জিপিএ ৫ পায়নি বলে মন খারাপ?

এম এল গনি

লেখক- এম এল গনি।


  • ২১ জুলাই ২০১৯, ২০:৪৯

পৃথিবীর ধনী রাষ্ট্রপ্রধানদের অন্যতম আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর নিট সম্পদের পরিমাণ তিন বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ১০০০ মিলিয়নে হয় ১ বিলিয়ন; আর ১০ লাখে ১ মিলিয়ন। বুঝুন এবার কতটা ধনী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প! এরকম এক ডজনেরও বেশি ট্রাম্পকে এক সাথে করলে যত বড় ধনী কল্পনা করা যায় তার বেশি ধনী জ্যাক মা, যিনি বর্তমানে চীনের সেরা ধনী। ট্রাম্প সাহেব কিন্তু উত্তরাধিকারসূত্রে অনেক সম্পদ পেয়েছেন; অন্যদিকে, জ্যাক মা কিছুই পাননি, সবই তাঁর নিজের পরিশ্রমে অর্জিত।

চীনের অতি সাধারণ এক পরিবারে তাঁর জন্ম। ব্যবসায় নামার আগে আর দশজনের মতো চাকুরীর চেষ্টাও করছেন জ্যাক মা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি শেয়ার করেছেন এ তথ্য: একবার তিনিসহ মোট ২৪ জন KFC'র চাকুরীতে ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ২৩ জনের চাকুরী হয়; যার হয়নি তিনি জ্যাক মা নিজেই। এভাবে একে একে ৩০টি চাকুরীর ইন্টারভিউতে অকৃতকার্য হয়েছিলেন তিনি। চাকরিদাতারা কেন যেন তাঁকে চাকুরী প্রদানের উপযুক্তই বিবেচনা করতে পারছিলেন না। তাছাড়া বিশ্ববিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ারও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। পরপর দশবার হার্ভাডে ভর্তি আবেদন করেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন জ্যাক।

এতো ব্যর্থতার পরও ভেঙে পড়েননি জ্যাক মা, বরং নতুন উদ্যমে জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। জীবন সংগ্রামে বারবার হোঁচট খেয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়েছেন তিনি। নাছোড়বান্দা তিনি; ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা পেতে রাতদিন চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। পরবর্তীতে একসময় কেবল সফলতা অর্জন নয়, একেবারে সাফল্যের চূড়ায় উঠতে সক্ষম হন জ্যাক মা। জানেন তো, চীনা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি 'আলিবাবা'র প্রতিষ্ঠাতা এই এককালের ব্যর্থ-বেকার জ্যাক! বর্তমানে তাঁর নেট সম্পদের পরিমান ৪০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি!

এবার বলি আমার অতি পরিচিত এক বাংলাদেশির গল্প। তিনি আমার কিছু সিনিয়র। বহুবছর আগে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। খুব ভালো ছাত্রদের একজন। ভুলত্রুটি এড়াতে পরীক্ষার সময় জ্যামিতি বক্সের কভারে বেশ কিছু সূত্র লিখে এনেছিলেন। কিন্তু বিধিবাম! ধরা পড়লেন এক কড়া টিচারের হাতে।

তখনকার দিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় রাজনীতির এতটা প্রভাব ছিল না। শিক্ষকরা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করেই চাইলে কোনো ছাত্রকে বহিষ্কার করতে পারতেন। আমার এই অতি পরিচিত বড়ভাইও নকলের অভিযোগে বহিষ্কার হলেন এক বছরের জন্য। এমন দুর্ঘটনা অনেকক্ষেত্রেই ছাত্রদের জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। অথচ তিনি দমে যাননি মোটেও। এ ঘটনায় যারপরনাই অনুতপ্ত হলেও আবারো ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। জীবনের এ ভুল থেকে তিনি শিখেছেন অনেককিছু।

