জলাবদ্ধতা আতঙ্কে রাজধানীবাসী



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:৫৪

চলতি বছর গ্রীষ্মের শুরুতেই আগাম বর্ষায় জলজটে নাকাল রাজধানীবাসী। আসন্ন বর্ষায় এ দুর্ভোগ বাড়তে পারে কয়েকগুণ। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে এবার ভারি বৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। ঘণ্টায় ৪০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলে ঢাকায় জলজট হয়। তবে ঢাকার দুই মেয়র বলছেন, জলজট কমাতে নানা ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বছরের পর বছর কথা হলেও রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার কোনো সুরাহা খুব একটা হচ্ছে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকার পানি সরে যাওয়ার কোনো পথই খোলা নেই। তা হলে জলাবদ্ধতা হবে না কেন? জানা গেছে, রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব নিয়ে ওয়াসা এবং সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে আছে রশি টানাটানি। ১৯৮৯ সালে ওয়াসাকে পানি নিষ্কাশনের মূল দায়িত্ব দেয়া হয়। পাশাপাশি এ কাজে যুক্ত হয় ঢাকা সিটি কর্পোরেশনসহ আরো কয়েকটি সংস্থা। ওয়াসা ২০১৪ সালের আগস্টে স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, জলাবদ্ধতার দায় ওয়াসা নেবে না। কারণ, ‘পানি নিষ্কাশনের কাজ ঢাকা ওয়াসার ওপর ন্যস্ত করা হলেও ওয়াসার চেয়ে সিটি কর্পোরেশনের পাইপলাইনের সংখ্যা বেশি। বার্ষিক ক্লিনিংয়ের ব্যাপারেও দুটি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নেই। এ জন্য সামান্য বৃষ্টিতেই জলজট দেখা দেয়।’

গণপূর্ত এবং পানি সম্পদমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়ে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে আলোচনায় বসেন প্রায়ত মেয়র আনিসুল হক। মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে দায়িত্ব নিতে আগেই খাল পরিচ্ছন্ন ও দখলমুক্তের শর্ত দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই শর্ত অনুযায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজধানীর খাল পরিচ্ছন্ন ও দখলমুক্ত করে ৯ মাসেও সিটি কর্পোরেশনে হস্তান্তরের কাজ করতে পারেনি ওয়াসা।

ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান বলেন, ‘ওয়াসার যখন যেমন টাকা থাকে, তখন তেমন ব্যয় করি। ড্রেনেজে আমাদের অংশের কাজকর্ম ঠিকই আছে। খাল পরিচ্ছন্ন ও দখলমুক্ত করে সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এ ব্যাপারে ওয়াসার প্রস্তুতি পরবর্তীতে জানানো হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেছেন, এবারে রাজধানীবাসীর প্রকৃতিই ভরসা। বৃষ্টি কম হলে রক্ষা আর বেশি হলে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ পাবে। তখন ডুবন্ত ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। যদিও জলাবদ্ধতার ভয়াবহতা দেখে ২০১৭ সালে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, ‘আমি প্রমিজ করছি, সামনের বছর থেকে আর এসব (জলাবদ্ধতা) দেখবেন না। কিছু দিনের মধ্যেই নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে।’

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, জলাবদ্ধতার জন্য আমরা একটা জায়গায় সমাধান করলে আবার অন্য জায়গায় সমস্যা দেখা যায়। আমরা আশা করছি এবার গত বারের তুলনায় জলাবদ্ধতা কিছুটা কম হবে। তবে একেবারে যে শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে তা আমরা বলতে পারব না। অপরদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, খুব দ্রুতই আমাদের প্রতিটি এলাকার খালগুলোকে দখলমুক্ত করে সচল করতে পারলে জলাবদ্ধতা অনেকটা কমে যাবে।

এটা মেয়র হওয়ার পর আমার প্রথম বর্ষা, আমি কিছু সময় চাই পরিস্থিতির উন্নয়নের। মৌসুমের শুরুতেই চলতি বছরেও বর্ষা এলেই চিরচেনা ঢাকা রূপ নেয় এক ভিন্ন নগরীতে। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায় প্রধান সড়ক থেকে অলিগলির ভেতরে। আর অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি এই দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ। যানজটের শহর ঢাকা বলা যায়, পরিণত হয় প্রায় অচল এক নগরীতে। গুলিস্তান, শান্তিনগর, নিউমার্কেট, কারওয়ানবাজার, মিরপুর, খিলক্ষেত, বাড্ডাসহ সব এলাকার একই অবস্থা। মেট্রোরেলের কারণে মিরপুর এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর। তাই অল্প বৃষ্টিতেই পড়তে হয় জলাবদ্ধতায়। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এখনো সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকায়, বছরজুড়ে এলোমেলো কাজ হলেও তা আসলে কোনো কাজে আসছে না।

এ নিয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, সমন্বিত কার্যক্রমের প্রতিশ্রুতি আমরা এই শহরের জন্য নিয়েছিলাম। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ততটা আগায়নি। কাজের ধারাবাহিকতায়ও আমাদের সমস্যা রয়ে গেছে। মেয়র যাই বলুন নগরবাসী জানে জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি কতটা। তিনি বলেন, এবারেও বিগত বছরগুলোর থেকে রাজধানীতে কম জলাবদ্ধতা হবে এমনটা আশা করার আমার কাছে কোনো যৌক্তিকতা নেই। চলতি বছরেও জলাবদ্ধতায় ভুগতে হবে রাজধানীবাসীকে। ইতোপূর্বেও রাজনৈতিক দলগুলো, সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে সরকারের উদ্যোগ নেয়ার কথা ছিল। এসবের কোনো কিছু না করে জলজট কমানোর প্রত্যাশা করা বোকামি ছাড়া কিছু নয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পানি নিষ্কাশনের দুটি পথ আছে। এক. ভ‚-গর্ভে পানি শোষণ করে নেয়া এবং দুই. খাল, বিল ও ড্রেন দিয়ে নদীতে চলে যাওয়া। ঢাকায় এই দুটি পথের একটিও কার্যকর নেই। এ কারণে জলাবদ্ধতা বাড়ছেই।

