গল্প

গল্পের নাম ঊনচল্লিশ

সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্


poisha bazar

  • ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:৫৮

পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে। সাজুগুজু করে স্কুলে গেলাম। রেজাল্ট পাওয়ার আনন্দে টগবগ করছি আমরা। রেজাল্টশিটটা হাতে পেলাম। এক নজর দেখেই পাকখেয়ে পড়ে গেলাম মাটিতে।

সহপাঠীরা চিল্লাচিল্লি, হৈ-চৈ আর ছোটাছুটি করতে লাগল। কেউ পানি ঢালছে, কেউ বাতাস করছে। কেউ কান্না কান্না স্বরে বলছে, ‘সুমাইয়া জীবনেও গণিতে এত কম নাম্বার পায় না; সে ৩৯ পায় কিভাবে? নাম্বার দেখেই সে পড়ে গেছে।’

স্কুলের বৃদ্ধ দপ্তরি চাচা এসে চুপি দিয়ে জ্ঞানীর মতো করে বলছে, ‘আরে কিয়ের খালি নাম্বারের কতা কও তোমরা, আমার তো মনে অইতাছে এই মাইয়ারে ভ‚তে ধরেছে, ভ‚তে ধরলে মানুষ এম্বায় ঠাডা মরার মতো ঝিম মাইরা পইরা থাহে, মাইয়ার লক্ষণ তো ভাল ঠেকতাছে না গো! দেহি, স্যারকে নিয়া আসি।

স্যার এলেন। দেহি সরো তোমরা। কী অইছে দেকতাছি। স্যার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলেন। তারপর বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে মুখটা উপরে তুললেন। লম্বা একটা শ্বাস টেনে গাল ফুলিয়ে আমার মুখ বরাবর জোরে ফুঁ দিলেন। এভাবে তিনবার ফুঁ দিলেন তিনি। তার ওপর পড়াপানি ছিটিয়ে দিলেন মুখে। স্যারের ফুঁ-এর সাথে পান-জর্দার ভয়ঙ্কর গন্ধে আমার নাড়িভুঁড়ি ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। হাঁচতে হাঁচতে আর কাশতে কাশতে আমি বাঁকা হয়ে গেলাম। কয়েকজন বলছে, আয় হায় স্যার, ফুঁ দেয়ার পরে সে কেমন বাঁকা হয়ে গেছে দেখছেন স্যার, দেখছেন?

স্যার একটা ধমক দিয়ে বললেন, চুপ কর। না বুইজ্জা আন্দাজে দেকছেন, দেকছেন করিছ না। ফুঁ-এর অ্যাকশান হবায় শুরু অইছে, দেহছ না ছেরি এহন কী করে! বাঁইক্কা-বুইক্কা, মুছরাইয়া-কুছরাইয়া ঠিক অয় কেমনে, চাইয়া খালি দেক। ভূত-পেতনি আছর করলে এহন বাপ ডাইক্কা পালাইবে। ধুনপুন মনে করিছ না, শক্ত ফুঁ দিছি।

একটু পর পর পানির ছিটা, নানান কথা আর জর্দার উটকো গন্ধে আমি বেহুঁশ হয়ে গেলাম। যা করবে আল্লায়, ডান বাম তাকিয়ে একটা মোচড় দিয়ে উঠে তাওড়াতে তাওড়াতে সোজা বাসায় চলে এলাম।

গভীর রাত। চিন্তায় আমার ঘুম আসছে না। গণিতে ৩৯? ছিঃ। খালি ছটফট করছি। হঠাৎ দরজা-জানালা নড়ে উঠল। একটা ভূত এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে! আমি তো ভয়ে লাফিয়ে উঠলাম। ভ‚তটা হাসি হাসি মুখে বলল, ভয় পেয়ো না, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না, এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম তো, চুপি দিয়ে তোমার কষ্ট কষ্ট মুখটা দেখে খুব মায়া হলো আমার। তাই সোজা চলে এলাম। কোনো সমস্যা থাকলে বলো। দেখি, আমি তোমার কোনো উপকারনি করতে পারি।

