও জেলা আওয়ামী লীগকে দৃষ্টি রাখতে হবে। সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি গাজী ম.ম আমজাদ হোসেন মিলন বলেন, দলের অভ্যন্তরে কিছু কিছু বিষয় নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। দলের হাই-কমান্ডকে এই বিষয়গুলো চিহ্নিত করে দোষীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে আওয়ামী লীগ থেকে ত্যাগী ও পরিশ্রমী কর্মীরা হারিয়ে যাবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক এমপি বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ দিয়েছিল অনেক নেতাকর্মী। কিন্তু আজ তারাও বর্তমান এমপির কাছে নির্যাতনের শিকার। তিনি বলেন, এখন এমপিদের পরিবারের সদস্যদের কারণে দলীয় নেতাকর্মীরা কথাই বলতে পারে না। দলীয় নয়, পারিবারিক এমপি দিয়ে দল চলে।

মানবকণ্ঠ/এএম



Loading...


Loading...