ছাত্রলীগের কোন্দলে ঢাবিতে বৈশাখী কনর্সাট বাতিল



  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:২০

ছাত্রলীগের অন্তঃকোন্দলের জেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মলচত্বরে পহেলা বৈশাখের আয়োজনের মঞ্চে দুই দফা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার দিবাগত রাতে এ ঘটনা ঘটে। ফের ভাঙচুরের আশঙ্কায় বর্ষবরণ উপলক্ষে আয়োজিত কনসার্ট বাতিল করা হয়েছে।

চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উদযাপনের লক্ষ্যে কোমল পানীয়র ব্র্যান্ড মোজোর সহযোগিতায় শনি ও রোববার বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের উদ্যোগে মল চত্বরে কনসার্ট ও মেলার আয়োজন করা হয়। এতে জেমস, মিলা, ওয়ারফেজ, আর্টসেল ও ফিড ব্যাকসহ বেশ কয়েকটি ব্যান্ডের সঙ্গীত পরিবেশনের কথা ছিল। এই আয়োজনের মঞ্চ তৈরিসহ সামগ্রিক প্রস্তুতি গুছিয়ে আনার মধ্যেই শনিবার ভোররাতে অজ্ঞাত যুবকরা কনসার্টের মঞ্চে ভাঙচুর এবং বিভিন্ন উপকরণে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাত ৩টায় মল চত্বরে দেখা যায়, কনসার্টের মূল মঞ্চ এলোমেলো, পাশে মেলার স্টলগুলো ভাঙা ও কিছু স্টলের তাঁবু উল্টে আছে, বেশ কয়েকটি ফ্রিজ ভেঙে পড়ে আছে। এছাড়া ব্যানার-ফেস্টুন ছেঁড়া অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এর বেশির ভাগেই আগুনে পোড়া। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কিচুক্ষণ পর শতাধিক নেতা-কর্মী নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসাইন। তারা চলে যাওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় হেলমেট পরিহিত চার যুবক মোটরসাইকেল নিয়ে এসে পেট্রল দিয়ে সাউন্ড সিস্টেমে আগুন ধরিয়ে দেয়।

মোজোর মার্কেটিং বিভাগের অপারেশন হেড (ব্র্যান্ড) আজম বিন তারেক বলেন, ২০-২৫ জনের একটি দল এসে গণ্ডগোল বাঁধাতে গেলে তাদের ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করি। কিছু সময় পর আরও ১০০-১৫০ জন এসে আমাকেসহ ওয়ার্কারদের বের করে দেয়। ১০-১২ মিনিটের মধ্যে পুরো জায়গায় ভাঙচুর চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে চলে যায়। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও সঠিকভাবে নিরূপন করা যায়নি। ৩৪টি ঘর ছিল সব ফেলে দিয়েছে। ছয়টি ঘর পুড়ে ফেলেছে। ২২টি ফ্রিজের মধ্যে ১৭টি ফ্রিজ ভাঙচুর করেছে, ১টিতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, রাতের ঘটনার পর আমাকে অনেক অনুরোধ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে সবকিছু আন্ডার কন্ট্রোলে থাকবে। তাই আমি সবকিছু গুছিয়ে পুনরায় কাজ করা শুরু করি। পরে সকাল ৮ টার দিকে চারজন লোক হেলমেট পরে এসে আমাদের সাউন্ড সরানোর যে বক্স সেখানে পেট্রোল বোমা মারে। তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। আমার সামনেই জিনিসগুলো পুড়ে দেয়া হয়েছে। তারপর তারা দ্রুত আবার মোটরবাইকে করে চলে যায়। আমাদের ক্ষয়ক্ষতি প্রায় কোটি ছাড়িয়ে গেছে।

ঘটনাস্থলে থাকা ছাত্রলীগের একাধিক নেতা জানান, এই উৎসবের স্পনসর কোমল পানীয়ের ব্র্যান্ড ‘মোজো’। উৎসবে সব মিলিয়ে ২০ লাখ টাকা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মূলত এই টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়েই দ্বন্দ্ব। ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনের অভিযোগ, সংগঠনের সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও এ আয়োজন সম্পর্কে তাকে কিছুই জানানো হয়নি। আর রব্বানী, সনজিত ও সাদ্দামের দাবি- শোভন পুরো বিষয়টি জানেন।

প্রত্যক্ষদর্শী জানান, শুক্রবার রাত একটার দিকে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আতিকুর রহমান খান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন রহমান, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইউসুফ উদ্দীন খান, কবি জসীমউদ্দীন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আরিফ হোসেন, অমর একুশে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এহসান উল্লাহ, মুহসীন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানী ও স্যার এফ রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষারের নেতৃত্বে মল চত্বরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়।

মল চত্বরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের পরে শোভনের অনুসারী স্যার এফ রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষারের ৪০৯ নম্বর রুম ভাঙচুর করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের অনুসারীরা এই ভাঙচুর করেছেন বলে অভিযোগ করেন মাহমুদুল হাসান তুষার। সাগর রহমান নামের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আরেক এক নেতাকে মারধর করা হয়। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে শোভনের অনুসারীদের কয়েকটি রুম ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, ছাত্রলীগের ব্যানারে একটি প্রোগ্রাম হচ্ছে, অথচ আমি সংগঠনের সভাপতি হয়েও কিছুই জানি না। এ নিয়ে আমার মনে কিছুটা ক্ষোভ আছে। তবে মল চত্বরে কারা আগুন দিয়েছেন, আমি জানি না। আমি কাউকে এ ধরনের নির্দেশ দিইনি।

আয়োজনের বিষয়ে সভাপতি শোভনকে না জানানোর অভিযোগ নিয়ে রাব্বানী বলেন, প্রোগ্রামটি মূলত ছাত্রলীগ এবং ডাকসুর আয়োজনে করা হচ্ছে। এই প্রোগ্রামের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসাইনকে। তিনি ছাত্রলীগের সভাপতিকে কমপক্ষে ৮-১০ বার ফোন দিয়েছেন, কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। পরে এসএমএস করে তাকে জানানো হয়।

এ ব্যাপারে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, ‘এটা ছাত্রলীগের প্রোগ্রাম। ডাকসুর হলে আমি জানতাম। তবে, ডাকসুর নাম ভাঙিয়ে যদি কেউ কিছু করে তাহলে আর কিছু বলার থাকে না। তিনি অভিযোগ করেন, এই কনসার্ট উপলক্ষে এক কোটি ২০ লাখ টাকা বাজেট হয়। মোজো কোম্পানিসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীপ্রতিষ্ঠান এই কনসার্ট উপলক্ষে টাকা দেয়। ছাত্রলীগের নেতারা এই টাকা ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মারামারি, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করছে। একপক্ষ আরেকপক্ষকে কোণঠাসা করতে প্রচার চালাচ্ছেন এটি ডাকসু ও ছাত্রলীগের প্রোগ্রাম। অথচ ডাকসুতে এই প্রোগ্রাম নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি।

ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেন বলেন, সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতিকে আয়োজনের পুরো বিষয় সম্পর্কে আগেই জানানো হয়েছে। তবু কেন তিনি এ ধরনের আচরণ করছেন, সেটি আমারও প্রশ্ন। টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারার বিষয়টি সত্য নয়।

ঘটনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী বলেন, আমি পুরো ঘটনাটা শুনেছি। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টি দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

 



Loading...


Loading...