ঈদ স্মৃতি



  • অ্যাম্বাসেডর, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ১৬ আগস্ট ২০১৯, ১৪:৪৯

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানেই স্মৃতি। আর যদি সেটা হয় ঈদ-উল-আযহা অর্থাৎ কুরবানি, তাহলে একটু বেশিই। কুরবানির পশু কেনা, মাংস কাটা কিংবা কুরবানির মাংস বিতরণ নিয়ে কিছু স্মৃতি থাকবেই। তেমনি একটি স্মৃতিমাখা ঈদ হলো ২০১১ সালের কুরবানির ঈদ। প্রতি কুরবানির ঈদ এলেই মনে পড়ে যায়।

যেহেতু আমরা শহরে ঈদ উদযাপন করি, তাই প্রতি ঈদ-উল আযহায় বাবা নামায থেকে এলে কসাইদের সঙ্গে করে বাসার গ্যারেজেই কুরবানি দেয়া হয়। কুরবানির মাংস থেকে অসহায় গরীব-দুঃখীদের ভাগ বাসার গ্যারেজ থেকেই বিতরণ করা হয়। আর স্বভাবতই খুব ভিড় থাকার কারণে আমি নিচে না গিয়ে দু’তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাংস বিতরণের দৃশ্য দেখতাম।

তখনও আমার বাসার নিচে মাংস সংগ্রহের জন্য কেউ আসেনি। কিন্তু পাশের বাসায় দলে দলে অনেক লোক চলে এসেছে। মোটামুটি বেশ ঠেলাঠেলি করে তারা মাংস সংগ্রহ করছিলেন, হয়ত পাছে তারা মাংস ফুরিয়ে গেলে শূন্য হাতে ফেরার ভয় পাচ্ছিলেন। এত লোকের ভীড়েও আমার চোখ যেন মাংস সংগ্রহ করতে আসা একজন লোককেই বারবার দেখছিলো। মধ্যবয়স্ক, মাথায় হালকা কাঁচা-পাকা চুল, পরিষ্কার নতুন ফতুয়া আর লুঙ্গি পরা ছিলেন।

মোটামুটি অধিকাংশ মানুষের কাপড়ই ছিলো খুব পুরানো কিংবা ছেঁড়া, তাই তাদের মধ্যে চকচকে নতুন কাপড় পরিহিত কারোর দিকে চোখ পড়তে বেশী কষ্ট পেতে হয়নি। তিনি ভিড় করা লাইনের সবার শেষে দাড়িয়ে ছিলেন। সবাই যখন ভিড়ের মাঝে ধাক্কা-ধাক্কি করছিলো, তিনি সবার পিছনে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখছিলেন। সবার হাতেই মাংস সংগ্রহের ব্যাগ বা পলিথিন ছিলো। প্রত্যেকের ব্যাগেই অল্প কিছু হলেও সংগ্রহ করা মাংস দেখা যাচ্ছিলো। কিন্তু একমাত্র সেই লোকটির হাতের ব্যাগটিই দেখা গেলো একদম পরিষ্কার ও চার ভাঁজ করা। অর্থাৎ তার কপালে এখন পর্যন্ত এক টুকরোও মাংসও জোটেনি। সবাই যখন পাশের বাসা থেকে মাংস সংগ্রহ করা শেষে আমাদের বাসার দিকে আসা শুরু করলো, ভিড় কমে যাওয়াতে লোকটি তখন মাংস চাইতে গেলো।

ততক্ষণে সেই বাসার গেইট লাগিয়ে দেয়া হলো এবং লোকটির হাতের ভাঁজ করা ব্যাগ এবারও খোলা হলো না। এবারেও সকলের ভিড়ে সবার শেষে তার অবস্থান, খুব সম্ভবত অন্যের গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়াতে কিংবা অন্যের হাতের উপর দিয়ে নিজের হাত বাড়িয়ে না দেয়ার মতো ভদ্রতাটুকুই রক্ষা করছিলেন। কিন্তু আমি তার চোখে-মুখে যেন প্রয়োজন এবং আত্মসম্মানবোধের সংমিশ্রণ দেখতে পাচ্ছিলাম। কে জানে হয়ত বাসা থেকে ছোটো বাচ্চা কিংবা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য মাংস নিয়ে যেতে বের হয়েছিলেন। কিন্তু তীব্র আত্মসম্মানবোধ তাকে চাইতে মানা করছিলো কিংবা দূরে সরিয়ে রাখছিলো!

এবারও যখন সবাই মাংস নিয়ে চলে যাচ্ছিলো আর তিনি শেষে ঠাঁই দাড়িয়ে ছিলেন। আমি ভাবলাম, আমি নিজে গিয়ে মাংস দিয়ে আসবো তাকে। রান্নাঘর থেকে বেশী করে মাংস নিয়ে দৌড়ে যখন নিচে নামি দেখি ততক্ষণে সবাই চলে গেছে... সাথে সেই লোকটিকেও আর পেলাম না। আর ঈদের রাস্তায় এত লোকের ভিড়ে লোকটিকে খোঁজার বৃথা চেষ্টাও করলাম না ।

খুব মন খারাপ নিয়ে বাসায় ফিরে আসি। দুপুরে খেতে বসে আর খেতে পারছিলাম না। এক সময় কান্না করে দিই (আমার কান্নার অভ্যাস একটু বেশিই আছে কি না!)। তখন পুরো ঘটনা বাসায় বললাম। মা শুনে তিনিও কান্না করেছিলেন। সেবার ঈদের দিনে আমাদের বাসার কেউই মাংস খেতে পারেনি ।

এরপর থেকে যতবারই কুরবানির ঈদ আসে সেই লোকের কথা মনে পড়ে যায়। আমাদের ইসলামের বিধি অনুযায়ী আমরা কুরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন আর চাইতে আসা অসহায়দের জন্য আলাদা করে রেখে দিই। কিন্তু কতই না ভালো হতো যদি আমরা অন্তত নিজ এলাকার অভাবের তাড়নায়ও আত্মসম্মানবোধ নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর একটু খোঁজ নিতাম। কুরবানির মাংস বণ্টন তো সামান্য ব্যাপার, এর মাধ্যমে তাদের সঙ্গে অন্তত ঈদ-উল-আযহার আনন্দটা ভাগাভাগি করা যেতো। ঈদ মোবারক, সুন্দর ও পবিত্র হোক সকলের ঈদ ।

লেখক: শামিলা শশী; অ্যাম্বসেডর, দৈনিক মানবকণ্ঠ।

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...