আমি বললাম, ভ‚তেরা কি মানুষের উপকার করতে পারে? তোমরা তো ক্ষতি করায় ওস্তাদ। এহ্ তুমি করবে আমার উপকার? যাও এখান থেকে।
ভ‚তটা হেসে হেসে বলে, তোমরা আমাদের এত খারাপ ভেবো না। আসলে তোমরা আমাদের যত খারাপ মনে কর আমরা তত খারাপ না। আমাদের মাঝে ভালো মন্দ ভ‚ত আছে। আমরা ইচ্ছে করলে খুব উপকার করতে পারি। বলেই দেখো না।
আমি বললাম, আমার যে সমস্যা তুমি এর আগা মাথা কিছুই বুঝবে না। এটা লেখাপড়ার ব্যাপার। লেখাপড়া না জানলে কী উপকার করবে তুমি, হেহ্?
ভ‚তটা বলল, একবার হুকুম করে দেখো, আমি কি করি।
আমি বললাম, গণিতে সবসময় আমি নাইনটি আপ নাম্বার পেয়ে থাকি। আর এবার ফাইনাল পরীক্ষায় পেলাম থার্টি নাইন। আমার রোল নম্বর কত নিচে নেমে গেছে। আমি মুখ দেখাবো ক্যামনে? খালি যে পেরাপেরি কর, তুমি কি পারবে আমার এ সমস্যার কোনো সমাধান দিতে?
কোনো ব্যাপার না। আগামীকালই এর সমাধান পেয়ে যাবে তুমি। হাঃ হাঃ হাঃ করে ভূতটা লাটিমের মতো ঘুরতে ঘুরতে উধাও হয়ে গেল।
পরেরদিন স্কুলে গেলাম। সহপাঠীরা দৌড়ে এসে বলল, সুমাইয়া স্যারে ফুঁ না দিলে কালকে তোমার খবর আছিল। অভিভাবক কক্ষ হতে কয়েকজন আন্টি ছুটে এসে চোখ বড় করে বলছে, তোমারে নাকি ভ‚তে ধরেছিল? ভ‚তে তোমারে নাকি খাড়াত্তে অক্করে মাটিত ফালাইয়া দিছে? আল্লারে আল্লা, কী বিপদ! স্যার ফুঁ-মন্তর না করলে তো মরেই গেছিলা, লক্ষ টেকার ফুঁ।

গণিত স্যার পাগলের মতো খুঁজছেন আমাকে। স্যার থাপ মেরে আমার হাত চেপে ধরে বললেন, সুমাইয়া, এসো, এসো। তোমার ব্যাপারটা নিয়ে ভীষণ টেনশানে ছিলাম। বিশ্বাস করো, রাতে আমার একটুও ঘুম হয়নি। আমার বিরাট বড় ভুল হয়ে গেছে। তুমি গণিতে পেয়েছ ৯৩ আর রেজাল্টশিটে উঠেছে উল্টোটা, মানে ৩৯। কি যে বিতিকিচ্ছিরি কারবার বল তো! এখন নম্বরপত্র সব ঠিকঠাক করে দিয়েছি। আমার একটু ভ‚লের জন্য তুমি অনেক বড় কষ্ট পেয়েছ। দারুণ রেজাল্ট করেছ তুমি। তোমাকে অভিনন্দন।

আমি স্যারের দেওয়া অভিনন্দন যত্ন করে তুলে রেখেছি। এ অভিনন্দন আমি ভ‚তকে দেব না ফুঁ দেওয়া স্যারকে দেব-এ নিয়ে মহা সমস্যায় আছি।
পাঠক বন্ধুরা, এ সমস্যা সমাধানের ভার তোমাদের ওপর ছেড়ে দিলাম।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads




Loading...