বিআইডবিøউটিএর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী এবং নগর বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, পানির ধর্মকে অস্বীকার করে আমরা ঢাকা শহর থেকে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিয়েছি। ঢাকার মধ্যে ৪৬টি খাল ছিল, তা আমরা ভরাট করে ফেলেছি। ফলে বৃষ্টির পানি সরতে পারে না। পানি নিচের দিকে যায়। যেতে না পেরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ঢাকার প্রাকৃতিকভাবে পানি প্রবাহের পথ রুদ্ধ করে অন্য কোনো ব্যবস্থায় এই জলাবদ্ধতা দূর করা কঠিন।

২০১৭ সালের ২ আগস্ট, বিকেল সোয়া চারটা। মাত্র আধাঘণ্টার বৃষ্টি। ডুবেছিল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। কাকরাইলে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের মাঠে ছিল প্রায় দুই ফুট পানি। প্রথম শ্রেণির ছাত্র রণবীর মায়ের সঙ্গে গোপীবাগের বাসায় ফিরবে। রিকশা নেই, দু’-একটি থাকলেও যাবে না। বাধ্য হয়েই ময়লা পানিতে দাঁড়িয়ে ছিল রণবীর। অনেক কষ্টে উঠল ‘রংধনু’ বাসে, সঙ্গে মাও। দাঁড়ানোর মতো জায়গাও ছিল না।

তা-ও যেতে হবে। জলজট আর যানজটে একাকার ছিল ঢাকা শহর। বাস চলছে না। অনেক কসরত করে রংধনু যখন ইত্তেফাকের মোড়ে পৌঁছাল, ঘড়িতে তখন রাত ৮টা বাজতে ১০ মিনিট বাকি। ১০ মিনিটের রাস্তা প্রায় তিন ঘণ্টা লাগল। রণবীরের মা বললেন, এ রকম দুর্ভোগ কারো যেন না হয়। রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার এই হাল তাকে ক্ষুব্ধ করেছে। তখন তার প্রশ্ন ছিল, রাজধানীবাসীর এ জনভোগান্তী দেখার কি কেউ নেই? এসব গল্প নয়, বাস্তবতা। বন্যা নয়, বৃষ্টি হলেই ঢাকার স্কুলের শিশু শিক্ষার্থী আর অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান।

ভাবেই ২০১৭ সালে বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতে প্রায় প্রতিদিন রাজধানীর কোনো না কোনো এলাকায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। তখন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেছিলেন, আগামী বর্ষায় আর জলাবদ্ধতা থাকবে না। সেই বর্ষার আর দেড় মাসের মতো বাকি। কিন্তু জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির কোনো কার্যক্রমই শুরু করা হয়নি এখনো। জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসা এখন পর্যন্ত কোনো নালা পুরোপুরি পরিষ্কার করেনি, পুনর্খনন করেনি কোনো খাল।

নগর গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বললেন, জলাবদ্ধতার পর তা নিরসনের লক্ষ্যে এবার যেমন ব্যাপক ও সর্বাত্মক কাজ হওয়া উচিত, তুলনামূলকভাবে সেটা কিন্তু খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এখন দোয়া করতে হবে এবার যেন গত বছরের মতো এক সঙ্গে বেশি বৃষ্টি না হয়।

বাংলাদেশ প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউটের সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেছেন, আশির দশকে নগর বন্যার পর ফ্লাড অ্যাকশন প্রোগ্রাম (ফ্যাপ)-এর আওতায় ঢাকার চারপাশ ঘিরে একাংশে শহর রক্ষা বাঁধ তৈরি হয়। কিন্তু পুরো কাজ আর হয়নি। কথা ছিল ওটা হলে সার্কুলার রোড, ড্রেন এসব তৈরি হবে। কিন্তু হয়নি। আর ঢাকার চারপাশে নদী। থাইল্যান্ডে শহরের ভেতরে ওয়াটার বোট চলে। আমাদেরও সুযোগ ছিল। কিন্তু আমরা নষ্ট করে ফেলেছি। শহরের নদী-খাল ভরাট করে আমরা রাস্তা বানিয়েছি। ফলে এখন জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকা শহরের মধ্যে ৪৬টি খাল ছিল। ওয়াসা বলেছিল, এর মধ্যে কমপক্ষে ২৬টি খালকে রক্ষণাবেক্ষণ করে পানিপ্রবাহ সচল রাখবে। কিন্তু বাস্তবে তো তা আর হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, প্রাকৃতিকভাবেই পানি নিষ্কাশনের পথগুলো খুলে দেয়া হলো সহজ পথ। আর তা না হলে বিছিন্নভাবে নয়, ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যানের মাধ্যমেই এর সমাধান করতে হবে। সারাদেশকে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। শুধু ঢাকা নিয়ে পরিকল্পনা করলে তা তেমন ফল আনবে না।

 

 



Loading...


Loading...