ছোটদের ছড়াকার আমাদের সুকুমার

তাহসিনা এনাম তৃষা

সুকুমার রায়


  • ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:৫৩

বাপুরাম সাপুরে
কোথা যাস বাপুরে?
আয় বাবা দেখে যা!
দুটো সাপ রেখে যা!
যে সাপের চোখ্ নেই,
শিং নেই নোখ্ নেই,
ছোটে না কি হাঁটে না,
কাউকে যে কাটে না,
করে নাকো ফোঁস ফাঁস,
মারে নাকো ঢুঁশ ঢাঁশ,
নেই কোন উৎপাত,
খায় শুধু দুধ ভাত-
সেই সাপ জ্যান্ত
গোটা দুই আন তো?
তেড়ে মেরে ডান্ডা
ক’রে দিই ঠাণ্ডা।

আমাদের সবার প্রিয় এই মজার ছড়াটির ছড়াকার সুকুমার রায়, বাংলা সাহিত্যের আকাশে ক্ষণস্থায়ী এক উজ্জ্বল প্রতিভার নাম। ১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর কলকাতার ১৩নং কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ভাড়াবাড়িতে জš§গ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা শিশুসাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ উপেন্দ্রকিশোর রায়, মা বিধুমুখী দেবী। ছেলেবেলায় সুকুমারের ডাকনাম ছিল তাতা। ছদ্মনাম ছিল ‘উহ্যনাম পণ্ডিত’। কলেজ জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ননসেন্স ক্লাব, যার মুখপত্র ছিল হাতে লেখা, নাম ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’। কলকাতার লেখাপড়া শেষে ‘ফটোগ্রাফি অ্যান্ড প্রিন্টিং’-এ উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। মৃত্যুর পর ভার নিয়েছিলেন ‘সন্দেশ’ পত্রিকার।

ছেলেবেলা থেকেই দারুণ ছড়া লিখতেন সুকুমার। সন্দেশ পত্রিকায় লিখেছেন নিয়মিত। তার মৃত্যুর কিছুদিন পরেই ১৯২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় তার প্রথম ছড়াগ্রন্থ ‘আবোল তাবোল’। বাংলা শিশুসাহিত্যে এমন চমৎকার সব ছড়া আগে কেউ কোনো দিন দেখেনি। রামগরুড়–রের ছানা থেকে হুঁকোমুখো হ্যাংলা, কুমড়ো পটাশ থেকে ট্যাঁশ গরু- কী নেই তার ছড়ায়! বিয়ের পাত্র হিসেবে সৎপাত্র গঙ্গারামের যে অসাধারণ বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তার জুড়িমেলা ভার। শুধু কি তাই! বিভিন্ন ধরনের ছায়া ধরে কিভাবে ব্যবসা করতে হয় সে টোটকাও আছে তার ছড়ায়। আর ব্যাকরণ এর নিয়ম না মেনে যে সমস্ত অদ্ভুতুড়ে প্রাণীরা এই যেমন হাঁসজারু, বকচ্ছপ, হাতিমি তার কল্পনা এসেছিল তাদের নিয়ে লিখেছিলেন মজার ছড়া ‘খিচুড়ি’। বাংলা সাহিত্যে ননসেন্স রাইমের উদ্ভাবক তিনি। মন্ডা ক্লাবের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করার সময় প্রায় প্রতিটি আমন্ত্রণপত্রই তিনি সাজাতেন ছন্দ দিয়ে। একটি আমন্ত্রণপত্রের শেষটা এমন-

‘শুনবে এসে সুপ্রবন্ধ
গিরিজার ‘বিবেকানন্দ’,
মঙ্গলবার আমার বাসায়
আর থেক না ভোজের আশায়।’

সুকুমারের লেখা গল্পগুলো যেন ছোটদের জন্য আনন্দ আর হাসির ফোয়ারা। কোঁকড়া চুলো পাগলা দাশুর অদ্ভুত সব কীর্তি লেখা আছে তার গল্পের ভেতর। ভোলানাথ তার বাড়াবাড়ি রকমের সর্দারি দেখাতে গিয়ে কি বিপদে পড়েছিল সেটাও কিন্তু তিনি বলে দিয়েছেন তার গল্পের মাঝে। আর নন্দলালের কপাল কিভাবে মন্দ হলো সে তো আমাদের সবার জানা। ছড়া গল্প ছাড়াও লিখেছেন চমৎকার সব শিশু-কিশোর উপযোগী জীবনী এবং প্রবন্ধ।

ময়মনসিংহের মসুয়া গ্রামে বিরাট জমিদারি ছিল তাদের। একবার জমিদারির কাজে এলেন মসুয়াতে, বাধালেন কালজ্বর। সেকালে কালজ্বরের কোনো চিকিৎসা ছিল না। প্রায় আড়াই বছর ভুগলেন। অবশেষে ১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর স্ত্রী সুপ্রভা দেবী আর একমাত্র পুত্র সত্যাজিৎ রায়কে ফেলে রেখে চিরদিনের মতো দূর আকাশে হারিয়ে যান আমাদের প্রিয় সুকুমার। বাংলা শিশুসাহিত্য আজীবন চিরকৃতজ্ঞ থাকবে সুকুমার রায়ের কাছে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads




Loading...