শিক্ষাবোর্ড পরিবর্তন করে বন্ধুপ্রতিম সেই বড়ভাই অন্য শিক্ষাবোর্ডের অধীনে দু'বছর পর উচ্চ মাধ্যমিক দিয়ে খুবই ভালো ফলাফল করলেন। পরবর্তীতে, লেখাপড়ায় আরো বেশি মনোযোগী হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হবার গৌরবও অর্জন করেছিলেন। পড়ালেখা শেষে দেশের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কয়েক বছর শিক্ষকতাও করেছেন। বোধগম্যকারণেই এ গুণীজনের বিস্তারিত পরিচয় বলবো না। শুধু এটুকু বলি, তিনি উন্নতদেশগুলোর একটির কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কাজ করছেন আজ। আমার সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। পরীক্ষায় বহিষ্কার হয়ে অপমানে-লজ্জায় আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটাতে পারতেন তিনি। তা না করে ব্যর্থতাকে উন্নতির সোপান হিসেবে ব্যবহার করে তিনি পাল্টে নিয়েছেন জীবন।

হঠাৎ এসব প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনায় মেতে উঠলাম কেন? কারণ হলো, পরীক্ষায় কাঙ্খিত ফলাফল না করে অনেক ছাত্র-ছাত্রী মুষড়ে পরে। ভাবে ভালো জিপিএ না পাওয়ায় জীবনটা বুঝি অর্থহীন হয়ে গেলো। গার্ডিয়ানদের অনেকেও খারাপ রেজাল্ট করা সন্তান বা পোষ্যদের বকাবকি শুরু করেন। এতে মানসিক চাপে পরে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা দিশেহারা হয়ে আত্মহত্যার মতো দুর্ঘটনাও ঘটিয়ে ফেলে মাঝে মাঝে। এ অনাকাঙ্খিত। জিপিএ একবার তেমন ভালো হয়নি তো কি হয়েছে? যোগ্যতা প্রমাণের এটাই তো শেষ সুযোগ নয়।

পরীক্ষায় ভালো ফল করা অবশ্যই ভালো। তারপরও আমাদের বুঝতে হবে, পরীক্ষায় ভালো গ্রেড পাওয়া না পাওয়ার সাথে অনেক সময়ই বাস্তবজীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়া না পাওয়ার তেমন সম্পর্ক থাকে না। কর্মক্ষেত্রে আমরা কী দেখি? কেউ কেউ সাধারণ বিএ পাশ করে জীবনে যতটা প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন অনেকে মাস্টার্স-পিএইচডি করেও তা পারেননি। এমন দৃষ্টান্ত এক-দুটি নয়, অসংখ্য। জিপিএ ৫ বা, গোল্ডেন জিপিএ পাওয়ারাই যে বাস্তব জীবনে সবচেয়ে সফল হচ্ছে তা কিন্তু নয়। তারমানে, জীবনের সফলতা কেবল জিপিএ'র উপর নির্ভর করে না। বাস্তব জীবনে সফল হতে সবচেয়ে বেশি দরকার সুপরিকল্পনা, সময়ানুবর্তিতা আর অধ্যাবসায়।

কোন কোনো কাজের ফল হঠাৎ পাওয়া যায় না। জীবনে সফলতা অর্জন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সেখানে আলাদিনের চেরাগের মতো রাতারাতি কিছু পাবার আগ্রহ মরুভূমির মরীচিকা বৈ কিছু নয়। জিপিএ ৫, গোল্ডেন জিপিএ, এসব সাময়িক চমকের কারণ হতে পারে, এর দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব নেই বলা চলে। স্কুল কলেজের পরীক্ষার ফার্স্ট হওয়া ছাত্রটাই কি সবসময় বাস্তবের সবচেয়ে সফল মানুষ? অবশ্যই না। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে হতাশায় ভোগা আপনার সন্তান বা পোষ্যকে এ সত্যটি ভালোমতো বুঝিয়ে দিন; তারা দ্রুত হতাশা কাটিয়ে উঠবে।

লেখক- এম এল গনি : কানাডা প্রবাসী লেখক, ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট ও প্রকৌশলী।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads




Loading...