বিসিএস পাস করলেন কিন্তু জানা হলো না মৃদুলের



মিসকাত রাহমান মৃদুল কিছুদিন আগেই ছিল একটি সম্ভাবনাময় নাম। চঞ্চল ও মেধাবী মৃদুল একদিন দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন সেকথা নিশ্চিত জানা ছিল এলাকাবাসীর। শৈশবে প্রাথমিক বিদ্যলয়ের শিক্ষকরা পরিশ্রমী মৃদুলকে ছাত্র হিসেবে পেয়ে খুব উৎফুল্ল ছিলেন। অ-আ-ক-খ'র শৈশবেই তাঁরা একটি মহৎ স্বপ্ন বুনে দেন মৃদুলের বুকে। সেই স্বপ্ন দেশমাতাকে সেবার স্বপ্ন। সৎ ও শিক্ষিত মানুষ হিসেবে নিজেকে তৈরি করার স্বপ্ন। তারপর নিজের সবটা উজার করে জন্মভূমির সেবায় দায়িত্ব পালনের স্বপ্ন।

ধীরে ধীরে বড় হলেন ছোট্ট মৃদুল। নিজেকে গড়লেন দিনে দিনে। সেই যাত্রার ইতিবৃত্তে আমরা দেখি- ফরিদপুরের ছোট্ট গ্রামের এক স্কুলের আঙিনা পেরিয়ে মৃদুল ঢাকায় আসে। ভর্তি হয় আলহাজ্ব মকবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক শাখায়। চলে নিজেকে তৈরীর সাধনা। তাই বলে মৃদুল কিন্তু অন্য অনেকের মতো বইয়ে মুখগুঁজে থাকা কোনো রোবট হয়ে যায় না। পড়াশোনার পাশাপাশি বন্ধুদের সাথে আড্ডা কিংবা ঘোরাঘুরিতেও তাঁর জুড়ি নেই। একই সাথে তরুণ মৃদুল পরিচিত হন একজন ভালো ছাত্র, ভালো বন্ধু এবং ভালো মনের মানুষ হিসেবে।

কলেজজীবনে পরিশ্রমের ফল পেলেন মৃদুল। নিজের জায়গা করে নিলেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে তিনি ভর্তি হলেন অর্থনীতি বিভাগে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও মৃদুল স্বভাবসুলভ বন্ধুপরায়ণতা, মেধা ও পরিশ্রমে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে নিলেন। স্বপ্নবাজ মৃদুল মৃদু পায়ে এগিয়ে গেলেন শৈশবে দেখা সেই স্বপ্নের পথে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেড়িয়ে বসলেন বিসিএস পরীক্ষায়। আর বরাবরের মতো ছিনিয়ে আনলেন সাফল্য। এবার তাঁর দেশের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সেবা করার পালা। কিন্তু কোথায় মৃদুল? কোথায় আমাদের স্বপ্নবাজ সেই তরুণ? কোথায় সেই মেধাবী দেশপ্রেমিক?

না, মৃদুলকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। কিছুতেই যায় না। তাঁরে শুধু পায় বুঝি মৃদু মিঠে হাওয়া! তাঁরে শুধু পায় অনন্ত নক্ষত্র বিথীর অন্য 'দুনিয়া'। মৃদুল যে হারিয়ে গেছে। গেছে চিরতরে সব বন্ধন ছিন্ন করে না ফেরার জগতে।

গত ১৯ জুন মৃদুল লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে ভারতে গিয়েছিলেন। তখনও স্বপ্ন ছিল ফিরে এসে দেশের সেবায় নিয়োজিত হবেন। সততার সাথে হাল ধরবেন পিতা-মাতা থেকে সকল শিক্ষকের সেই স্বপ্ন পূরণে। কিন্তু ভারত থেকে ফেরা হয় না মৃদুলের। ফেরে তাঁর নিথর দেহ। ফেরে শুধু স্বপ্নের শব!

চিৎকার করে কাঁদে মৃদুলের পরিবার। কাঁদে বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষক, পাড়াপ্রতিবেশী। কাঁদে প্রিয় জন্মভূমির ৫৬ হাজার বর্গমাইল জমিন। হায়, 'জীবন এত ছোট ক্যানে'? কেন এতো ছোট হয়!

বন্ধুরা জানায়, মৃদুল চলে যাওয়ার একদিন পূর্বেও ফেসবুকে চ্যাট করতো, হাসিমুখে দোয়া চাইত। মৃদুল কি জানতো, চলে যাওয়ার হয়েছে সময়? হয়ত জানত, হয়ত জানত না। কিন্তু ২৬ জুন সে বন্ধুদের চ্যাট গ্রুপে জানালো, অনেক তো থাকা হলো বন্ধুরা, দেখা হলো সুন্দর পৃথিবী। এবার হয়ত বিদায় নেয়ার পালা। ছুটি মনে হয় হয়েই যাবে। তোদের মাঝে আর থাকা হলো না। তবে যেখানেই থাকি তোদের মাঝেই আছি জেনে নিস।

মৃদুল আরও লেখেন, এখন আমি চেন্নাইয়ে আছি। আমার লিভারটা ড্যামেজ হয়ে গেছে মনে হয়। সবাই দোয়া করিস আর আমার ভুলগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখিস।

বন্ধুরা মৃদুলকে শান্তনা দিয়েছে, সাহস দিয়েছে। কিন্তু বিদায়ের ঘণ্টা যখন বেজে গেছে তখন সবই শূন্য, অর্থহীন, সবই ফাঁকা।

বন্ধুরা ঘুমাতে পারেনি। নির্ঘুম চোখে ছুটে গেছে বিমানবন্দরে। আকাশ মেঘাচ্ছন, অশ্রুর মতো বৃষ্টি ঝড়ছে কেবল। শেষ বারের মতো মৃদুল গেল প্রিয় ক্যাম্পাসে। মৃদুল নয়, স্বপ্নের শব গেল যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। শুক্রবার (২৮ জুন) শেষ বারের মতো বন্ধুরা তাকে ভালোবাসার চুম্বনে সিক্ত করলো।

তারপর মৃদুল, এক মেধাবী স্বপ্নবাজ ফিরে যায় প্রিয় গ্রামে। ফরিদপুরের সদরপুর থানার আকৈটচর গ্রামের মসজিদের পাশে তাঁর শবদেহের সাথে সমাহিত হয় স্বপ্নেরা।

মৃত্যুর দ্বিতীয় দিনে ৩৮তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো। রোল নম্বর- ০৬১০১৯। বিসিএস ক্যাডার। মৃদুল যেন মসজিদের পাশে শুয়ে মৃদু মৃদু হাসছেন- স্বপ্ন পূরণের হাসি। ছোট বেলার শিক্ষক, প্রতিবেশী, পিতা-মাতার দেখা স্বপ্ন পূরণের সংগ্রামে জয়ী হওয়ার প্রশান্ত এক হাসি।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ব্যাংককে উচ্চ শিক্ষার জন্য অবস্থানরত মৃদুলের বন্ধু, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ফজলুল হক বলেন, মৃদুলের মতো তরুণের অসময়ে চলে যাওয়া মেনে নেয়া যায় না। আমরা একজন ভালো বন্ধু হারালাম।

ইংল্যান্ড প্রবাসী বন্ধু মিজান বলেন, মৃদুলের চলে যাওয়া অসহনীয়। কতদিন হলো দূর পরবাসে আছি। কিন্তু মৃদুলের সাথে কথা বললেই মনে হতো আমি বাংলার আলো-হাওয়ার স্পর্শ পাচ্ছি।

মৃদুলের বন্ধু ৩৭ তম বিসিএস ক্যাডার, কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিট্রেট অমিত দত্ত বললেন, মৃদুলের মৃত্যুতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো তা মেটার নয়। তাঁর চলে যাওয়া মানে একজন সৎ,মেধাবী, পরিশ্রমি ও দেশপ্রেমিক যুবককে হারানো। এই হারানোতে দেশের ক্ষতিটা খুব কম নয়।

কিন্তু এমন ক্ষতি আর কত চলবে? আর কত তরুণ, আর কত স্বপ্ন, আর কত ভালোবাসা অকালে হারিয়ে যাবে ক্যান্সারের ভয়াল থাবায়? আমরা কি পারি না এদেশে একটি ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ে তুলতে?

লেখক : কাওছার আল হাবীব, মানবকণ্ঠে কর্মরত মৃদুলের বন্ধু।

মানবকণ্ঠ/এইচকে



Loading...
ads


Loading...